গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মসলা বাটার

শিলপাটা ধারের কারিগরদের কাউনিয়ায় হাক ডাক আর শোনা যায় না

  সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৭:৪১ |  আপডেট  : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:০৩

আধুনিক ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার, চটকধরা মোড়কে প্যাকেটজাত মসলার সহজলভ্যতা, লোকশিল্প শিলপাটার ব্যবহার কমে যাওয়ায় শিলপাটা ধার কারিগররা তাদের পেশা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অনেকে পরিবার বাচাঁতে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন, ফলে গ্রাম বাংলার এই প্রাচীন লোকশিল্প ধিরে ধিরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 

সরেজমিনে কাউনিয়ায় বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বয়স্ক মানুষ ও গৃহীনিদের থেকে জানাগেছে, আগে গ্রামের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে উচ্চ স্বরে শিলপাটা ধার কাটান, শিলপাটা ধার কাটান, বলে খোদাই শিল্পীরা হাঁকডাক দিতেন, তখন গৃহিণীরা মসলা বাটার শিলপাটা ধার কাটিয়ে নিতেন। গৃহিণীদের শিলপাটায় মসলা বাটা ছিল নিত্যদিনের কাজ। রান্নার আগেই গৃহিণীরা শিলপাটা নিয়ে মসলা বাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিলপাটা। বেকার হচ্ছে এ শিল্পের সাথে জড়িত শতশত শ্রমিক। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে শিলপাটা ও এ শিল্পের সাথে যুক্ত কারগররা প্রায় বিলুপ্তির পথে। শিলপাটা খোদাই শিল্পীরা জীবন জীবিকার তাগিদে বেছে নিচ্ছেন অন্য পেশা। কেউ কেউ শতকষ্ট উপে¶া করেও ধরে রেখেছেন ঐতিহ্যের পেশাটি। তাদেরই একজন মমিনুল। তিনি জানান শিলপাটার ব্যবহার নেই, বিয়ে বাড়িতে দু-তিন দিন আগে থেকে মশলা, হলুদ-মেন্দি বাটা হয় না। বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আর প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে শিলপাটায় মসলা বাটায় উৎসাহী নয় এ প্রজন্মের নারীরা। বাজারে সুন্দর প্যাকেটে হলুদ, মেহেদি বাটা পাওয়া যায়। শুধু শহরে নয়, গ্রামগঞ্জেও পৌঁছে গেছে সব ধরনের মসলাজাতীয় প্যাকেট। তাই কালের প্রবাহে বাঙালির সমাজব্যবস্থার পারিবারিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিলপাটার ব্যবহার। কাউনিয়ায় আগে প্রতিনিয়তই দেখা মিলত শিলপাটা কারিগরদের। হাতুড়ি, ছেনি নিয়ে বিভিন্ন বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁকডাক দিতেন, শিলপাটা ধার করবেন শিল পাটা......। সেই হাকডাক এখন আর শোনা যায় না। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জীর্ণশীর্ণ দেহ। তবু হেঁটে ছুটে চলছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। হাতে রয়েছে হাতুড়ি বাটাল আর ছেনি। এসব যন্ত্রের সাহায্যে ঠুকে ঠুকে করছেন শিলপাটা ধার দেয়ার কাজ। সেই রকম একজন হলেন রংপুরের লালবাগ কেডিসি রোডের শিলপাটা ধারকাটা কারিগর মমিনুল। হরিশ^র গ্রামে চোখে কালো চশমা পরে ঠুক ঠুক শব্দে শিলপাটা কেটে চলছেন কাঠঠোকরা পাখির মতো। তিনি জানান আগে শিলপাটা খোদাই কাজের কদর ছিল এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রভাবে অনেক কমে গেছে। দিনে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় হয়। এই আয়ে সংসার চলে না, অনেকেই জীবিকার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। কেউবা বাপ-দাদার এ পেশায় থাকলেও মানবেতর জীবন করছে। ঈদুল আজহার পূর্ব ছাড়া এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। হরিশ্বর গ্রামের রহিমা বেগম জানান, আগে প্রতিটি বাড়িতে শিলপাটা ছিল মসলা বাটার জন্য কিন্তু যান্ত্রীকতায় এখন মেশিনেই তৈরি হয় মসলা। শিলপাটার ব্যবহার নেই বললেই চলে তবে আমি মেশিনে ভাঙানো মশলা ব্যবহার করি না, কারন হাতে বাটা মশলায় তৈরি খাবারের স্বাদই আলাদা। এলাকার বাবুচি কালাম জানান, এই অঞ্চলে শিলপাটা বিলুপ্তির পথে। এখন সবাই প্যাকেট মসলা ও ব্যালেন্ডারে মশলা খায়। শিলপাটা ব্যবহারের সুযোগ কমে যাচ্ছে। 
 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত