ব্যবসা ও রাজনীতির যোগসাজশের প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর পড়ছে: ইফতেখারুজ্জামান

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬, ১৪:১০ |  আপডেট  : ৯ মে ২০২৬, ১৫:০৬

বাংলাদেশে রাজনীতি ও ব্যবসার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি সরাসরি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সুশাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষ দিনের আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের আয়োজন করে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ শীর্ষক সেশনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির পরিসর যত সংকুচিত হচ্ছে, গণমাধ্যমও তত বেশি চাপে পড়ছে। তার মতে, যখন রাজনীতি ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে মিশে যায় এবং ব্যবসা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে না।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ায় সমস্যা নেই। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করা হয় অথবা ব্যবসাকে রাজনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের বাস্তবতায় সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গণমাধ্যমের ওপরও অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রভাব, ধর্মীয় প্রভাব, পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের মতো বিভিন্ন শক্তির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যমও স্বাধীন অবস্থানে থাকতে পারছে না। মিডিয়ার মালিকানা, নীতিনির্ধারণ এবং সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘জিরো সাম গেম’ বা প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি হারিয়ে দেওয়ার রাজনীতি চালু রয়েছে। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ভিন্নমত দমন এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সমালোচনা বা ভিন্ন মতকে অনেক সময় রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো হুমকি হিসেবে দেখে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত দুই দশকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ বেড়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও অবস্থানের পরিবর্তনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে তিনি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। বক্তব্যে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনের সমালোচনা করে বলেন, এসব আইনের আওতায় বহু সাংবাদিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং অনেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিহিংসা ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে।

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আনোয়ার শাকিল এবং সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত