বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে মানবাধিকারে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান অ্যামনেস্টির
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ | আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৪
নির্বাচন পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সব পর্যায়ে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নকে কর্মসূচির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশের সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এ বিষয়ে ‘হিউম্যান রাইটস প্রায়োরিটিজ অ্যাহেড অব ন্যাশনাল ইলেকশন’ শীর্ষক ১০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। এতে তুলে ধরা হয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, উপজাতি সম্প্রদায় ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারীর অধিকার সহ বিভিন্ন বিষয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে তারা উল্লিখিত বিষয়গুলোকে প্রধান মানবাধিকার বিষয়ক উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয় এবং নির্বাচিত হলে নিজেদের নীতিগত কর্মসূচিতে এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে দায়িত্বগুলো যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকারের পালন করা আবশ্যক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (সিএসএ) সংশোধনের অঙ্গীকার করলেও, আইনটি একাধিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মে ২০২৫-এ সিএসএ সংশোধনের জন্য সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স (সিএসও) জারি করা হয়। তবে এই অর্ডিন্যান্সেও অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত ধারাসমূহ রয়ে গেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করে। ফলে তার অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
এছাড়া, অন্যান্য আইনও সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষত যাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে মনে করা হয়। যেমন, ১৫ ডিসেম্বর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (এটিএ) অধীনে আটক করা হয়। একইভাবে, ২৮ আগস্ট সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্নাকে অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এটিএ’র আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগের দিন তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান বিষয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখছিলেন। সেখানে বক্তাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থক বলে অভিযুক্ত করার পর আলোচনা সভা ব্যাহত হয়।
সম্প্রতি রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষগুলোর হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো-এর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদককে হয়রানি করা হয়। প্রত্যেক মানুষের মতপ্রকাশ ও মতামতের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে এবং একটি স্বাধীন গণমাধ্যম আইনশাসনভিত্তিক সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে নিশ্চিত করতে হবে- এই অধিকার শুধু সুরক্ষিতই নয়, বরং সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত ও বিকশিত করা হচ্ছে।
এতে জবাবদিহি অংশে বলা হয়, ১ জুলাই ২০২৪, অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এই সংস্কারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও যুদ্ধাহতদের উত্তরসুরিদের জন্য ৩০ ভাগ কোটা পুনর্বহাল করা হয়, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সুবিধা দেয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও, ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং যুব লীগের সদস্যরা নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংস হামলা চালায়। তারা লাঠি, রড ব্যবহার করে, এমনকি কেউ কেউ রিভলভার বহন করছিল।
এরপর যে দমনপীড়ন শুরু হয়, তা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়াবহ। কর্তৃপক্ষ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, ছররা গুলি ভর্তি শটগান, প্রাণঘাতী গুলি ভর্তি অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করে এবং সাঁজোয়া যান দিয়েও জনতার ওপর আঘাত হানে। ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ জারি করা হয়, দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।
৪ আগস্ট আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার বাসভবনের দিকে মিছিল করে তার পদত্যাগ দাবি জানায়। অবশেষে, সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানালে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) তাদের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছে- কমপক্ষে ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন (এর মধ্যে আনুমানিক ১৬৮-১৮২ জন শিশু) এবং ১১,৭০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় আরও ২৫০ জন, যার মধ্যে পুলিশ সদস্যও ছিলেন, নিহত হন। একই সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও হামলার শিকার হন।
ওএইচসিএইচআর উপসংহারে পৌঁছেছে যে, সাবেক সরকার এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জ্ঞাতসারেই পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে লিপ্ত ছিল। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার রক্ষায় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে, যেখানে বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার গভীর সংকট রয়েছে। এই বিষয়টি ধারাবাহিক সরকারগুলোর হাতে দুর্বল ও স্বাধীনতাহীন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রস্তাব কিংবা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানোর মতো আন্তর্জাতিক নজরদারি উদ্যোগ বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি, সংস্কার এবং জবাবদিহির পথে অগ্রযাত্রাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতে পারে।
আরও বলা হয়, ধারাবাহিক সরকারগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে উপজাতি জনগোষ্ঠী এখনো বৈষম্য ও প্রান্তিকতার শিকার। ৭ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে সশস্ত্র কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট পরিচালিত একটি ব্যাংক ডাকাতি ও জিম্মি ঘটনার পর ১৪২ জন বম জনগোষ্ঠীর মানুষকে যার মধ্যে শিশুরাও ছিল গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় অন্তত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইভাবে, ১৯ ডিসেম্বর থেকে টানা পাঁচ দিনে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার তিনটি ভিন্ন এলাকায় সাতটি বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, নারীরা তাদের মানবাধিকার পূর্ণভাবে ভোগ করার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। এর মধ্যে রয়েছে সহিংসতা, বৈষম্য ও প্রান্তিকতা। শিশু বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী নারীদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারিত হলেও, ৮ মার্চ ২০২৫ প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ২০২৩ সালে পরিচালিত সরকারি জরিপে (২৪ বছর বয়স পর্যন্ত নারীদের মধ্যে) ৮.২ ভাগ নারীকে বয়স ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ৪১.৬ ভাগ নারীকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ৬ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দল একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারীর হার মাত্র ৪.২৪ ভাগ এবং কোনো দলই ১০ জনের বেশি নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এর আগে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪.৮৬ ভাগ, আর ২০১৮ সালে ছিল ৩.৬৭ ভাগ। রাজনৈতিক জীবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে নারীদের এই ধারাবাহিক বর্জন নারীদের জীবনযাত্রা এবং সমাজের ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিভিন্ন অপরাধের জন্য এখনও মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে এবং তা কার্যকর করে যাচ্ছে, এমনকি এমন অপরাধের ক্ষেত্রেও যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’ সীমাবদ্ধ থাকার কথা। বাংলাদেশ যদিও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র, তবুও এখনও পর্যন্ত এই সনদের প্রথম ও দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রোটোকল, যেগুলোর লক্ষ্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা তাতে স্বাক্ষর বা অনুমোদন করেনি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। এই পরিস্থিতি সরকারকে মৃত্যুদণ্ডের ওপর সরকারি স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) আরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দেয়, যা ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পথে অগ্রসর হওয়ার ভিত্তি হতে পারে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত