রাজশাহীতে আইসিইউ সংকটে এক মাসে ২২৯ জনের মৃত্যু, শিশু ৯১
নাজিম হাসান,রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০২ | আপডেট : ৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩৬
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ [রামেক) হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র [আইসিইউ) সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শয্যা না পেয়ে অপেক্ষমাণ অবস্থায় গত এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ জনই শিশু। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০০ শয্যার নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে মোট ৪০টি। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২, বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ১৬ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২টি শয্যা নির্ধারিত। তবে সা¤প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অন্য ইউনিট থেকে সমন্বয় করে শিশু আইসিইউতে আরও ৬টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মার্চ মাসে শিশু আইসিইউতে ভর্তি ছিল ১১৯ শিশু এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ জন। এদের মধ্যে ৯১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ রোগীদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ ছিলেন ৩০২ জন, যাদের মধ্যে ৭০ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন ৩১২ জন; তাদের মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের শারীরিক জটিলতা দ্রæত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে আইসিইউর চাহিদাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
সংকট নিরসনে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস। তিনি জানান, শিশু আইসিইউ শয্যা আগে ১২টি থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি শয্যা শুধুমাত্র হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। বর্তমানে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৮ জন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২৩ জন শিশু। আইসিইউ সংকটের করুণ চিত্র উঠে এসেছে রোগীর স্বজনদের বক্তব্যে। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা রিফাতের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় তার সিরিয়াল ছিল ৩২। পরে তার মেয়েটি মারা যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আইসিইউতে একটি শয্যার জন্য বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯ মাস বয়সী এক শিশু আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩১ নম্বরে থেকে মারা যায়। একই দিনে ৩০ নম্বরে থাকা আরেক শিশু হুমায়রারও মৃত্যু হয়। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ২০১৩ সালে ১ হাজার ২০০-তে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে শিশু আইসিইউতে মোট ১৮টি শয্যার মধ্যে ১২টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং ৬টি অন্যান্য রোগীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে শিশু আইসিইউ সুবিধা সীমিত হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শয্যার চাহিদা থাকে। তবে মার্চ মাসে হঠাৎ করে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫০টিতে পৌঁছেছে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত