'দল বাঁচাতে' শীর্ষ নেতাদের দেশে ফিরতে বলছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৭ |  আপডেট  : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৪৩

"মনে করেছিলাম বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমরা হয়তো একটু এলাকায় ফেরার সুযোগ পাবো। সাংগঠনিক কার্যক্রমও হয়তো ধীরে ধীরে শুরু হবে। আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞাও থাকবে না। কিন্তু এখন যেটা হলো, এটা আমরা আশা করি নাই। অবস্থা আগের মতোই।"

কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন তৃণমূল নেতা আরিফুল ইসলাম। এটি তার ছদ্মনাম। মি. ইসলাম ঢাকার বাইরে আওয়ামী লীগের একটি জেলার উপজেলা কমিটির সেক্রেটারি।

তিনি যেটা বলছেন, তৃণমূলে আওয়ামী লীগের অনেকের মনোভাব একইরকম।

মূলত: নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ হয়তো কিছু কার্যক্রমের সুযোগ পাবে এমনটাই আশা ছিলো আওয়ামী লীগের অনেকের।

কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, তেমনটা তো ঘটেইনি বরং বিএনপি সরকারের সময়ে এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিলও সংসদে পাস হয়ে গেছে।

ফলে আইনগতভাবে আওয়ামী লীগের সামনে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ আর থাকলো না।

কিন্তু এমন অবস্থায় কী ভাবছেন দলটির শীর্ষ নেতারা? আবার নেতাদের বেশিরভাগটাই যখন বিদেশে, তখন তৃণমূলেই বা এর কী প্রভাব পড়ছে?

নির্বাচনের পর কার্যালয় খোলার চেষ্টা, এখন কী অবস্থা?
বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় খুলতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের।
তবে সেগুলো ছিলো অনেকটাই ঝটিকা তৎপরতা। অর্থাৎ অল্পসময়ের জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত কার্যালয়ে গিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢোকা এবং কিছুক্ষণ শ্লোগান দিয়ে আবার বের হয়ে যাওয়া।

আওয়ামী লীগের এরকমই একটি কার্যালয় খুলনা শহরের হাদিস পার্কে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় যেটি ব্যাপক হামলা-ভাঙচুরের শিকার হয়।

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিনের মাথায় সেই কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে।

অফিসের নীচতলার কলাপসিবল গেটের তালা খুলে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে তারা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং শ্লোগান দেন।

কিন্তু সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আবারও কার্যালয়টি হামলার শিকার হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের আর কোনো নেতা-কর্মী কার্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেননি বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থাতেই আছে।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খুলনার মতোই এরকম দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ কিংবা কার্যালয় খোলার চেষ্টা করেছিল আওয়ামী লীগ।

একদিকে নির্বাচনে বিএনপির বিজয়, অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা -সেসময় এসবের পেছনে বিএনপির প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকতে পারে, এমন আলোচনা তৈরি হয় রাজনীতিতে। যদিও বিএনপি সেটা অস্বীকার করে।

তবে বাস্তবতা যেটাই হোক, শেষ পর্যন্ত দেশের কোনো স্থানেই পরে আর আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা রাখা বা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়নি। যদিও দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মনে করেছিলেন নির্বাচনের পর দলীয় কার্যক্রম 'সীমিত পর্যায়ে' হলেও শুরু করা যাবে।

এমনকি খুলনায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার চেষ্টার পেছনে স্থানীয় বিএনপি এবং জামায়াতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে, এমন আলোচনাও পাওয়া যায় খুলনার রাজনীতিতে। তবে বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই সেটা নাকচ করেছে।

খুলনায় আওয়ামী লীগের একজন নেতা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আপাতত: আত্মগোপনে থেকে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করাটাই এখন তাদের দলীয় কাজ'।

তিনি বলেন, "গ্রাম পর্যায়ের যারা কারাগারে আছেন, তাদের অনেককেই বের করা হয়েছে। বাকি যে দুয়েকজন আছে তাদেরকেও বের করার চেষ্টা হচ্ছে। এক/দুইজন করে কাউকে কাউকে আমরা এলাকায় পাঠাচ্ছি। দেখার চেষ্টা করছি কী হয়। অনেকেই এখন এলাকায় ফিরতে পেরেছেন।"

নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে পারে, এমন ধারণার কারণ কী?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে টানাটানি ছিল বিএনপি এবং জামায়াত -দুই দলের মধ্যে।

এইসময়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকেই এলাকায় ফেরার সুযোগ পান। তারা ফিরতে গিয়ে বাধার মুখেও পড়েননি। কারণ তাদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা ছিল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

"আমাকে বিএনপির প্রার্থী নিজেই ফোন দিয়েছিল। উনি বললো এলাকায় আসেন। আমি এলাকায় যাওয়ার পর জামায়াতের প্রার্থীও আমার কাছে এসে ভোট চায়। তবে আমি কারো পক্ষে প্রচারণায় নামিনি।"
বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন নেতা।

তবে এলাকায় ফিরতে পারলেও রাজনীতির সুযোগ নেই বলে জানাচ্ছেন তিনি।

তিনি বলেন, "রাজনীতি করতে গেলেই কিন্তু জামায়াতও ধরবে, বিএনপিও ধরবে। মানে আমি এলাকায় থাকি, ব্যবসা করি, চলাফেরা করি -এসবে সমস্যা নাই। কিন্তু রাজনীতি বা এরকম কিছু করার চেষ্টা করলেই সমস্যা হবে। যদিও মনে করেছিলাম নির্বাচনের পরে রাজনীতি আটকাবে না। কিন্তু অবস্থা আসলে খারাপ।"

তৃণমূলের সাধারণ নেতারা এলাকায় ফিরতে পারলেও দলের মধ্যে যারা আবার একটু বড় নেতা তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এদের অনেকের নামেই আবার মামলা আছে।

আওয়ামী লীগের একটি উপজেলা সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলছিলেন, কমিটির যারা সভাপতি, সেক্রেটারি এবং এর কাছাকাছি পদে আছে তাদের এলাকায় ফেরা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন,"আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি যে, আমরা যেতে পারবো কিনা। আমরা পজেটিভ সাড়া পাই নাই। যদিও নির্বাচনের পরে আমরা সবাই এলাকায় ঢুকতে পারবো বলেই আশা ছিলো।"

কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ তার রাজনীতি করার সুযোগ পাবে, এমন আশাবাদের কারণ কী?

এর বিশ্লেষণে মূলত: দুটি উত্তর পাওয়া যাচ্ছে।

এক. বিএনপি কোনো দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয় -বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্য।

দুই. নির্বাচনে তৃণমূল আওয়ামী ভোটারদের বিএনপির পক্ষে কাজ করা।

আরিফুল ইসলাম বলেন, "বিএনপি কোনো দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ চায় না -এরকম যে বক্তব্যগুলো ছিলো, সেখানেই আমাদের আশার সঞ্চার হয়েছিলো যে একটা গণতান্ত্রিক সরকার আসলে হয়তো বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। এবং আমরা রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবো। সেই আশার কারণে কিন্তু ভোটেও প্রভাব পড়েছে। কারণ আমাদের সাধারণ ভোটারদের আমরা বলেছি বিএনপিকে ভোট দিতে।"

তবে ভোট হয়ে যাওয়ার এখন ভিন্ন বাস্তবতায় মি. ইসলাম।

'বড় নেতাদের দেশে ফেরা উচিত' বলছেন তৃণমূল নেতারা
নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ বিচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা করলেও প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় খোলার চেষ্টা করলেও সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আবার যারা মাঠে নেমে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করেছেন, তাদেরও অনেকে আটক হয়ে যান।

এরমধ্যেই গত বুধবার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিল সংসদে পাস হয়েছে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো, অধ্যাদেশের সেই সংশোধনী এখন আইনে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ ফিরে আসার জন্য কী করবে সেটা স্পষ্ট নয়।

কারণ দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কারাগারে, আর বাকিরা বিদেশে বিশেষত: ভারতে অবস্থান করছেন।

গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত থেকে দলকে পরিচালনার চেষ্টা হলেও বাস্তবে সেটা কাজে দেয়নি। ফলে দলের তৃণমূলেও এখন শোনা যাচ্ছে ভিন্ন কথা।

নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, বড় নেতারা সামনে থেকে নেতৃত্ব না দিলে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখা বা চাঙা করা সম্ভব নয়।

"রাজধানী শহর ঢাকা দখল করতে না পারলে তৃণমূল দখল করে লাভ নাই। তো ঢাকা দখল করতে গেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব লাগবে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান লাগবে। তারা ঢাকায় অবস্থান করলে কর্মীরা সাহস ফিরে পাবে।" বলেন আরিফুল ইসলাম।

দল বাঁচাতে ঝুঁকি নেয়ার কথা বলছেন তিনি, "যেভাবেই হোক এখন একটা বিএনপি সরকার আসছে। এখন একটা আইনগত ফাইট দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সুতরাং নেতৃবৃন্দের এখন দেশে ফিরে আসা উচিত এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হলেও আসা উচিত।"

কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা কী দেশে ফিরবেন? দলের ভাবনা জানতে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম অবশ্য বলেন, তার ভাষায়, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম দেশের বাইরে থেকে নয় বরং দেশের ভেতরে থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, "নেতাদের ভেতের দেশের বাইরে অনেকেই আছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাইরে বসে আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশের ভেতরে থেকেই আন্দোলন করছে।"

কিন্তু দলের শীর্ষ নেতাদের দেশে ফেরার পরিকল্পনা আছে কিনা এমন প্রশ্নে বাহাউদ্দিন নাসিম জানান, তার ভাষায়, নেতারা প্রয়োজন হলে উপযুক্ত সময়ে দেশে আসার জন্য অপেক্ষায় আছেন।

"জাতীয় সংসদে যে আইনটি (আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত) পাস করা হলো, তারপর কি দেশে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর রাজনীতি করা বা কথা বলার সুযোগ আছে? দেশে কি মব সন্ত্রাস বন্ধ হয়েছে? এখনও তো চলছে। আওয়ামী লীগের নাম পেলেই গ্রেপ্তার চলছে।"

তিনি বলেন, "নেতারা উপযুক্ত সময়ে অবশ্যই আসার জন্য অপেক্ষা করছে। যদি সুযোগ থাকে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন আওয়ামী লীগের কোন নেতা আত্মগোপনেও থাকবে না, স্বেচ্ছ্বা নির্বাসনেও থাকবে না, বিদেশেও থাকবে না।"

আওয়ামী লীগ যে পরিবেশের কথা বলছে, তার মূল কথা হচ্ছে, দলটির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার বা তাদের ভাষায়, 'দমন-নির্যাতন' করা হবে না।

কিন্তু একদিকে সংসদে অধ্যাদেশ পাস, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারে এটা স্পষ্ট যে, রাজনীতিতে সেই সুযোগ আওয়ামী লীগ পাচ্ছে না।

এমন অবস্থায় দল বাঁচাতে আওয়ামী লীগ নেতারা যে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরবেন সেটাও মনে হচ্ছে না।

ফলে আওয়ামী লীগের সংকটও রয়েই যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত