কৃষি বিভাগে কোন তথ্য নেই
কাউনিয়ায় নামের উৎস ফসল হারিয়ে যাচ্ছে কাউনের চাষ
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬, ১৮:৩৭ | আপডেট : ৯ মে ২০২৬, ২১:৪৫
যে ফসলের প্রাচুর্যে নাম হয়েছিল কাউনিয়া উপজেলা, সেই কাউনের চাষই আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামবাংলার খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল কাউন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, কৃষকদের অনাগ্রহ, দুর্বল বাজারব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই ফসল এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও তিস্তা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো আর কোথাও বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে কাউনের আবাদ নেই। হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক শখের বসে সামান্য পরিমাণে কাউন চাষ করছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও এসব চরাঞ্চলে সবুজ কাউনের ক্ষেত ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় কাউন ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ফসল। গ্রামীণ আতিথেয়তায় কাউনের পায়েস, ক্ষীর, মলা ও নানা ধরনের খাবার পরিবেশন ছিল মর্যাদার বিষয়। এমনকি দেড় যুগ আগেও চরাঞ্চলের অনেক পরিবার ভাতের বিকল্প হিসেবে কাউন খেত। রাজা-জমিদারদের আমলেও কাউনের তৈরি খাবার ছিল অভিজাতদের পছন্দের তালিকায়।
কৃষকদের ভাষ্য, আশানুরূপ ফলন না পাওয়া, উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম এবং সঠিক বাজারব্যবস্থার অভাবে তারা কাউন চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। চর ঢুসমারা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “আগে কাউন চাষ করে সংসার চলত। এখন ফলন কম, বাজারে দাম নেই তাই বাধ্য হয়ে অন্য ফসল করছি।”চর নাজিরদহ গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, “ভুট্টা ও ধান চাষে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা কাউন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।”গদাই গ্রামের কৃষক আলামিনের আশঙ্কা,“এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক যুগের মধ্যে কাউনের চাষ পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কাউন চাষে তেমন কোনো উৎসাহ বা প্রণোদনা না থাকায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন কমছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাউনের আবাদ এতটাই কমে গেছে যে এর নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আকতার বলেন,“এখন কাউন মূলত পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু শৌখিন পাখি পালনকারী এর ক্রেতা। আমরা কৃষকদের ধানের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।” তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও জলবায়ু সহনশীল ফসল হিসেবে কাউনের সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত জাতের বীজ, কৃষকদের প্রণোদনা এবং কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কাউনের চাষ আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এলাকাবাসীর দাবি, কাউনিয়ায় কাউনের ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রæত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হোক। নচেৎ একসময়কার জনপ্রিয় এই খাদ্যশস্য ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত