হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হিন্দু মহাজোট ও হিন্দু আইনজীবীরা

  শ্যামল কুমার রায়

প্রকাশ: ৫ জুলাই ২০২১, ১২:৩০ দুপুর |  আপডেট  : ৩০ জুলাই ২০২১, ৩:৪৭ দুপুর

আইন কমিশনের খসড়া প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সরকার যুগ যুগ ধতে চলে আসা হিন্দুদের শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের আলোকে প্রণীত হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে হিন্দু মহাজোটসহ  ধর্মীয় সামাজিক সংগঠন, হিন্দু "ল" ইয়ার্স এসোসিয়েশন, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র হিন্দু আইনজীবীগণ ও ঢাকা জজকোর্ট বারের হিন্দু আইনজীবীগণ। সরকারের এই উদ্যোগ গ্রহণের পেছনে তৎপর রয়েছে গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী এনজিও, একটি বিশেষ মহল ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সুবিধাভোগী গুটিকয়েক ব্যক্তি, যারা কখনওই দেশে এযাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত কোন হিন্দু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদতো দুরের কথা টু শব্দটিও করে নাই। 

সংবিধানের স্পিরিটের আলোকে দেশে পরিপূর্ণ আইনের শাসন ও মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় একের পর এক ঘটনার শিকার হয়ে প্রতিদিন গড়ে যেখানে ৬৩২ জন হিন্দু দেশত্যাগ করছে, যেখানে হিন্দুদের মেয়ে, মন্দির ও  সম্পত্তি রক্ষায় নিশ্চয়তার অভাব বোধ করছে সেখানে হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন করা মানেই অবশিষ্ট যেটুকু সম্পদ রয়েছে তা খন্ডবিখন্ড করে পরিবারের সামাজিক বন্ধনকে ধ্বংস করার সামীল ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট অতিতের অভিজ্ঞতা থেকে হিন্দু আইন পরিবর্তিনের নামে এটাকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে এক গভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবে মনে করে। 

হিন্দু মহাজোট হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষায় যে কোন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত রাজপথের প্রতিবাদী সংগঠন। ফলে হিন্দুদের ধ্বংসের নামে হিন্দু আইন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এই সংগঠন সোচ্চার রয়েছে এবং থাকবে। সরকারকে হিন্দু আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহবান জানিয়ে হিন্দু মহাজোট ইতোমধ্যে সুপ্রিমকোর্ট বার ও ঢাকা বারের সিনিয়র হিন্দু আইনজীবী ও ধর্মীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে কয়েকটি প্রতিবাদ সভা করেছে। উক্ত প্রতিবাদ সভায় সকল সদস্য ও নেতৃবৃন্দ হিন্দু আইন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেছেন।

আইন কমিশনের খসড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যদি কোন নারী বা পুরুষ পৈত্রিক সম্পত্তি পাওয়ার আগে ধর্মান্তরিত হয় এবং তার স্বামী/স্ত্রী বা পুত্রকন্যা যদি ধর্মান্তরিত না হয় সেক্ষেত্রে ঐ ধর্মান্তরিত না হওয়া স্বামী অথবা স্ত্রী ও তার পুত্রকন্যাগণ সম্পত্তির মালিক হবে। কেবলমাত্র ধর্মান্তরিত হওয়া ব্যক্তিটি সম্পত্তি পাবে না। 

কিন্তু সম্পত্তি পাওয়ার পরে যদি কেহ অন্য ধর্মের কোন নারীকে ভালোবেসে বিয়ে করতে কিংবা স্রেফ নিজের ইচ্ছায় হিন্দু স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে ত্যাগ করে স্বধর্ম পরিবর্তন করে চলে যায়, তখন হিন্দু ধর্মে থেকে যাওয়া নিরপরাধ স্ত্রী, পুত্র-কন্যাগণ পৈত্রিক সম্পত্তি পাবে না। খসড়ায় বলা আছে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেও পিতার সম্পত্তি হিন্দু পুরুষটিরই থাকবে। 

অপরদিকে তার অহিন্দু স্ত্রী এবং তার গর্ভজাত পুত্র-কন্যাও ধর্মান্তরিত পুরুষের পিতার সম্পত্তির অধিকার পাবে। এক্ষেত্রে বঞ্চিত থাকবে শুধু তার প্রথম পক্ষের হিন্দু স্ত্রী-সন্তানেরা।

যে হিন্দু নারীদের জন্য এত দরদ দেখিয়ে আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেই হিন্দু নারীরা কিন্তু অতি সূক্ষ্ণ কৌশলের মারপ্যাঁচে প্রকারান্তরে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী,বর্ণ বা নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না’। ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরের নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। আমাদের প্রশ্ন দেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে সংবিধানের সমান অধিকার ভোগ করা থেকে বিরত রেখে ১০ শতাংশেরও কম হিন্দু জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে মাথা ব্যথা কেন? ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে এর পেছনে নিশ্চই অন্য কোন মতলব লুকায়িত কি না? যে সকল হিন্দু বোদ্ধাগণ আইন পরিবর্তনের ফাঁদে পা বাড়িয়েছন তারা জেনেশুনেই কেবল মুষ্টিমেয়দের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এটা করতে চাচ্ছেন। 

সরকার যদি আন্তরিকভাবেই সম্পত্তিতে নারীপুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের ছেলেমেয়েদের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার আইন করুক আমরা তাতে অভিনন্দন জানাবো সরকারকে। অন্যথায় হিন্দুদের নিয়ে এসব প্রহসন বন্ধ করতে হবে। কেউ কেউ চোখ থাকতেও অন্ধের মত বলছেন ভারতে ছেলেমেয়ের সম্পত্তিতে সমান অধিকার রয়েছে। তাদের উদ্যেশ্যে বলতে চাই ভারত আর বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট কি এক? ভারত একটি ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ, সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ হিন্দু। তারপরেও আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখেছি সেখানে পূজা ও নামাজের সময় কারোরই মাইক বন্ধ করতে হয় না। একই সময়ে সমানভাবে যার যার ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আযান ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে প্রার্থনা করে।

এছাড়াও ভারতে ধর্মীয়  সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য মুসলিম "ল" বোর্ড, সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন রয়েছে। বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধানে সংখ্যালঘু কমিশন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ জাতীয় সংসদে পৃথক ব্যবস্থাপনায় সংখ্যালঘুদের জন্য ৬০টি আসন বরাদ্দ এবং অর্পিত সম্পত্তি ও দেবোত্তর সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন বাতিলের দাবি করে আসছি। এসব দাবিগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে মাথামোটা হিন্দু পন্ডিতদের আগ্রহ দেখি না। 

অথচ এই মাথামোটা গুটি কয়েক তথাকথিত হিন্দু বুদ্ধিজীবী হাজার বছরের শান্তিপ্রিয় ও পারিবারিক সুরক্ষিত শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের আলোকে প্রণীত হিন্দু পারিবারিক উত্তরাধিকার আইন ও প্রচলিত বিবাহ আইনের পরিবর্তনের পক্ষে সুর মিলাচ্ছে। এদেশে সাধারণ হিন্দুদের দুর্দশার একটি বড় কারণ হচ্ছে সমাজের উপরতলার প্রতিষ্ঠিত অল্প সংখ্যক হিন্দু নেতৃবৃন্দ। হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার চেয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আসছেন এরা। যার পরিণতিতে সমাজের দুষ্টচক্র অপেক্ষাকৃত দুর্বল হিন্দুজনগোষ্ঠীর উপর প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালিয়ে হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের চক্রান্ত ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। 

আমরা পরিস্কারভাবে বলতে চাই আইন মানুষের জন্য, আইনের জন্য মানুষ নয়। হিন্দু বিবাহ শাস্ত্রীয় বিধানের আলোকে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার ভাগ নিশ্চিত করার চেয়ে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার আরো সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। 

এক্ষেত্রে নিঃসন্তান বিধবা ও পুত্রসন্তান নেই শুধু কন্যাসন্তান রয়েছে এমন ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনকে আরও অধিক শক্তিশালী ও যুগউপযোগী করে তোলার পক্ষে  আমাদের অবস্থান। 

Widows Property Act. এ বিধবা স্ত্রী কে মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে Manager of the Estate হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আইনসঙ্গত প্রয়োজন (Legal Necessity)অনুযায়ী বিধবাকে তার স্বামীর সম্পত্তি বিক্রয়/ হস্তান্তর করার অধিকার দেয়া রয়েছে তবে সর্বত্র তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছেনা। 

আমরা এসব জটিলতার স্থায়ী আইনানুগ সমাধানের পক্ষে তবে সেটি হিন্দু আইন পরিবর্তন করে নয় প্রচলিত আইনের বিশেষ সংশোধনী এনে তা  কার্যকর করার পক্ষে। 

যে পরিবারের পুত্রসন্তান নেই শুধু কন্যাসন্তান রয়েছে এমন ক্ষেত্রেতো পিতার ইচ্ছানুযায়ী মাত্র ১০০ টাকার দলিলমূল্যে দানপত্র রেজিষ্ট্রি করার সুযোগতো রয়েছেই।  

এমতাবস্থায় হিন্দুদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে অটুট দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসা শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের আলোকে প্রণীত হিন্দু আইন পরিবর্তন করা হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত সাধারণ হিন্দুরা আরও অধিক পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই আইন পরিবর্তনের বিরোধীতা করছি আমরা। 

১। সনাতন ধর্মে বিবাহ হচ্ছে ধর্মীয়সংস্কার Sacrament তথা পবিত্র ব্রত। শাশ্বত ঐশী বেদমন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অগ্নিকে স্বাক্ষী রেখে গোত্রান্তরিত করে কন্যাকে সম্প্রদান করা হয়। শাস্ত্রীয় পন্থায় গোত্রান্তরপূর্বক বর কনেকে অবিচ্ছেদ্য ঐশীবন্ধনে একাত্ম(Inseperably united) করে যুগলবন্দী করে দেয়া হয়। তাই হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধানে স্ত্রীকে সহধর্মিণী বা অর্ধাঙ্গিনী বলা হয়ে থাকে।

২. গোত্রান্তরপূর্বক কন্যা সম্প্রদান করা হয় বলে পিতৃসম্পত্তি থেকে কন্যাকে অলঙ্কারাদি ও সংসার রচনার জন্য সম্ভবমত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ও উপঢৌকন হিসেবে দান করা হয় যা "স্ত্রীধন" হিসেবে স্বীকৃত যার মালিকানা ঐ কন্যারই। স্বামীর পরিবারের চাবি কন্যাকে(বধু) প্রদান করে সেই পরিবারের কর্তৃত্বাভিষিক্ত করা হয়।

৩. সনাতন শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পদ/সম্পত্তির সম্পূর্ণ মালিকানা প্রাপ্ত হওয়ার বিধান আইনে রয়েছে। অর্থাৎ মৃত স্বামীর সম্পত্তির ভোগদখল আইনসঙ্গত প্রয়োজন(Legal necessity) অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকার রয়েছে। Widows Property Act. এ বিধবা স্ত্রী কে মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে Manager of the Estate হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। 

৪. শাস্ত্রীয় এ বিধানগুলোর জন্যই বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতিপূর্ণভাবে পারিবারিক বন্ধনে শান্তিতে ঘর সংসার করে আসছে।  যাহা অন্যান্য ধর্মীয় প্রথার বিবাহ অনুযায়ী ছেলে মেয়ের দালিলিক চুক্তিপত্র, বা দেনমোহর শর্ত বা স্বইচ্ছায় লিভটুগেদার করার মত নয়। ফলে হিন্দু বিবাহে বিচ্ছেদ বা সংসার ভাঙ্গার প্রবণতা নেই।

এরপরেও মুষ্টিমেয় কিছু অধিক পড়ালেখা জানা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা যারা ব্যক্তিজীবন উপভোগে অন্য পন্থা বেছে নিতে চান তাদের জন্যে তো ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন বা (Special Marriage Act.1872) রয়েছেই। ফলে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও মহিলা সমিতি হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তনের   প্রস্তাবনায় যে সুপারিশ করেছেন তাতো Special Marriage Act.1872 মধ্যেই  সন্নিবিষ্ট রয়েছেই। 

তাই আমরা সম্মিলিতভাবে মনে করি বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন যেমন উপযোগী নয় তেমনি কোন প্রয়োজনও নেই। শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের আলোকে প্রণীত হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন করা হলে সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায় আরও অধিক ঝুঁকির সন্মুখিন হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকবে মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চাভিলাষীদের অশুভ প্ররোচনায় হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকার জন্য।


লেখকঃ শ্যামল কুমার রায়, প্রধান সমন্বয়কারী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত