রম্যলেখক আতাউর রহমান
নূরুদ্দিন দরজি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৪৮ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩২
ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীতে মানুষ আসে আবার চলে যায়। সকল মানুষকেই চলে যেতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ চলে গেলে তাদের জন্য মন কাঁদে,মনের গহীনে ক্ষত সৃষ্টি হয়। বেদনায় হৃদয় ভারাক্রান্ত হয় । বারবারই তাদের কথা মনে পড়ে, স্মৃতিতে ভাসে তাদের কর্মসাধনা আর কীর্তিগুলো। মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য আর কিছুই নেই। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা র’বে- কবির এ কথায় প্রকৃতির অমোঘ সত্যই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। চিরসত্য সেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চলে গেলেন রম্য সাহিত্যজগতের অতি চেনামুখ আতাউর রহমান। তাকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিছুটা দেখা হয়েছে তার কয়েকটি রম্য-রসাত্মক প্রবন্ধ পড়ার মাধ্যমে। তাও আবার বেশিরভাগ পত্রিকার পাতায়। আতাউর রহমান বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় রম্য লেখক ছিলেন। তার অনেক লেখা আছে যার আমি কিছুই পড়তে পারিনি। তবে যে কটি পড়েছি, অভিভূত হয়েছি। অনুভূত হয়েছে বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গভীরতা। লেখাগুলো যে কেউ পড়লেই তাকে নিয়ে যাবে হাসিতে ভরা বুদ্ধিদীপ্ত জগতে। যে কোন পাঠক আনন্দসাগরে ভাসতে ভাসতে ক্ষণিকেই আবার জ্ঞানপ্রদীপের আলোয় চলে আসবেন, চিন্তার জগৎ হবে প্রসারিত। এমন একজন পাঠকপ্রিয় লেখক আতাউর রহমান, যার জীবনাবসান হয়েছে গত ২৮ আগস্ট। ৭৯ বছরের পরিণত বয়সেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপরও তার এ চলে যাওয়া আমাদের সাহিত্যজগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। একই দিনে বাংলাসাহিত্যের গগন থেকে খসে পড়েছে আরও দুই নক্ষত্র- প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী ও বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনি লেখক শেখ আবদুল হাকিম। অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন বুলবুল চৌধুরী। এ বছর অমর একুশে বই মেলার জন্য ছাপার কাজে বাংলাবাজারে গেলে এ তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। এক সাথে চাও খেয়েছি। আতাউর রহমান করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। এ মরণঘাতী করোনায় দেশের অনেক প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিক,রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মৃত্যু হয়ে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যের।
রম্য লেখক আতাউর রহমানকে নিয়ে আলোচনার পূর্বে রম্যের রস বা হাসি রসাত্মক বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। রম্য, রস বা হাসি হচ্ছে জীবনের অংশ। বিনোদন পাওয়া মানুষের জন্মগত অধিকার। আদিযুগেও কৌতুকের প্রচলন ছিল; যদিও তার ধরন ছিল ভিন্ন। বলা হয়ে থাকে হাসতে পারা সর্বোত্তম ঔষধ। আবার রম্য লেখা পাঠে আত্মসমালোচনারও সুযোগ আসে। রম্য রচনায় হাস্য- কৌতুকের আবরণে তির্যক কথা বলে সমাজের অসঙ্গতি, ব্যক্তির ভুল-ত্রুটি সহজেই তুলে ধরা যায়। রম্য লেখকদের মধ্যে সেন্স অব হিউমার থাকে। রম্য রচনা ‘দুর্জন উবাচ’-এর জন্য সাংবাদিক মরহুম খোন্দকার আলী আশরাফ এখনও স্মরণীয় হয়ে আছেন। 
রম্য যা ইংরেজিতে হিউমার, এ শব্দটি প্রথম ইংরেজ লেখক জোনাথান সুইফট ব্যবহার করেছেন। এক সময় তাঁর বিখ্যাত ‘গালিভার’স ট্রাভেল’ বইটি আমাদের দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। যে বইয়ে তিনি সেই লিলিপুটের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষের সাথে ব্রবডিংনাগের বিশালকায় মানুষের তুলনা ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড দেখিয়ে প্রচুর হাস্যরস তৈরি করেছেন। ইংরেজিতে জন ড্রাইডেনের, মেক ফ্লেকনো ও মার্ক টোয়েনের, এ্যাডভেঞ্চার অব হ্যাকলবারী ফিনসহ অনেক লেখকের বই এখনও পাঠকপ্রিয়। বাংলাসাহিত্যের প্রথম দিকের রম্যলেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় ও প্রমথ চৌধুরী। তবে তাদের রেখার রস আস্বাদনে পাঠককে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয় ভাষার কাঠিন্যের জন্য। পরবর্তী সৈয়দ মুজতবা আলীর হাতে বাংলা রম্যসাহিত্য ন্নি রূপে পাঠকের সামনে আসে। তার ‘রসগোল্লা’ লেখাটির রস এখনও পাঠকদের সিক্ত করে। বাংলাসাহিত্যের প্রাণ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার বিভিন্ন কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে রসবোধের পরিচয় দিয়েছেন। জনৈক তাপস রায় রচিত ‘রসিক রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটি বইও রয়েছে। আসলে রসিকতা বা রম্য স্রষ্টার দেয়া একটি বিশেষ গুণ। এ গুণ সব মানুষের থাকে না। রসিকতা মানুষের মনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, এক ধরনের প্রশান্তি দেয়। একটি রম্য রচনা পাঠান্তে তার অনুরণন পাঠককে অনেকক্ষণ মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারে। যাদের রসিকতাবোধ নেই তারা পৃথিবীর সমস্ত রঙ-রস ও আনন্দ অনেকাংশে বঞ্চিত বলে মনে করা হয়।
নাটক সিনেমায়ও মানুষ অনেক কৌতুকাভিনয়ের দৃশ্য দেখতে পায়, যা হাসিতে পরিপূর্ণ থাকে। সিনেমায় যারা হাস্য-রস সৃষ্টি করেন তাদেরকে চার্লি বা কৌতুকাভিনেতা বলা হয়। কৌতুকাভিনয়ের জন্য চার্লি চ্যাপলিন বিশ্বব্যাপী আজও জনপ্রিয়।
রম্যলেখক আতাউর রহমানের জন্ম ১৯৪২ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের নগর গ্রামে। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি তৎকালীন সিএসপি অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। এক সময় যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের কূটনীতিক ছিলেন। সফল চাকরি জীবনে সর্বশেষ ডাক বিভাগের মহাপরিচালক পদে কাজ করে অবসর নেন। এরপর তিনি দেশের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দেশ-বিদেশে চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক বই লিখেছেন ২৪টি গ্রন্থ। এগুলোর বেশিরভাগই রম্য রচনা। উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে- ‘রম্য সমগ্র’, ‘মধ্য রাতের জোকস’, ‘অল্প অম্ল বিস্তর মধুর’, ‘খোলা হাওয়া’, ‘রম্য রত্ন সম্ভার’, ‘সেরা রম্য’, ‘নঞতৎপুরুষ’, ‘দুই দু গুণে পাঁচ’, ‘সাত পাঁচে তেরো’, ‘সাত সতেরো’ ইত্যাদি। তার লেখা ‘খন্ডিত ও পন্ডিত’ এর ব্যাখ্যা পড়লে অতিগম্ভরি ব্যক্তিও না হেসে পারবেন না। ২০১৯ সালের ৯ মে তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনে, প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘দুর্নীতির বিষয়ে সাদাসিধে কথা’য় দেশ-বিদেশের নানা রঙের উদাহরণ হাস্যোৎপাদনের পাশাপাশি তির্যক বাক্যে কঠিন সত্যের উন্মোচন করেছে। আতাউর রহমান হাস-রসের মাধ্যমে সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন অসঙ্গতি ও অব্যবস্থাকে। আজ তিনি নেই। তার চির প্রস্থানের মধ্য দিয়ে রম্য সাহিত্যের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আমরা তার আর কোনো নতুন সৃষ্টির দেখা পাবো না। তবে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, সেগুলো তাকে বাঁচিয়ে রাখবে দীর্ঘকাল।
লেখকঃ সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত