প্রশাসনের সহযোগিতা চান ভুক্তভোগী পরিবারগুলো
মাদারীপুরের ১০ যুবকের ১০ মাসেও খোজ মেলেনি
এসআর শফিক স্বপন মাদারীপুর
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৮ | আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:৫৭
উন্নত জীবন গড়ার আশায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাতারীপুরের ১০ যুবকের সন্ধান ১০ মাস ধরে পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের সন্তানদের খোঁজ করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চাইছেন। নিখোঁজ যুবকরা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন-কিছুই জানে না তারা। অভিযোগ রয়েছে, পেয়ারার বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালি থেকে মানবপাচারের নির্দেশনা দেয় এবং ছোট ছেলে সৌরভ পরিবারগুলোর কাছ থেকে টাকা আদায় করে। এই চক্রের সঙ্গে শরীয়তপুরের জালাল কাজীর ছেলে সবুজ কাজী ও লিয়াকত শেখের ছেলে মুজাহিদ শেখ জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে। সবুজ ও মুজাহিদ সম্পর্কে শ্যালক ও দুলাভাই।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, নিখোঁজ ১০ যুবকের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছে। সেই মামলায় তিনজন গ্রেফতার রয়েছে। বাকি পরিবারগুলো লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাত্রা না করার বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না। এতে অকালেই প্রাণ যাচ্ছে এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানবপাচার বন্ধে সবার সচেতন হওয়া জরুরি।
জানে না পরিবারগুলো। অথচ প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে একটি দালালচক্র। সেই টাকায় দালালরা রাতারাতি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করলেও নিখোঁজ যুবকদের খোঁজ নিতে গেলেই চক্রের সদস্যরা লাপাত্তা হয়ে যান। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে সরকারের সহযোগিতা চাইছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
নিখোঁজ যুবকেরা হলেন-মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার আনোয়ার বেপারীর ছেলে লিমন বেপারী (১৯), একই এলাকার হেমায়েত মাতুব্বরের ছেলে রবিউল মাতুব্বর (২২), দত্তেরহাট এলাকার টিটু মাতুব্বরের ছেলে মো. জয় মাতুব্বর (২০), একই এলাকার মোক্তার হাওলাদারের ছেলে জীদান হোসেন হাওলাদার (১৮), মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকার জুলহাস চোকদারের ছেলে ওয়ালিদ হাসান অভি (১৯), পেয়ারপুর ইউনিয়নের মাছকান্দি এলাকার মোহাম্মদ আলী (২২), রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মাচ্চর এলাকার আবুল বাশার মাতুব্বরের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭), একই ইউনিয়নের পাখুল্লা এলাকার হাশেম খাঁর ছেলে আজমুল খাঁ (৩০), মোল্লাকান্দি এলাকার কালু মজুমদারের ছেলে তুহিন মজুমদার (২৩) এবং শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মো. মাহাবুব (২১)।
জানাগেছে, যেখানে এক বছর আগেও ছিল শুধু একটি টিনশেড ঘর, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে ডুপ্লেক্স বাড়ি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মানবপাচারের অর্থেই এসব বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে দালালচক্রের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়।
নিখোঁজ যুবকদের স্বজনরা জানান, মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী পেয়ারার বেগমের প্রলোভনে পড়ে এই যুবকেরা। পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রত্যেককে সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে লিমন বেপারী, জয় আহম্মেদ, রবিউল মাতুব্বর, ওয়ালিদ হাসান, জীদান হোসেন, শরিফুল ইসলাম, আজমুল খাঁ, মোহাম্মদ আলী, তুহিন মজুমদার ও মাহাবুব বাড়ি ছাড়েন। পরে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রাখা হয়।
লিবিয়ায় আটকে রেখে যুবকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। মুক্তিপণের নামে প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে আরও লাখ লাখ টাকা আদায় করে দালালচক্র। সবশেষে গত বছরের এপ্রিলে দালালের মাধ্যমে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে তারা। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের পরিবারগুলো এখন চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে।
নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার বেপারী বলেন, পেয়ারার বেগমের প্রলোভনে পড়ে ছেলে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাধ্য হয়ে পাসপোর্ট ও টাকা দেই। লিবিয়ায় আটকে রেখে মোট ২৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু ১০ মাস ধরে ছেলের কোনো খোঁজ নেই।
জয় এর বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, আমার ছেলে পেয়ারার বেগমের বাড়িতে কাজ করত। সেখান থেকেই তাকে বিদেশ যাওয়ার লোভ দেখানো হয়। লিবিয়ায় নিয়ে একবার মাফিয়াদের হাতে ধরা পড়লে ১২ লাখ টাকা দিয়ে মুক্ত করা হয়। এরপর গত বছরের এপ্রিল থেকে আর কোনো খবর নেই। পেয়ারার বেগমই জানেন আমার ছেলে কোথায় আছে।
শরিফুলের মা রাজিয়া বেগম বলেন, গত বছরের ১২ এপ্রিলের পর থেকে পেয়ারার বেগম ও তার লোকজন আমার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি। ছেলে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে-তাও জানি না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই। আর পেয়ারা ও এই দালালদের কঠিন বিচার চাই।
অভিযোগ রয়েছে, পেয়ারার বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালি থেকে মানবপাচারের নির্দেশনা দেয় এবং ছোট ছেলে সৌরভ পরিবারগুলোর কাছ থেকে টাকা আদায় করে। এই চক্রের সঙ্গে শরীয়তপুরের জালাল কাজীর ছেলে সবুজ কাজী ও লিয়াকত শেখের ছেলে মুজাহিদ শেখ জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে। সবুজ ও মুজাহিদ সম্পর্কে শ্যালক ও দুলাভাই।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, নিখোঁজ ১০ যুবকের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছে। সেই মামলায় তিনজন গ্রেফতার রয়েছে। বাকি পরিবারগুলো লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাত্রা না করার বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না। এতে অকালেই প্রাণ যাচ্ছে এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানবপাচার বন্ধে সবার সচেতন হওয়া জরুরি।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত