শ্রদ্ধায় ও স্মরণে অরুণ দাশগুপ্ত

  সাহিত্য ও সংস্কৃতি ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২১, ১২:৪৫ দুপুর |  আপডেট  : ২৯ জুলাই ২০২১, ১০:২২ দুপুর

অরুণ দাশগুপ্ত পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় তিনি ছিলেন জ্ঞানে, পাণ্ডিত্যে ও নানান বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর কাছে গেলে, যে কোন বিষয় নিয়ে যেমন আলোচনা করা যায়, তেমনি আবার শেখাও যায়। শিক্ষা,  সাহিত্য,  সংস্কৃতি, সংগীত, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস, চলচ্চিত্র,  ঐতিহ্য, খেলাধূলা বিষয় নিয়ে ঘন্টা পর ঘন্টা আলোচনা করে যেতে পারেন। এমন পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন চট্টগ্রামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অরুণ দাশগুপ্ত।

সম্পর্কে তিনি আমার মামা হলেও লেখালিখির বিন্দুমাত্র খাতির করেননি। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোষহীন। যা এই যুগে বিরল। তাঁর এই গুণটি আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে। এরফলে আমাকে তাঁর কাছে লেখা দেওয়ার আগে মনোযোগ ও যত্ন নিয়ে লিখতে হতো। দৈনিক আজাদীর "আগামীদের আসর" পাতা থেকে "সংষ্কৃতির পাতা",  ক্রীড়াঙ্গন বিভাগে লিখে  তারপরে " সাহিত্যের পাতা"য় লিখতে গিয়ে আমায় অরুণ দাশগুপ্ত একজন ভালো পাঠক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর কথা, লেখার আগে পড়া চাই। ভালো পাঠক হলেই কিন্তু লেখক হতে অসুবিধা হবে না। আগে তোমার ভিত শক্ত করবে পড়া। শুধু পড়া। তারপর দিন যতই গেছে,  অরুণ মামার কথাটা যে কত সত্যি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অরুণ দাশগুপ্তের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে।  বাবা অবিনাশ দাশগুপ্ত,  মাতা হেমপ্রভা দাশগুপ্ত। তাঁরা ছিলেন দুইভাই। অরুণ দাশগুপ্ত ও তরুণ দাশগুপ্ত।। পৈতৃক সূত্রে অরুণ দাশগুপ্তের পরিবার ধলঘাটে জমিদার বংশধর হলেও তাঁর ব্যক্তিজীবনে এর কোন প্রভাব পড়েনি। বরং তিনি দেশ-সমাজ - জাতির আধুনিক বিনির্মানে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন।  ফলে তাঁকে আমরা পেয়েছি নির্লোভ, প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী। আবার দেখেছি তাঁকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অকুতোভয় কলম সৈনিক।  

অরুণ দাশগুপ্ত একজন উন্নতমানের পাঠক ছিলেন, এটা অনস্বীকার্য। সারাজীবন অনেক লেখা লিখেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায়, লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা, প্রবন্ধ,  নিবন্ধ, বই আলোচনা লিখে গেছেন। কিন্তু হতবাক করার বিষয়, তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা মাত্র দুটি। এনিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে আমার সাথে তর্ক-বির্তকও হয়। আজকাল দুইলাইন লিখেই অনেকেই বই লিখে ফেলছে। বছর বছর বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে।  আমার এই কথা শুনে অরুণ মামা দিলেন এক ধমক। বললেন, "আমি কি বাজারী লেখক?  ওদের কয়টা বই তোর মনে আছে? বলতে পারবি গল্প বা কবিতার কোন চরিত্রে কথা?" আমি তো উনার কথা শুনে চুপসে যাই। আসলেই তাই। ইদানীং  এত বই পড়েছি। কিন্তু মনে রাখার মত চরিত্র খুঁজে পেলাম না। এটাই চরম বাস্তবতা।

অরুণ দাশগুপ্ত প্রাথমিক লেখাপড়া করে চলে যান কোলকাতায়। সেখানে কালাধন ইনস্টিটিউশন, সাউদার্ন থেকে মাধ্যমিক এবং স্কটিশ চারচ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পরে বিশ্বভারতী লোক শিক্ষা সংসদে অধ্যয়ন করেন। কোলকাতায় শিক্ষা জীবন শেষ করে কিছুকাল সেখানকার লোকসেবক পত্রিকায় কাজ করেন। একটা সময়ে কংগ্রেস রাজনীতির সাথে যুক্তও ছিলেন।  তারপর পট পরিবর্তন।  চলে এলেন চট্টগ্রামে। সীতাকুণ্ড, মিরসরাইয়ে কয়েকটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে ১৯৭৩ সালে যোগ দিলেন চট্টগ্রামের প্রাচীনতম দৈনিক পত্রিকা " আজাদী "- তে। এবং আমৃত্যু দৈনিক আজাদী পত্রিকায় যুক্ত ছিলেন। সহ-সম্পাদক,  সহযোগী সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আর এই দীর্ঘ কর্মজীবনে লেখক তৈরির বিষয়টিকে তিনি নেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। শুদ্ধ সাহিত্য চর্চা করতে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তাই তাঁর প্রেরণায় আজ চট্টগ্রামসহ সারাদেশে গুণী সাহিত্যিক আছেন যে যার অবস্থানে। তাঁরাও নির্মল ও  শুদ্ধ সাহিত্য চর্চা করে চলেছেন আজও।


অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন আপাদমস্তক রবীন্দ্র ভক্ত। তাঁর বিভিন্ন লেখায় রবীন্দ্রনাথ চলে আসবেই। তিনি তাঁর প্রথম বই "রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য" - এর ভূমিকায় নিজেই লিখেছেন, " কলকাতার ' দক্ষিণী',  ' সুরঙ্গমা'- র মতো রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গান শিখতে গিয়ে পরম শ্রদ্ধাভাজন শুভ গুহঠাকুরতা, সুবিনয় রায়, সুনীল রায় এবং তার কিছু পরে রবীন্দ্র সংগীত বিশেষজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদার মহাশয়ের কাছে যখন রবীন্দ্র সংগীতের তালিম নিতে গেলাম, তখনই আমার বোধগম্য হলো রবীন্দ্রনাথকে জানার সর্ব শ্রেষ্ঠ উপায় রবীন্দ্রসংগীত চর্চা।"

অনেক সময় তিনি গুনগুনিয়ে গান গাইতেন। তখনও জানতাম না, তিনি গান শিখেছিলেন। তাঁর রবীন্দ্রনাথের গানের উপর এমন পাণ্ডিত্য দেখে অবাক হতাম। অনেক নামকরা শিল্পীর ভুল ধরে ফেলতেন। তাঁর লিখিত আরেকটি বইয়ের নামঃ "যুগপথিক কবি নবীন চন্দ্র সেন"। এই বইটি এমন এক স্মরণীয় কবিকে নিয়ে লেখা, যাঁর কথা অনেকেই জানেন না। নতুন প্রজন্মের কাছে অরুণ দাশগুপ্তের এই দুটি বই বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক কবিতা লিখলেও তাঁর কোন কাব্য গ্রন্থ নেই। তিনি সবসময়ই গড্ডালিকায় প্রবাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করেছেন সচেতন ভাবেই। এটা তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। এজন্যই তিনি অন্যদের চাইতে আলাদা ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

এমনই এক গুণী মানুষ জীবনটা কাটিয়ে দিলেন নিভৃতেই। ধলঘাট গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে গত ১০ জুলাই ২০২১ তারিখে তিনি পরলোক গমন করেন। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক: শাহরিয়ার আদনান শান্তনু

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত