স্মৃতিতে পচাত্তরের পনেরই আগস্ট  

  মো. জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২২, ০৮:২১ |  আপডেট  : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:০৪

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টেও কথা ভাবলে এখনও বেদনায় ন্যূয়ে পড়ি। আমি জুলাই মাসে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ কেন্দ্রে বিএ পরীক্ষা দিয়ে শ্রীনগওে ফিরে খেলাঘর আসরের সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাই। আমরা যখন মুন্সীগনেঞ্জ বিএ পরীক্ষা দেই তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল ও মেজপুত্র শেখ জামালকে বিয়ে দেন। খবরের কাগজে ছবি দেখে আমরা বিয়ের কথা জানতে পারি।

আগস্ট মাসের ১৪ তারিখে শ্রীনগর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ধূমকেতু খেলাঘর আসরের সম্মেলনের মন  নির্মান, আমন্ত্রণপত্র বিলি নিয়ে আমরা খুবই ব্যস্ত। ১২ ও ১৩ আগস্ট বাকশালের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করে দুটি জনসভা করেন বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও চীফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। প্রথম সভাটি তিনি করেন বেলতলি জি জে উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। এ সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। অন্যান্য কথার মধ্যে তাঁর একটি কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে- ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে যদি চৌকিদারের দায়িত্বও দেন, তা আমি বিশ্বস্ততার সাথে পালন করবো।’ ১৩ আগস্ট সকালে তিনি স্পিডবোট নিয়ে মজিদপুর দয়হাটার কফিলউদ্দিন চৌধুরী সাহেবের বাড়ি গিয়ে চাঁন মস্তান সাহেবের সাথে দেখা করেন। শ্রীনগর ফিওে আসার পওে তাঁকে আমরা বিদায় জানাই। তিনি ভাগ্যকুলে জনসভা করে নৌপথে ঢাকা ফিরেন।

১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় খেলাঘর আসরের সম্মেলনের প্রধানঅতিথি রনেশ দাস গুপ্তকে নিয়ে ঢাকা থেকে ল যোগে শ্রীনগর পৌঁছেন খেলাঘরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (বর্তমানেপ্রখ্যাতসাংবাদিক) ফরিদ আহমদ ও আমার সহপাঠি দিলওয়ার হোসেন।

রনেশ দাদার খাবার ও থাকার ব্যবস্থা আমরা করি শ্রীনগর কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ওয়ালিউল ইসলাম খানের বাসায়। তিনি অবিবাহিত ছিলেন বিধায় সকল অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথিদের থাকা ও খাওয়ার দায়িত্ব আমরা তাঁর উপর চাপিয়ে দিতাম। তিনি আমাদেও এসব ব্যাপারে সব সময় সহযোগিতা করতেন। তিনি ছিলেন শ্রীনগর ধূমকেতু খেলাঘর আসরের প্রধান উপদেষ্টা। গত বছরের ১১ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় ইন্তেকাল করেন।

১৪ আগস্ট দিনব্যাপি খেলাঘর আসরের সম্মেলন ,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নতুন কমিটি গঠনের কাজে আমরা ব্যস্ত থাকি। অনুষ্ঠানের আসন গ্রহণের সময় প্রধান অতিথির জন্য নির্ধারিত আসনে দাদা কিছুতেই বসবেন না। তাঁর কথা হলো ঐ আসনে ধূমকেতু খেলাঘর আসরের সভাপতি বসবে। বহু অনুরোধ করেও দাদাকে তাঁর জন্য নির্ধারিত চেয়াওে বসাতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে আমাকেই বসতে হলো। আমি লজ্জায় একেবারে ন্যূয়ে পড়ি । প্রধান অতিথির ভাষণে অনেক কথার মধ্যে তিনি বলেছিলেন,  ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হলে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হবে। তখন আমরা বালতি ভর্তি কওে আনন্দ শিশু কিশোরদেও মাঝে বিলাব’। রাতে রনেশ দাদাকে অধ্যক্ষ স্যারের বাসায় পৌছে দিয়ে আমরা বিদায় নিয়ে যার যার বাড়ি যাই।

১৫ আগস্ট নাস্তা করার পওে সকালে দাদাকে লে  উঠিয়ে বিদায় জানানোর জন্য অধ্যক্ষ আবাস থেকে ল  ঘাটের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকি। শ্রীনগর বাজারের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শ্রীনগরই উনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের দোকানের সামনে মানুষের জটলা দেখতে পাই। আমাদের দেখে হাবিবুর রহমান সাহেব হাত ইশারায় ডাকতে থাকেন। কাছে গেলে বলেন ‘কৈ যাস? রেডিওতে কি বলে শোন।’ তখন রেডিওতে বারবার ডালিমের কন্ঠে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও কার্ফুজারির কথা বলা হয়। যা শুনে আমি হাবিবুর রহমানকে উদ্দেশ্য কওে উত্তেজিত কন্ঠে বলতে থাকি,‘আপনাদেও মাথা খারাপ হইছে। সিরাজ শিকদারের দল রেডিওর ট্রান্সমিটার কোথাও বসিয়ে এ সব বলছে। আর আপনারা তা বিশ্বাস করতেছেন।’ আমার কথা শুনে রনেশ দাদা বলেন,”মাথা গরম করোনা। ক্যূ দেতা হয়ে গেছে।’
রেডিওতে তখন খন্দকার মোশতাককে দেশের রাষ্ট্রপতি করা ও সামরিক আইনজারির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।
সব শোনার পর রনেশ দাস গুপ্ত বলেন- ‘মোশতাক খুব ধূর্ত ও নিষ্ঠুর।’

আমরা আবার দাদাকে অধ্যক্ষ স্যারের বাসায় পৌছে দিয়ে শ্রীনগর থানায় যাই। ওসি আবদুর রশীদ মোল্লাহ। তাঁকে আমর প্লাবলি ‘১৯৭১ সালের মতো  আবার থানার অস্ত্র নেওয়ার প্রয়োজন হতেপারে’। তিনি বলেন, মাথা গরম করিস না। খন্দকার মোশতাক যখন প্রেসিডন্ট হয়েছে- তাহলে তোদের নেতাও তাঁর সাথে থাকতে পারে। কেবিনেট গঠন পর্যন্ত অপেক্ষা কর’।

এরমধ্যে একে একে তিন বাহিনী প্রধান, রক্ষীবাহিনী প্রধান ও পুলিশের আইজি কর্তৃক মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা রেডিওতে বারবার প্রচার হতে থাকে। বিকেলে মন্ত্রী পরিষদের নাম ঘোষণা করা হলো। জাতীয় চার নেতা ও কোরবান আলী, সামাদ আজাদ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সকল মন্ত্রীসহ প্রাক্তন দুজন রাষ্ট্রপতি মোশতাক মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছেন। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। আমরা হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকি। আর ভাবতে থাকি কী হয়ে গেল।

বিকেলে আমরা শ্রীনগর কলেজ প্রাঙ্গনে রনেশ দাস গুপ্তকে নিয়ে বসে আলাপ আলোচনা করতে থাকি। দাদা বলেন- ‘আমরা অনেক পিছিয়ে গেলাম। কম কওে হলেও দুই দশক লাগবে গণতন্ত্রে ফিরে যেতে। হত্যা যা হয়েছে আর হয়তো হত্যা করবেনা। মোশতাক চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগের নেতাদেও নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে।’

আমরা পরের দিন রনেশ দাদাকে নৌকা যোগে হাঁসারা কালীকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নির্মলেন্দু মন্ডলের বাসায় রেখে আসি। নির্মল বাবু দাদাকে পেয়ে মনে হলো তিনি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। তিনি বৌদিকে ডেকে বলেন, ‘আস, দেখ জয়নাল কাকে নিয়ে এসেছে।’ নির্মল স্যারের বাসায় ৩/৪ দিন অবস্থানের পর রনেশ দাস গুপ্ত খোঁজ খবর নিয়ে ঢাকা যান।

লেখকঃ-শ্রীনগর কলেজ ছাত্র সংসদেও সাবেক ভিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু গবেষক।

 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত