হারিয়ে পাওয়া জনপদ নাটেশ্বর বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপে একদিন

  সাহিত্য ও সংস্কৃতি ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২১, ১০:১৩ |  আপডেট  : ২৩ জুন ২০২২, ২০:০৮

মোহাম্মদ আবুল খায়ের মৃধা

--------------------------

 

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকগুলো জায়গা কাভার করতে হবে দিনের মধ্যেই। সেই মতন ছক করা। চিমটানো গরমও পড়েছে বেশ। ভাদ্র মাস হলে বলা যেত তালপাকা ভাদ্র। মাঝেমধ্যে ঝিরিঝিরি বাতাসের দমকা এসে মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে। আকাশে মেঘের ছিটেফোটাও নেই। তবে এসময় বৃষ্টি আগাম নোটিশ না দিয়ে যখন-তখন এসে আপনাকে কাকভেজা করে দিতে পারে। ছাতা না রাখলে সর্বনাশ! আপনি হয়তো বেশ পরিপাটি হয়ে চুলে ভাঁজ ফেলে নতুন ইষ্টিকুটুমের বাড়িতে যাচ্ছেন, আচমকা এক পশলা বৃষ্টি আপনাকে গোসল করিয়ে দিয়ে মসকরা করে গেল। আপনি আবার সে বাড়ির নতুন জামাই। এই সুরতে উঠলেন সে বাড়িতে। আপনার ঠাট্টা সম্পর্কিত লোকেরা কি তখন মুখটিপে হাসবে না?

 

সোনারং জোড়া মঠ দেখার পর আমাদের পরিকল্পনা মতো পরবর্তী গন্তব্য নাটেশ্বর বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপ। ব্যাটারিচালিত অটোর পেছনে হানিফ, জুয়েল ও বিপ্লব বসেছে। হাসপি ও আমি বসেছি সামনে। বিপ্লব মাঝেমধ্যেই ঝিমুচ্ছে-এ নিয়ে জুয়েল মশকরা করছে। জুয়েল প্রায় সময়ই ওর সাথে খুনসুটিতে মেতে থাকে। নানা টিপ্পনি কাটে। আমি বুঝিনা এই নিরিহ লোকটির পেছনে লেগে ও কী মজা পায়? সময়ে সময়ে বিপ্লব ওর বিরুদ্ধে নালিশ করে, কিন্তু মুহুর্ত না যেতেই ওদের মধ্যে বনিবনা হয়ে যায়। এই যখন অবস্থা, ওদের ব্যাপারে কে নাক গলাবে বলুন? আমাদের মধ্যে হাসপি সবচেয়ে ছোট। সে কলেজে পড়ে । চটপটে তরুণ। সব কাজে সাথে থাকে। সিক্স-সেভেন থেকেই আমাদের সাথে আছে সে। আমরা যত সোশ্যাল ওয়ার্ক করি, সে সাথে থাকে। হানিফ কথা কম বলা বুদ্ধিদিপ্ত; দেখে মনে হবে না, সে নিরবে এত আধুনিক। কখনো দেখিনি গানের একটি লাইন সশব্দে গেয়েছে। কোনো কাজে তার উৎসাহের কমতি নেই, ভ্রমণের বেলায় তো নেই-ই। সব কাজই নিখুঁতভাবে করতে চায়। গাছের পরিচর্যা করতে যেয়ে দূর্বাঘাসের একটি শেকড়ও সে বাকি রাখবে না। সমূলে উৎপাটন করেই তাঁর শান্তি। এতসব গুণি মানুষজন নিয়ে আজকের এ ভ্রমণযাত্রা!

 

সোনারং হাই স্কুলের পাশ দিয়ে নাটেশ্বরের দিকে অগ্রসর হতে দেখি পথের মুখে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম এই ভেবে যে, আবার কোন পথ ধরে এগুতে হয়, তার কোনো ঠিক নেই। এই করে করেই না আবার সময়ের ঘাটতি হয়ে যায়। তাহলে তো কোনো স্থানে যাওয়া বাদ পড়ে যেতে পারে। তবে আমাদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হলো। গাড়ি থামিয়ে হেঁটে একটু এগিয়ে যেয়ে রাস্তা মেরামতকরা শ্রমিকদের যাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞেস করলে সায় দিল। মেরামতের কাজ হচ্ছিল রাস্তার একধারে। অপর পাশ দিয়ে গাড়ি দিব্যি চলতে পারল। কিছুপথ এগুতে দেখি গৃহস্থবাড়ির নামায় জলের ধারে কোষা নৌকা উপুড় করে আলকাতরা মাখানো হচ্ছে বর্ষা-বন্যার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে। হাওয়ায় আলকাতরার মোহনীয় গন্ধ নাকে এসে ঢুকল! বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস নিলাম বেশিক্ষণ ধরে রাখার জন্য। হানিফদের নাকে এসেও কি ঢুকেছিল? ওরাও কি টের পেয়েছিল? পেয়ে থাকলে এ ব্যাপারে ওদের অনুভূতি কী? ঠিক বুঝলাম না। বিপ্লব তো ঝিমুচ্ছে, মাঝেমধ্যে ঝাঁকি খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পাচ্ছে, ওর পক্ষে টের পাওয়া অবশ্য সম্ভব না। দূরে কোথাও গেলে শুধু গন্তব্যই মনকে আনন্দ দেয় না, যাওয়া-আসা পথের পরিবেশ-প্রতিবেশ সবই মনকে প্রফুল্ল করে, যদি সেটা উপভোগ করা যায়।

গাড়ি তার আপন গতিতে চলছে। দৃষ্টিগোচর হওয়া দূরত্বে পাশাপাশি দুটি তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে; যেন জমজ বোন। একই উচ্চতা, একই রকম। যৌবনে পড়তেই যেন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। পোয়াতিও হয়েছে। ফলন ধরেছে গোটা গাছ ধরে। এখন আর শাঁষ খাওয়ার উপযুক্ততায় নেই। সেই দিন শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে। এখন শাঁষ শক্ত হয়েছে, ভাদ্রে পাকবে। তখন গৃহস্থের ঘর থেকে পাকা তালের ঘ্রাণ মাতিয়ে তুলবে তার প্রতিবেশি ঘরগুলোকে। পিঠা-পায়েস তৈরি হবে। এ ঘর থেকে ও ঘরে লেনদেনও হবে এসব পিঠা-পায়েসের। এসবই সামাজিকতা-লৌকিকতা।

 

পথে যেতে যেতে কয়েক বাড়িতে দালান উঠতে দেখেছি। গ্রামগুলোও যেনো আর গ্রাম নেই। কেমন যেনো কৃত্রিমতা ভর করেছে। দালান উঠে যাচ্ছে। মেঠোপথ নেই। হারিকেনের বাতি হারিয়ে গেছে সেই কবে। ঝিঁঝিঁ পোকা নেই। হুক্কা হুয়া নেই। কোথা দিয়ে অমাবশ্যা আসে, পূর্ণীমা যায়, ঠাওর করা যায় না। বিদ্যুতের প্রভাবে সবই ঝাঁ-চকচকে। হেলেদুলে পথচলা খোদাই ষাঁড়ওতো চোখে পড়ে না। ড্রেজার দিয়ে আবাদী জমিগুলো ভরাট হচ্ছে। জলাভূমি কমে যাচ্ছে। ডাহুক-পানকৌড়িরা বিপদের মুখে। মালির অংক থেকে ভোগদিয়া যেতে পূবের জমিগুলো হুহু করে ভরাট হয়ে গেল। এক সময় শহরের মানুষ গ্রামে আসত বুক ভরে দম নিতে। সেই সুযোগ দিনে দিনে কমে আসছে।

 

যাওয়ার পথে বাঁ পাশের চকটায় ধৈঞ্চে ফুল ফুটেছে। হলুদ ফুলে কালো কালো ছোপ। কোয়েল পাখির ডিমের মতো। নিশ্চয়ই কীট-পতঙ্গ-মৌ-অলিরা ধৈঞ্চের হলুদ ফুলের চোখধাঁধানো সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যে মগ্ন-মত্ত! শুনেছি অনেকে নাকি এ ফুলের বড়া বানিয়ে খায়। ছেলেবেলায় বর্ষা শেষে যখন পানি নেমে যেত, চক শুকিয়ে শোলাগুলো এলোমেলো হয়ে মাটির সাথে নুয়ে থাকত, তখন নানির বাপের বাড়ি যেতাম শোলা আনার জন্য। বাঁকা শোলার উপর টিনের টুকরো বসিয়ে শোলার এক মাথা মাটির সাথে লাগিয়ে অপর মাথা ধরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতাম। টিনসমেত কম্পনের ফলে ঝনঝন শব্দ তৈরি হতো। অদ্ভুত লাগত! নানি হয়তো দুদিন হলো বাপের বাড়ি থেকে এসেছে, আবার মাস দুয়েক পরে যাবে, কে শোনে কার কথা, পিড়াপিড়ি করে যাওয়ার জন্য রাজি করাতাম। বহুদিন হয় শোলার চাষ দেখি না।

 

নানা কিছু দেখতে দেখতে ভাবতে ভাবতে কড়কড়ে রোদে যখন নাটেশ্বর বৌদ্ধমন্দিরে পৌঁছি, তখন আকাশে মেঘ আর নীল মিলেমিশে অপার্থিব শোভা তৈরি করেছে। একপাশে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি গাছ-সে পাশটায় সাইনবোর্ডগুলো। দুটি বাচ্চাছেলে পালাকরে একটি সাইকেল চালাচ্ছে। ছবি তুলতে গেলে বারবার ফ্রেমে চলে আসে। খননকৃত মাটি একপাশে রেখে দেওয়ায় বড় ঢিবির মতো তৈরি হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি। টিলার স্বাদ মাটির ঢিবিতে মেটানো আর কি। কড়ারোদে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। তারপরও রোদে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি। তাকাতে সমস্যা হচ্ছিল। তোলা ছবিতে সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে। সানস্ক্রিন মাখিনি। রোদে পুড়ে ত্বক কালো হয়ে গেছে। লোমকূপ থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম বের হচ্ছিল। গাছগুলো থাকায় রক্ষা। সেখানে অন্তত দাঁড়ানো গেছে। রোদের তেজ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেয়েছি। মধ্যবয়সী কয়েকটি আমগাছ। এর মধ্যে একটি গাছের ডাল কাটা হয়েছে, সেখান থেকে নতুন করে ছোট ছোট ডাল বের হয়েছে। সেই ডাল অবশ্য আগের মতো বড় হবে না। কাটা ডাল থেকে নতুন করে গজালে আগের মতো হৃষ্টপুষ্ট হয় না। অনেক সময় ডাল না গজিয়ে কাটা স্থানটুকু বাকল দিয়ে ভরে যেয়ে উঁচু গিড়ার মতো তৈরি হয়।

ড্রাইভার ছেলেটাকে আমাদের সাথে ছবি তুলতে ডাকলে লজ্জাবতী লতার মতো আড়ষ্ট হয়ে ওঠে,অনেক সাধাসাধির পর সে ছবি তুলতে রাজি হয়। হাসপিকে বলি সেলফি নাও। সে নয়া স্টাইলে কপাল কুচকে, চেহারায় ভাজ ফেলে সেলফি নেয়। বিভিন্ন পোজে-ঢংয়ে ছবির তোলার নয়া তরিকা বের হয়েছে। দূর থেকে ছবি তোলার জন্য বাজারে নানা পদের সেলফি স্টিকও পাওয়া যায়। মেয়েরা ঠোট চোখা করে, গালে আঙুল রেখে, জিহবা বের করে সেলফি নেয়। ছেলেরা কপাল কুচকে মুখ বিকৃত করে সেলফি তোলে। সবই ট্রেন্ডের খেলা। তরিকার জোয়ার। কিছুদিন ট্রেন্ডের জোয়ারে সবাই ভাসবে। নতুন তরিকা আসবে,পুরনো ট্রেন্ড বিদায় নেবে। আমরাও জোয়ারে গা ভাসালাম। আমরা মানুষ বৈ অন্য কিছু তো নই।

পশ্চিমে ঢিবিটার পাশে বাঁশের আড়ে রোদে শুকাতে দেওয়া নীল সালোয়ার আর আকাশের নীল মিলে এক দুর্দান্ত কম্বিনেশন তৈরি করেছে। মেঘগুলো কী ঘন! জমাটবাধা। ঘন হয়ে মাথার ওপর এসে পড়েছে। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। আচ্ছা মেঘের সাথে মাটির কি কোনো মিতালি আছে? সে কি মাটিতে নেমে আসতে চায়? চাইলে আসুক। কে মানা করেছে? আসতে চাইলে এতো রঙঢঙ কেন? বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লেই তো হয়। আচ্ছা সত্যি সত্যি কি বৃষ্টি চাচ্ছি? চাওয়ার কি কোনো কারণ আছে? ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি এলে কী উপায় হবে তখন? কী উল্টাপাল্টা ভাবছি! আমাদের চাওয়া না চাওয়ায় বৃষ্টির কী আসে যায়? প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে চলে। কার লাভ,কার ক্ষতি, হিসেব করলে তার চলে না। অবশ্য আকাশে এখন যে মেঘের ঘনঘটা সেটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার মতো না। চারপাশ রোদে খা খা করছে। রোদের প্রচণ্ড তেজ। সূর্য মামা মধ্য গগনে। এ সময় ছবি ভালো আসে না। আউটডোরে ছবি তোলার উত্তম সময় সূর্যোদয়ের দুয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত এবং সূর্যাস্তের আগে আগে। মতামত বিশেষজ্ঞদের। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আলোর দিক চিন্তা করলে ছবি তুলতে পারব না। আমরা তো সিনেমা স্যুটিংয়ের লটবহর নিয়ে যাইনি যে আলো যেদিকেই থাকুক না কেন রিফ্লেক্টর দিয়ে আমাদের দিকে ধরব। তাই বাধ্য হয়ে দৃশ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আলোকে অগ্রাহ্য করেছি । ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। চেহারা অন্ধকার এসেছে। কোনো প্রতিবন্ধকতায়ই দমে যাইনি। কীযে পাগলাটে! কীযে একগুয়ে! কীযে ক্ষেপাটে মন! বেঁচে থাকলে ভাস্কো দা গামা গংয়েরা হয়তো আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেতেন?

 

একটি সাইনবোর্ডে উপর থেকে তোলা খননকৃত মন্দিরের পুরো অংশের ছবি আছে। দু-একটিতে মাটি খনন করে প্রাপ্ত তৈজষপত্রের ছবি আছে। বৌদ্ধমন্দিরটির পুরোপুরি খনন কাজ শেষ হয়নি। পলিথিনের বস্তা দিয়ে খননকৃত স্থানগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে। বর্ষা ঋতুতে ঢেকে রাখা হয় বৃষ্টি-বাদল থেকে রক্ষা করার জন্য এবং শীতে খনন কাজ চলে। আপাতত এটুকু দেখে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হলো। ঢেকে রাখা জিনিস কীভাবে দেখব? যখন পুরোপুরি খনন শেষ হবে, তখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পর্যটন স্পট হবে নিশ্চয়ই। দূরদূরান্ত থেকে দেশবিদেশের লোকজন আসবে; প্রাচীন এ জনপদকে জানতে-বুঝতে।

 

বৃষ্টির জলে কচু আর অন্যসব লতাগুলো বেড়ে উঠে উঁচু ঢিবিটার পাশে ঝোপের সৃষ্টি করেছে। সেই ঝোপের কাছে জুয়েল অসাবধানতায় বিষ পিঁপড়ের দলে পাড়া দিয়ে কয়েকবার পা ঝারা দিয়ে অস্থির হয়ে ওঠেছে। এতটুকু পিঁপড়ে কিন্তু তার বিষের কী তেজ! জুয়েল অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠা লোক। এতক্ষণ তাঁর কথার তোড়ে বিপ্লব অস্থির হয়ে উঠছিল। কিন্তু সামান্য পিঁপড়ের গুঁতো খেয়ে সে ধরাশায়ি। তার অভিব্যক্তিতে বিরুক্তির ছাপ। ভয় হচ্ছিল, নাকি বলে ফেলে, চলেন বাড়ি ফিরে যাই, এইসব ইট-পাথর দেখার কী আছে। না, ভাগ্যিস সে এটা বলেনি। মেয়েদের মন বোঝা নাকি ভার, তার চেয়ে ভার জুয়েলের মন বোঝা। তাঁর মনের আকাশে যখন-তখন আলো-আধারির খেলা চলে। অন্তর্যামীই কেবল তা বুঝতে পারেন। মনে মনে বলি, এতসব লোক থাকতে জুয়েল বেচারাকে কেন যে পিঁপড়েগুলো কামড়াতে গেল। ওদের কি কোনো হুশজ্ঞান নেই? শুধু শুধু আমাদের বিপদে ফেলা। বুদ্ধি তো তাদের কম না। দলবল নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধভাবে চলে। শীতের খাবার জোগাড় করতেও কম পটু না। তাহলে কেন জুয়েল বেচারীকে শুধু শুধু কামড়ে দেওয়া? আসুন জুয়েলকে কামড়ে দেওয়া পিঁপড়ে দলের দুই পিঁপড়ের মধ্যে যে কথা হয়েছিল, শুনি। একজন দরদি পিঁপড়ে, অন্যজন হিংসুটে পিঁপড়ে। 

দরদি পিঁপড়ে: আহা! বেচারীকে কামড়ে দিলে? হিংসুটে পিঁপড়ে: দেব না? দরদ দেখি তোমার উথলে উথলে ওঠছে, এ্যা! দরদি পিঁপড়ে: না না,ব্যাপারটা তা না, মানে আরেকটু মানবিক হওয়া উচিত ছিল। হিংসুটে পিঁপড়ে: মানবিক! আমরা মানুষ না কি যে মানবিক হব! মানবিক যাদের হওয়ার, তাদের খবর নেই। অযথা পিষে দেয়। আবার মানবিক হব, আসছে। দরদি পিঁপড়ে: হয়তো দেখেনি, খেয়াল করেনি। মানুষই তো ভুল করে। সে তো ফেরেশতা না। হিংসুটে পিঁপড়ে: সে বড় বড় চোখ থাকতে দেখেনি। তার মগজও বড়, খেয়ালও বড়। তোমার খুব বেশি দরদ লাগলে বিষ নামাও গিয়ে, যাও। আর বিষ আছে কী করতে, শুনি? আত্মরক্ষার্থে কামড়ে দিতেই তো না কি?

ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে পিঁপড়েদের কথা শুধু আমি-ই শুনতে পেলাম। জুয়েল যদি শুনত তাহলে হয়তো বেচারা ওদের যুক্তিতে শান্তনা খুঁজে পেতে পারত। কি-ই বা করা। জুয়েলকে এটা সেটা বলে বিষের যন্ত্রনা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। ওদিকে ঘুমকাতুরে বিপ্লব ঘন ঘন হাই তুলছে। হাই তুলতে তুলতে জুয়েলকে কি যেন বলার ব্যর্থ চেষ্ট করল। কারণ তার হাই তোলা আর কথা একই সাথে জড়িয়ে যাওয়ায়, কথা আর হাই তোলা মিলিয়ে অর্থহীন শব্দ তৈরি হয়েছে। শব্দের পাঠোদ্ধার করতে পারিনি। আমাদের দলে একজন ভাষা বিশেষজ্ঞ থাকলে ভালো হতো। এতসবের মধ্যে হানিফ সাইকেল চালানো বাচ্চাছেলে দুটোকে পটিয়ে ওইটুকুন জায়াগার মধ্যে দুচক্কর দিয়ে দিয়েছে। জুয়েলের সাথে ঘটে যাওয়া তেলেসমাতি কাণ্ডের ব্যাপারে সে নিস্পৃহ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে নিস্পৃহ থাকতেই পছন্দ করে। হাসপি কোত্থেকে যেন কুলফি মালাই যোগাড় করে নিয়ে এসেছে। একে একে আমাদের সবাইকে একপ্রস্ত বিতরণ করল। এই গরমে কুলফি যেন কুলফি না, অমৃত! ভেবেছিলাম খননকৃত জায়গায় হাটব, যদি অনুমতি থাকে। ইট-সুরকি ছুঁয়ে চোখ বুজে প্রাচীন এ জনপদকে অনুভব করার চেষ্টা করব। সম্ভব না হলে নিদেন পক্ষে ছবি তুলব। খননকৃত স্থান পলিথিনে মুড়িয়ে রাখায় তা আর হলো কই?

 

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারনা এ বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপ প্রায় ১১ শ বছর আগের। এর কাছেই বজ্রযোগিনী গ্রামে বৌদ্ধধর্ম প্রচারক ও পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটা। খনন করে মন্দিরের পাশাপাশি এখানে একটি স্তূপ ও ইটের নালার সন্ধান পাওয়া গেছে। স্তূপ হচ্ছে বৌদ্ধদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের স্থান। গবেষকদের ধারনা আশপাশে নিশ্চয়ই কোনো বিহার রয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত যত বিহার আবিস্কৃত হয়েছে,তার সাথে বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপ পাওয়া গেছে। বিহারগুলো ছিল আধুনিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বৌদ্ধদের ধর্ম ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার স্থান। আবিস্কৃত স্থাপনাগুলো থেকে ধারনা করা হচ্ছে এটি একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল । ইতিহাস থেকে জানা যায় এই অঞ্চলে ৩০টি বৌদ্ধবিহারের মধ্যে অধিকাংশই প্রাচীন বিক্রমপুরে। কারণ বিক্রমপুর ছিল এক সময় সমতট, চন্দ্র-বর্মণ-সেন রাজবংশের রাজধানী। বর্তমানের ফরিদপুরও ছিল প্রাচীন বিক্রমপুরেরই অংশ;‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ বইতে যার উল্লেখ আছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাচীন জনপদ যাঁদের টানে তাঁদের জন্য মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামের এ বৌদ্ধমন্দিরটি হবে আদর্শ স্থান। (চলবে)

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত