উদীচী কার্যালয়ে ধ্বংসস্তূপ প্রদর্শনী
হামলা ও অগ্নিসংযোগের ২৪ দিন পরও সরকারের কেউ খোঁজ নেয়নি: উদীচী
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:২১ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:০৯
সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা–অগ্নিসংযোগে পুড়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক উপকরণের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ৫৭ বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নথিপত্র, বাদ্যযন্ত্র, নাটকের কস্টিউম, প্রপসসহ সংগঠনটির ক্ষয়ক্ষতি জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ঢাকায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি।সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নৃশংস এই হামলা–অগ্নিসংযোগের ২৪ দিন পার হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি খোঁজখবর নেননি।
ন্যূনতম সহানুভূতিও প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান জামসেদ আনোয়ার। তিনি বলেন, সংস্কৃতি উপদেষ্টার ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। দেশের বৃহত্তম, ঐতিহ্যবাহী ও গণভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনটির ওপর এমন হামলার পরও সংস্কৃতি উপদেষ্টার এমন নির্লিপ্ততা অনেক সংশয়, প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এই হামলাকে সুপরিকল্পিত বলে অভিহিত করেন জামসেদ আনোয়ার। তিনি বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী শক্তি এতে জড়িত। উদীচী কার্যালয় ছিল বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান। আজ সেই কার্যালয় ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ছায়ানট, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলা হয়। পরের দিন হয় উদীচী কার্যালয়ে হামলা। হামলার এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সুপরিকল্পিত আক্রমণ।
জামসেদ আনোয়ার বলেন, প্রকাশ্য সমাবেশে ছাত্রশিবির নেতাদের দেওয়া হামলার হুমকির বিষয়টি সবার জানা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের নিস্পৃহতাই এই বর্বরতার পথ সুগম করেছে।
উদীচী কার্যালয়ে হামলার দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল উল্লেখ করে জামসেদ আনোয়ার বলেন, কিন্তু পুলিশের সহায়তা পাওয়া যায়নি।
জামসেদ আনোয়ার বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছিলাম। বিকেল চারটার দিকে ছায়ানট ভবনের সামনে প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর ফেরার পথে উদীচীতে হামলার খবর পাই।’
জামসেদ আনোয়ার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য বার্ষিক সরকারি অনুদান দিতে পরিকল্পিতভাবে এ বছর উদীচীকে বাদ দিয়েছে। এ ঘটনা তাঁদের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও অগ্রহণযোগ্য। উদীচীর পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। উদীচীকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না।
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম বলেন, হামলার পর উদীচীর পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ইতিমধ্যে আলামত সংগ্রহ, প্রাথমিক তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। কিন্তু এখনো কোনো আসামি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়নি। তাঁরা অবিলম্বে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে দেশের জনগণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যতে উদীচী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবে।
সংগঠনটি কার্যালয় পুনর্গঠনের জন্য সাধারণ জনগণ ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। নির্ধারিত ব্যাংক ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সহায়তা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন হাবিবুল আলম।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর: চলতি হিসাব-বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় সংসদ, নম্বর ০০০২৬০২০০৬০১৮, সোনালী ব্যাংক, লোকাল অফিস শাখা, ঢাকা, রাউটার নম্বর-২০০২৭৩৮৮২। বিকাশ নম্বর: ০১৯৬৫৮৪৪৬৮৭ (পার্সোনাল)।
উদীচীর পুড়ে যাওয়া কার্যালয় ও ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন শেষে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এমন অনুভূতি এর আগে হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর। সেদিন বেতিয়ারায় পাকিস্তানি বাহিনী মানুষ হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দিয়েছিল। গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একই রকম গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ওপর এমন হামলাকারীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি বলে মন্তব্য করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
ধ্বংসস্তূপ প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, উদীচীর সহসভাপতি রফিকুল হাসান জিন্নাহ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি নিখিল দাস, সহসভাপতি কামরুজ্জামান ভুঁইয়া, সমাজচিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক কামাল হোসেন বাদল, প্রগতি লেখক সংঘের কোষাধ্যক্ষ দীনবন্ধু দাস, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের বিমল কান্তি দাস, মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশিদ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সম্মিলিত কণ্ঠে সংগঠনের সংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর সদস্যরা।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত