‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা..’ 

  মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:২৬ |  আপডেট  : ২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:৫৪

‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, বন্ধ হইব রং তামাশা/ চক্ষু মুদিলে, হায়রে দম ফুরাইলে’। একটি আধ্যাত্মিক গান। প্রখ্যাত পপশিল্পী প্রয়াত  ফিরোজ সাঁইয়ের কণ্ঠে এ গানটি হয়ে উঠত বাক্সময়। তার ভরাট কণ্ঠে গানটি শুনে শ্রোতারা চলে যেতেন ভাবের জগতে। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, ফিরোজ সাঁই এই গানটি গেয়েই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ১৯৯৫ সালের বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে শিল্পকলা একাডেমি মে এই গানটি গেয়ে নেমে এসে চা পান করছিলেন তিনি। তখনই প্রচন্ড এক স্ট্রোকে আক্রান্ত হন ফিরোজ সাঁই। ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। তাঁর ওই আকস্মিক মৃত্যু সবাইকে হতবিহ্বল করে দিয়েছিল। আসলেই তো আমাদের এক সেকেন্ডের ভরসা নেই। মৃত্যুর আগে কী ফিরোজ সাঁই ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন, দু’মিনিট পরে তিনি সবার কাছে স্মৃতি হয়ে যাবেন? নিজের  গাওয়া গানের কথাগুলো তার জীবনে এমন অমোঘ সত্য হয়ে সেদিনই আসবে তা তিনি যেমন ভাবেন নি, অন্য কেউও তা কল্পনা করতে পারেন নি। 

কিন্তু আমরা যা ভাবিনা নিয়তি সেটাই ঘটায়। আমরা দুনিয়াতে এসেছি আল্লাহ ইচ্ছায়, যাবও তাঁরই ইচ্ছায়। পৃথিবীর এমন কোনো শক্তি নেই যা মৃত্যুর হিম-শীতল থাবা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে। কবি বলেছেন- ‘জন্মিলে মরিতে হবে, আমর কে কোথা র’বে।’ মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য পৃথিবীতে আর নেই। পবিত্র কোরান মজিদে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন এরশাদ করেছেন-‘কুল্লে নাফসিন জায়েকাতুল মউত’। অর্থাৎ প্রত্যেক জীবকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। একবার কারো মৃত্যুপরোয়ানা জারি হয়ে গেলে তার আর রেহাই নেই। পরোয়ানা হাতে আজরাাইল (আঃ) যখন যার দরজায় এসে দাঁড়াবেন, তাকে সাথে সাথে সাড়া দিতে হবে। পালিয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। 

ভীষণ মন খারাপ অবস্থায় এ নিবন্ধটি লিখতে বসেছি আজ (২৩ সেপ্টেম্বর)। এমনিতেই আজকাল বড় বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটে। রাত-বিরোতে টেলিফোন বেজে উঠলে আঁতকে উঠি। না জানি কার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়। বিশেষ করে করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর খবর প্রায় নিয়মিত হয়ে গেছে। ক’দিন আগে মামাতো ভাই আইয়ুব চলে গেছে না ফেরার জগতে। বয়সে আমার চেয়ে অন্তত পনের বছরের ছোট। ওর শোক সামলাতে না সামলাতেই আরেক খবর এলা আজ সকালে। জানলাম আমার প্রিয় ছাত্র, প্রাণবন্ত তরুণ ব্যবসায়ী এবং অমায়িক ব্যবহারের জন্য পরিচিত মহলে সমাদৃত আনিসুর রহমান রতন আর নেই। কিছুক্ষণ পরেই আরেক ফোনে খবর এলো আমার চাচাতো বোন আলো আপা চলে গেছেন সৃষ্টিকর্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে। আলো আপা অবশ্য পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছেন। সব মৃত্যুই বেদনাদায়ক। তবে কারো অকাল মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে দুমরে-মুচড়ে দেয়। রতনের মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। একটি জটিল রোগে ভুগছিল রতন ক’বছর ধরে। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমি যখন আমার প্রিয় ছাত্রের বাড়িতে গেলাম, তখন মনে পড়ছিল ওর সাথে আমার দীর্ঘদিনের স্মৃতি। মেধাবী ছাত্র ছিল। পড়াশোনা শেষ করে পিতার ব্যবসায়ের হাল ধরেছিল ছয় ভাইবোনের সবার বড় রতন। আমি যখন রফিক ভাই, মানে রতনের বাবার সামনে দাঁড়ালাম, তার আহাজারিতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তিনি শুধু বলছিলেন, আমাকে রেখে রতন কেন চলে গেল? এইজন্যই কি ওকে বড় করেছিলাম? ভাবীরও একই অবস্থা। আমার একটি বড় সমস্যা আমি মৃতের স্বজনদের স্বান্তনা দিতে পারি না।  কোন ভাষায় তাদেরকে স্বান্তনা দেব বুঝে উঠতে পারি না। মৃত্যুর কানো স্বান্তনা হয়- আমি বিশ্বাস করি না। কারণ এটা এমন একটি ক্ষতি যা কখনোই পূরণ হয় না। ভাই- ভাবীকে শুধু বললাম, এর ওপরে তো আমাদের হাত নেই। আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে। বলা হয়ে থাকে- পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বস্তু হলো পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ। অবহনযোগ্য সেই ভারী বস্তুই রফিক ভাইকে আমৃত্যু বয়ে যেতে হবে। আল্লাহ সব মৃতদের মাফ করে দিন। 

 মানুষ মরণশীল কথাটি আমরা সবাই বিশ্বাস করি। বলিও হরহামেশা। কিন্তু কাজকর্মে আমরা সে বিশ্বসের প্রমাণ কি রাখি? একজন মানুষ, যে মৃত্যুকে স্মরণে রেখে চলে, সে কখনো অন্যায়-অনাচার-দুষ্কর্মে নিজেকে জড়াতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা). তাই তাঁর উম্মতদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে স্মরণ করো’। কেন এই উপদেশ? এজন্য যে, একজন মানুষ যদি মৃত্যুকে বিস্মৃত না হয়, তাহলে সে নিজেকে সব ধরনের পাপকাজ থেকে দূরে রাখতে পারে।

 চোখের সামনে আমরা আমাদের প্রিয়জনদের চলে যেতে দেখছি। কেউ গরিব, কেউ ধনী। হাজার কাটি টাকার মালিককে দেখছি মৃত্যুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করতে। তারপরও কি আমাদের বোধোদয় হচ্ছে? আমরা লিপ্ত আছি ধন-সম্পদ অর্জনের ধান্ধায়। কে কত বিত্তশালী হতে পারি- এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ার নেশা আমাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, ন্যায়-অন্যায়বোধও আমাদের লোপ পেয়েছে। অর্থের লোভে ভাই ভাইয়ের বুকে তীক্ষ ছোরা আমূল বসিয়ে দিতে দ্বিধা করে না। এই নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে কেউ কেউ এমন সব কাজে প্রবৃত্ত হয়, যে দেখতে মানুষের মতো মনে হলেও তাদেরকে মানুষ বলে স্বীকার করতে ইচ্ছা হয়না। কী হবে এত বিত্ত-বেসাত দিয়ে? একদিন তো সব কিছু ফেলে চলে যেতেই হবে। না, তাই বলে আমি এটা বলছি না যে, দুনিয়াদারি সব ছেড়েছঁড়ে সবাইকে ফকির-দরবেশ হয়ে যেতে হবে। মানুষ তার দৈনন্দিন কাজ তো করবেই। তবে সে কাজগুলো হতে হবে নৈতিকতার সীমারেখোর মধ্যে। মানুষই অর্থবিত্ত কামাই করবে। ব্যবসায়ী তার ব্যবসাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবেন, শিল্পপতি তার শিল্পজগতকে প্রসারিত করবেন। এত কোনো দোষ নেই। বরং সমাজ বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকার গতি সাবলীল রাখতে তা অত্যাবশ্যকও বটে। একজন ব্যবসায়ী তার ব্যবসার, একজন শিল্পপতি তার শিল্পের প্রসার ঘটালে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তা ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অন্য অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এজন্যই অর্থনীতিবিদগণ জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এক সময় বামপন্থি রাজনীতির প্রবক্তারা বিত্তশালী বা ধনাঢ্য পুঁজিপতিদের শ্রেণিশত্রু বলে অভিহিত করতেন। কট্টর বামপন্থি সংগঠগুলো শ্রেণিশত্রু খতমের লাইনও গ্রহণ করত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তাদের সে চিন্তাধারা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এখন আর পুঁজিপতিদের শ্রেণিশত্রু গণ্য করা হয় না।  বরং বলা হয়, দেশপ্রেমিক পুঁজিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া একটি রাষ্ট্রের জন্য জরুরি। কেননা, এতে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। দেশের অর্থনীতি বিকশিত হয়। তবে সব ভালোর মধ্যেই কিছু না কিছু খারাপ বসবাস করে। এই পুঁজির বিকাশ ঘটাতে গিয়ে কেউ কেউ দুনম্বরী লাইনে হাঁটেন। কর ফাঁকি দিয়ে রাষ্ট্রকে ঠকান, শ্রমিক-কর্মচারিদের বি ত করেন ন্যায্য মজুরি থকে । কেউ কেউ অবৈধ অর্থ আড়াল করার জন্য চুপিসারে তা বিদেশে পাচার করেন। যারা এসব অনৈতিক কাজে প্রবৃত্ত হন, তারা হয়তো এটা ভুলে যান যে, এ দুনিয়ায় সরকারকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও পরপারে শেষ বিচারের দিন আল্লাহ্ তা’য়ালাকে তারা ফাঁকি দিতে পারবেন না। এপারে কৃত সব কর্মের হিসাব কড়ায়গণ্ডায় সেদিন দিতে হবে। অবৈধভাব অর্জিত বিত্তবৈভব সেদিন কোনা কাজে আসবে না। 

অর্ধেক দুনিয়ার বাদশাহ সম্রাট শাহ সেকান্দর, যিনি আলেকজান্ডার নামে ইতিহাসে পরিচিত, মৃত্যুর আগে অছিয়ত করে গিয়েছিলেন, তার শবযাত্রার সময় পুরো দেহ কাফনে মোড়া থাকলেও হাত দুটি যেন বাইরে রাখা হয়। কেন সম্রাটের এমন অভিপ্রায়- জানতে চাইলে তিনি তার সভাসদদের বলেছিলেন, অমি দুনিয়ার মানুষদের জানিয়ে যেতে চাই, অর্ধেক পৃথিবীর শাসক শাহ সেকান্দর, যার ধন দৌলতের কোনো অভাব নেই, তাকেও শূন্যহাতে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। তার মৃত্যুর পরে তা-ই করা হয়েছিল। এ কথা আমরা সবাই জানি, দুনিয়ার ধন-দৌলত কিছুই সঙ্গে নেওয়া যাবে না। সঙ্গে যাবে ভালো কাজের পূণ্য। কিন্তু মানুষ ভালকাজের চেয়ে মন্দকাজের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করে বেশি। 

মৃত্যু বড় অমোঘ সত্যি। প্রবীণ রাজনীতিক শফি বিক্রমপুরী প্রায়ই বলে থাকেন, দু’দিনের দুনিয়ায় আমরা কত কী করি। কিন্তু ভুলে যাই যে, এর শেষ আছে। লক্ষ্য করে দেখ, একজন ডাক্তার, যিনি তার পেশাগত জীবনে হাজার হাজার রোগীকে চিকিৎসা করে সুস্থ করেন, একদিন এমন এক ব্যধি তাকে আক্রমণ করে যে, তিনি চলে যান সব চিকিৎসার বাইরে। মৃত্যুর কাছে তাকে হার মানতে হয়। একজন মাওলানা, যিনি শত শত মানুষের নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন, তার নামাজে জানাজা পড়ান অন্য একজন মাওলানা। একজন গোরখোদক তার জীবনে অনেক মানুষের জন্য কবর খুঁড়েন, তার কবর খুঁড়ে অন্য কেউ। এটাই আল্লাহ বিধান। এভাবে চলে আসছে পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে অদ্যাবধি। কোনো ব্যত্যয় নেই। কারো পক্ষে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই এই বিধান। 

প্রতিদিন কতজন চলে যাচ্ছেন। যারা যাচ্ছেন তারা কেউ ফিরে আসেন না। এই যাওয়ায় কোনো সিরিয়াল নেই। কে আগে এসেছিলেন সেটা আর বিবেচ্য থাকে না চলে যাবার সময়। একজন প্রবীণ বিএনপি নেতার মুখে শুনেছি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন জাগদল গঠন করে সেটার নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রস্তাব দেন, তখন তিনি এই বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন- মহামান্য প্রেসিডেন্ট, আমি বৃদ্ধ মানুষ। এক পা পাড়ে, এক পা গোরে। কখন মরে যাই ঠিক নেই। বরং আপনি নেতৃত্ব নিন। ইয়াং ম্যান, অনেকদিন নেতৃত্ব দিতে পারবেন। একটু হেসে প্রেসিডেন্ট জিয়া নাকি বলেছিলেন, জাস্টিস সাহেব, জানেন তো পৃথিবীতে আসার সিরিয়াল আছে, যাবার কোনো সিরিয়াল নেই। এমনও তো হতে পারে, আপনার আগে আমিই চলে গেলাম। আমরা জানি, বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। কী নির্মম সত্যটি প্রেসিডেন্ট জিয়া অবচেতন মনেই বলে ফেলেছিলেন! আমাদের চারপাশে কী আমরা সেটাই ঘটতে দেখছি না? পিতা-মাতার সামনে সন্তান চলে যাচ্ছে। বড় ভাইয়ের সামনে চলে যাচ্ছে ছোট ভাই-বোন। 
আল্লাহ তা’য়ালার বিধান অনুযায়ী কেউ মৃত্যুবরণ করছে, আবার কেউ বেঁচে থাকছি। গ্রিক দার্শনিক মহামতি সক্রেটিস যখন হেমলকের বিষপানে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছিলেন, তখন বলেছিলেন- ‘আই টু ডাই, ইউ টু লিভ। বাট হুইচ ইজ বেটার ওনলি গড নোজ’। অর্থাৎ ‘আমি মারা যাচ্ছি, তোমরা বেঁচে থাকছ। কিন্তু কোনটা ভাল সেটা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন’। জন্ম-মৃত্যুর এই খেলার অর্থ কি আমরা বুঝি? এ যে মানুষের জ্ঞান-পরিধির বাইরে!

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত