লৌহজং এ পুলিশের ‘অল আউট' অভিযান : মাদকের বিষ দাঁত ভাঙতে ডিবি ও থানা পুলিশের হানা!

  কাজী আরিফ

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:৫৪ |  আপডেট  : ১০ মে ২০২৬, ১৬:৫৫

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে শুরু হয়েছে ডিবি ও থানা পুলিশের বিশেষ ‘অল আউট’ অভিযান। জেলা পুলিশ সুপারের কঠোর নির্দেশনায় মে মাসের শুরু থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের আস্তানায় সাঁড়াশি হানা দিচ্ছে ডিবি ও থানা পুলিশ। এই অভিযানে একের পর এক ধরা পড়ছে চিহ্নিত মাদক সম্রাট ও তাদের সহযোগীরা।

মে মাসের উল্লেখযোগ্য বিশেষ অভিযানের খতিয়ান:

মে মাসের প্রথম ১০ দিনেই লৌহজংয়ের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা অপরাধীদের মহলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

মালির অংক ও দক্ষিণ মশদগাঁওয়ে বড় ধাক্কা: 

মে মাসের ১ তারিখেই দক্ষিণ মশদগাঁও এলাকার খাল পাড়ে হানা দিয়ে পুলিশ ১ কেজি গাঁজা ও বিদেশী মদসহ আ. মান্নান (৬৫) ও সাগর খাঁ (২৩) নামক দুই কারবারিকে গ্রেফতার করে। 

কারপাশায় ইয়াবাসহ ধরা মাদক বিক্রেতা: 

২ মে ভোরে কারপাশা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১০০ পিস ইয়াবাসহ নূর আলম (২৫) নামে এক যুবককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। 

গোয়ালীমান্দ্রায় পুলিশের ঝটিকা হানা: 

৩ মে গোয়ালীমান্দ্রা এলাকায় জালাল স্টোরের সামনে অভিযান চালিয়ে ১০০ পিস ইয়াবাসহ শ্রীনগর উপজেলার বাসিন্দা মনির হোসেন তারু (৪০) ও আল মামুনকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। 

মালির অংকে ডিবি পুলিশের সাঁড়াশি হানা: 

৭ মে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মালির অংক বাজারে অভিযান চালিয়ে ৪০০ পিস ইয়াবাসহ ইসরাত জাহান (২৫) ও মো. আসাদুজ্জামানকে (৪২) গ্রেফতার করে।

বেজগাঁওয়ে থানা পুলিশের ঝটিকা হানা :

​​​​৮ মে লৌহজং থানা পুলিশের এসআই রাজিব সরকারের নেতৃত্বে বেজগাঁওয়ে ২০ পিস ইয়াবাসহ দেলোয়ার মাদবর (২২) নামে একজন গ্রেফতার।

৯ মে লৌহজং থানা পুলিশ গোয়ালী মান্দ্রায় মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার :

লৌহজং থানা পুলিশের পৃথক দুটি অভিযানে গোয়ালীমান্দ্রা এলাকা হতে ৪৭০ পিস ইয়াবাসহ মোঃ নুরুজ্জামান (৪২),  মোঃ রাশেদ খান (৩০), মোক্তার হোসেনকে গ্রেফতার করে।

১০ মে  তারিখ গোয়ালীমান্দ্রা থেকে দুইজন গ্রেফতার

মোঃ মাকসুদুর রহমান ও মোঃ তামিম ফকির নামে দুই মাদক ব্যবসায়ী থেকে ৬০  পিচ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করে লৌহজং থানা পুলিশ। 

এছাড়া ১৪ এপ্রিল র্যাব-১০ এর অভিযানে বৌলতলীতে ১১০ পিস ইয়াবাসহ চিহ্নিত কারবারি দেলোয়ার মৃধা (৪১) গ্রেফতার হন, যার রেশ ধরে মে মাসেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গোয়ালীমান্দ্রার মাদক কারবারীর নেপথ্যে ‘গডফাদার’ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া:

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লৌহজংয়ের মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো গোয়ালীমান্দ্রা এলাকা। এখানে মাদকের কারবার মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু গডফাদারের ছত্রছায়ায় চলে।

মাহমুদ সিন্ডিকেট: এই এলাকার অন্যতম চিহ্নিত মাদক সম্রাট মাহমুদ ও তার বাহিনী এতটাই বেপরোয়া যে, গত বছর তারা মাদকবিরোধী অভিযানে আসা ডিবি পুলিশের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৩ সদস্যকে আহত করেছিল। রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে এই বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বুলেট বাহিনী: যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বুলেটের সহযোগীরা এখনো তলে তলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে, যাদের দমনে পুলিশ এখন ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে।

মাদকের ‘হটস্পট’ টার্গেট:

পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, গোয়ালীমান্দ্রা, বেজগাঁও এবং কনকসার এলাকাকে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহলের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক এই অল-আউট মিশনে কাজ করছে।

মাদকের ট্রানজিট রুট: 

অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, পদ্মা নদী ও সংলগ্ন খালগুলো মাদক পাচারের অন্যতম প্রধান রুট। নৌ-পুলিশের তথ্যমতে সীমান্ত এলাকা থেকে আসা বাল্কহেড ও মালবাহী ট্রলারে বিশেষ কায়দায় মাদকের বড় চালান লুকানো থাকে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে শিমুলিয়া ঘাট ও মালির অংক খালের মোহনা দিয়ে মাদক খালাস করা হয়।

সড়কপথ: ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে এবং শ্রীনগর-লৌহজং অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো ব্যবহার করে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে ছোট ছোট চালান বিভিন্ন ইউনিয়নে পৌঁছে দেওয়া হয়।

যৌথ নজরদারি: 

নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মে মাসের সাঁড়াশি অভিযান সফল করতে তারা থানা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে রাতভর টহল দিচ্ছে। সন্দেহভাজন ট্রলার ও বাল্কহেডগুলোতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক পথেও পুলিশ সজাগ রয়েছে। 

মাদক পাচারে নারীর ব্যবহার: বিশেষ কৌশল ও চাঞ্চল্যকর তথ্য

লৌহজংয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সুকৌশলে নারীদের ‘মাদক বাহক’ বা ‘কুরিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। মে মাসের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে এই কৌশলের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

১. লৌহজংয়ে ডিবি পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযানটি পরিচালিত হয় ৭ মে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মালির অংক বাজারের পাশে লৌহজং লাইব্রেরির সামনে থেকে ইসরাত জাহান (২৫) নামক এক নারীকে গ্রেফতার করে। তার সাথে মো. আসাদুজ্জামান নামে আরেক সহযোগীকেও আটক করা হয়। তাদের তল্লাশি করে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

২. সাধারণত তল্লাশির সময় নারীদের প্রতি কিছুটা শিথিলতা বা সম্মানের সুযোগ নেয় মাদক সিন্ডিকেট। অনেক সময় নারী পুলিশ সদস্য ছাড়া সাধারণ তল্লাশিতে মাদক শনাক্ত করা কঠিন হয়, এই সুযোগটিই নেয় গডফাদাররা।

৩. স্বামী-স্ত্রী বা ভাই-বোন সেজে ভ্রমণের ছলে মাদক পাচার করা হয়। ৭ মে গ্রেফতার হওয়া ইসরাত জাহানও তার সহযোগীর সাথে যাত্রী সেজে মাদক বহন করছিলেন।

৪. গোয়ালীমান্দ্রা ও মালির অংক এলাকার চিহ্নিত মাদক আস্তানাগুলোতে অনেক সময় নারীদের পাহারাদার বা সোর্স হিসেবে রাখা হয়, যাতে পুলিশের উপস্থিতি টের পেলে দ্রুত সংকেত দেওয়া যায়। 

'অল আউট' অভিযানে পুলিশের পাল্টা কৌশল:

মাদক কারবারিরা নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও পুলিশ এখন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি আঘাত হানছে। লৌহজং থানা ও ডিবি পুলিশ এখন বিশেষ অভিযানে নারী পুলিশ সদস্যদেরও সাথে রাখছে। গোয়ালীমান্দ্রা ও বেজগাঁওয়ের মতো সংবেদনশীল এলাকায় নারী পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ঘর ও শরীর তল্লাশি বৃদ্ধি করা হয়েছে।আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, "মাদক সিন্ডিকেটের বড় বড় গডফাদাররা নিজেরা ধরা পড়ার ভয়ে অসহায় বা প্রলোভিত নারীদের দিয়ে মাদকের চালান আনা-নেওয়া করছে। তবে মে মাসের 'অল আউট' অভিযানে আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নারীদেরও আইনের আওতায় আনছি।"

মোবাইল ব্যাংকিং ও সাংকেতিক ভাষা: 

মাদক বিক্রির টাকা এখন সরাসরি হাতে লেনদেন না করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয়। এছাড়া ‘চাউল’, ‘মিষ্টি’ বা ‘লাল চা’র মতো সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে মাদকের অর্ডার নেওয়া হয়।

জিরো টলারেন্স ঘোষণা:

মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, “মাদকের সাথে কোনো আপস নেই।” মাদক সেবী থেকে শুরু করে গডফাদার পর্যন্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো উপজেলার যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং মাদকের ‘বিষ দাঁত’ চিরতরে ভেঙে দেওয়া। লৌহজং থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রুজু করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মাদকের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের গডফাদারদের গ্রেফতারে আমরা বদ্ধপরিকর। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড ভিত্তিক তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। মে মাসজুড়ে এই ‘অল আউট’ অভিযান চলবে।

এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:

দীর্ঘদিন পর মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন কঠোর অবস্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু ছোট বিক্রেতা নয়, মাদকের মূল যোগানদাতাদেরও এই আইনের আওতায় আনতে হবে।

এখানে ক্লিক করুন - আরও পড়ুন : গোয়ালীমান্দ্রায় মাদকের রাজত্ব: মাদকের বিষে নীল লৌহজং

পরিশেষে বলবো, লৌহজংয়ে পুলিশের এই ‘অল আউট’ অভিযান কেবল একটি নিয়মিত কার্যক্রম নয়, বরং এটি উপজেলার যুবসমাজকে রক্ষার একটি বিশেষ মিশন। রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক পরিচিতি ছাপিয়ে মাদকের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান যদি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং সাধারণ মানুষ তথ্যের আদান-প্রদান দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করে, তবেই লৌহজং থেকে মাদকের ‘বিষ দাঁত’ চিরতরে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে। একটি মাদকমুক্ত ও সুন্দর লৌহজং গড়তে এই সাঁড়াশি অভিযানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত