দ্রুত নতুন ভবন চায় অভিভাবকরা
সিরাজদিখানে জীর্ণ স্কুলভবনে সন্তানদের পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা
অভিষেক দাস-সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:২২ | আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:২৪
ভবনের পলেস্তরা খুলে পড়ছে অন্তত সাত বছর থেকে। চাপে বাঁকা হয়ে গেছে জানালা-দরজা। খুলেও গেছে কয়েকটা। সেই ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের চলত পাঠদান। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামের ৯০ নং সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। জীবনের ঝুঁকি জেনেও প্রতিদিন ভয় নিয়েই ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। অন্যদিকে ছোট ছোট শিশুদের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকছেন অভিভাবকরা। জানা গেছে, বহুবার নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভয়ে আতংকে অসংখ ছাত্রছাত্রী স্থানীয় মাদ্রাসাসহ স্কুলে অন্যত্র চলেগেছে।
শিক্ষকরা বলছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা না বুঝে নিরাপদে থাকলেও তারা আছেন আতঙ্কে। নতুন ভবন না হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না বলে জানান তারা। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি তাদের।
নাটেশ^র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২০ সালে। ১৯৭২ সালে স্কুলটি সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করা হয় বর্তমান ভবনটি। সম্প্রতি সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও পাঠদান বন্ধ চলমান রয়েছে।
বিদ্যালয়সূত্র ও সরেজমিনে দেখা যায়, নাটেশ^র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ৯৪ শিক্ষার্থী। এখানকার ফলাফল ভালো হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাঠদানের জন্য নিয়ে আসেন। তবে বাড়ি থেকে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে অভিভাবকরা থাকেন আতঙ্কে। কখন যে কী হয়ে যায়!
শিক্ষকরা জানান, ১৯৯৬ সালে নির্মাণের পর ২০০০ সাল থেকেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা যেতে শুরু করে। তখন থেকেই খুলে পড়তে থাকে পলেস্তারা। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পড়ে পানি।
সিরাজদিখান প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানা গেছে, সিরাজদিখান উপজেলায় ১২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার হার ৭১ দশমিক ০৫ শতাংশ। তবে উপজেলায় প্রায় ২৬ বিদ্যালয়ই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাথমিক মহাপরিচালক অফিসে তালিকা পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে এই ভবনগুলো নতুনভাবে আসবে। কোনো কোনো স্থানে নতুন ভবনের কাজ শুরুর তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনির শিক্ষার্থী শাহাজালাল জানায়, আমাদের বিদ্যালয় ভবনটি অনেক পুরোনো, যা মাঝে মাঝেই ধসে যায়। তাই আমাদের শিক্ষকরা আমাদের ক্লাসের নিরাপদ স্থানে বসিয়ে ক্লাস নেন।
বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী শিফা আক্তার জানায়, কিছুদিন আগে তাদের ক্লাস চলার সময় পলেস্তরা খসে পড়েছিল। এমনকি তাদের ক্লাসের ফ্যানও খুলে পড়েছিল, যা থেকে তারা অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
শিক্ষার্থী অভিভাবক বাবলী আক্তার বলেন, বিদ্যালয়টি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের সন্তানরা বিদ্যালয়ে এসে অনেক ভয়ে ভয়ে থাকে। পলেস্তরা মাঝে মাঝে খসে পড়ে। আমরা তাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকি। তারা বাসায় গিয়েও বলে বিদ্যালয়ের ভবন পুরোনো, এটি নতুনভাবে করা দরকার।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সানজিদা খানম বলেন, আমি এ বিদ্যালটিতে ২০১০ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। এখানে আসার পর থেকেই এই জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস নিচ্ছি। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় কখন কী হয়। একবার সিলিং ফ্যান একবার পলেস্তরা খুলে পড়েছে। আমরা মনোযোগ সহকারে এখানে থাকতে পারি না। বিদ্যালয়ের নতুন একটা ভবন হলে সবার চিন্তা একবারে শেষ হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম বলেন, আমি বিদ্যালয়ে যোগদানের পর এখানে বড় ধরনের কোনো মেরামত হয়নি। জীর্ণ স্কুলভবনে সন্তানদের পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা। ইতোমধ্যে ২টি বড় দুর্ঘটনা থেকে আমার বাচ্চারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। এখন এ জন্য অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাশের স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। স্কুলে পড়াশুনা ভালো নতুন ভবন আসলে অনেক ছাত্রছাত্রী এই বিদ্যালয়ে আবার চলে আসবে।
সিরাজদিখান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা রফিকুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের নামের তালিকা উপজেলা অনুযায়ী অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে মহাপরিচাল মহোদয়ের অফিসে পাঠানো হয়েছে। পাঠদান কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হচ্ছে না। আশা করছি, শিঘ্রই এই বছরের মধ্যেই আমরা নতুন ভবন পেয়ে যাব। সেইসঙ্গে নতুন আসবাবপত্র সরবরাহের মাধ্যমে আবারও সম্পূণরুপে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব।
এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা দ্রুত বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন ও নিরাপদ ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্ত ক্ষেপ জরুরি।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত