মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের পদক্ষেপের পেছনে ক্ষোভ নাকি রাজনীতি?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৭ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৬
বিবিসি বাংলা: রোমান সাম্রাজ্যের কনস্টানটিনোপল নগরী অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে হয়ে উঠেছিল ইস্তাম্বুল। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরটি সোভিয়েত আমলে পরিচিত হয়েছিল লেনিনগ্রাদ নামে। ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ে অনেক দেশের নাম বদলেরও উদাহরণ রয়েছে।
বাংলাদেশেও ক্ষমতার পালাবদলে এমন পরিবর্তন ঘটেছে। কখনো চট্টগ্রাম এম এ হান্নান বিমানবন্দরের নাম বদলে করা হয়েছে শাহ আমানত বিমানবন্দর আবার কখনো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বদলে হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক, ভবন কিংবা পুরো দেশের নামই পরিবর্তন করার নজির নতুন নয়। যার পেছেনে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ঐতিহাসিক নানা কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
যদিও বাংলাদেশে নাম পরিবর্তনের ইতিহাসে সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বারবার সামনে এসেছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে শেখ পরিবারের নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বা সড়কের নামকরণের উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ঢালাওভাবে অনেক নামের অযৌক্তিক পরিবর্তনের উদাহরণও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এ ধরনের পরিবর্তন ঐতিহাসিক স্মৃতি মুছে রাজনীতিতে 'কাউন্টার ন্যারেটিভ' কিংবা প্রতিহিংসার রাজনীতি হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হল বা স্থাপনার নাম পরিবর্তন ঘিরে আবারও নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণের বিষয়টি যে বাড়াবাড়ি মাত্রা পেয়েছিল, তারই পাল্টা প্রতিক্রিয়া এখন দেখা যাচ্ছে।
তবে শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম বদলের বিষয়টিকে 'সঠিক সিদ্ধান্ত নয়' বলেই মত দিয়েছেন অনেকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খোরশেদ আলম বলছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানও স্বীকার করা উচিত।
"আপনি নয়া বন্দোবস্তের কথা বলছেন, দায় এবং দরদের কথা বলছেন, কিন্তু অতীতের পুনরাবৃত্তি করছেন- এটা তো আমরা চাই না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
নাম পরিবর্তন নিয়ে যে আলোচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ও কর্মচারীদের আবাসন টাওয়ারসহ অন্তত পাঁচটি স্থাপনার নাম রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে।
সম্প্রতি দুটি হলসহ ক্যাম্পাসের এই স্থাপনাগুলো থেকে শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের নাম বদলাতে ছাত্র সংসদের দাবি সিনেটে পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম 'শহিদ ওসমান হাদী হল' এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম 'বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম হল' রাখার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া সুলতানা কামাল হোস্টেল এবং রাসেল টাওয়ার ও বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের নাম পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ডাকসুর দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সিনেটে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ পরিবারের নামে থাকা এই স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তনের দাবিটি সামনে আসে।
শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম বদলে 'কাজী নজরুল ইসলাম হল' করার দাবি জানিয়েছিল শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
এমনকি এই দাবির পক্ষে শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর করা একটি আবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দিয়েছিলেন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা।
এছাড়া আবাসিক হলটির মূল ফটকের নামফলকে কাজী নজরুল হল লেখা একটি ব্যানারও ঝুঁলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে আগের অবস্থান থেকে সরে, দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির নামে হলটির নামকরণ করার দাবি জানানো হয়। এমনকি হলের মূল ফটকে শেখ মুজিবের নাম মুছে ওসমান হাদীর নামও লিখে দেওয়া হয়।
এই পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আবাসিক হলের নাম পরিবর্তনের এই পদক্ষেপকে অযৌক্তিক বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ শাহান।
তিনি বলছেন, "বঙ্গবন্ধুকে আপনি মুছে ফেলতে পারবেন না। ৭২ থেকে ৭৫ ওনার ভূমিকা নিয়ে পর্যবেক্ষণ থাকতে পারে সমালোচনা থাকতে পারে, সেটা আমাদের করতেও হবে- কিন্তু এইভাবে পুরো বিষয়টাকে মুছে ফেলা, এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
"এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও সুবিধাজনক বিষয় নয়, আমরা যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলাম সেটার জন্যও ভালো কিছু হচ্ছে না।"
একই সাথে, এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বিতর্কগুলোকেই আবার সামনে আনা হচ্ছে যা বাংলাদেশের সামনে এগোনোর পথেও খুব একটা ভালো কিছু হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
ঢালাওভাবে শেখ মুজিবের নাম বদলে ফেলার প্রবণতা সঠিক নয় বলেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খোরশেদ আলমও।
তিনি বলছেন, শেখ মুজিবের নাম পরিবর্তন করে অন্য কারো নাম দেওয়া একটি অদূরদর্শি তৎপরতা।
তার মতে, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবের নামে শুধুমাত্র একটা হল থাকতে পারবে না- এটা আমি বলবো যে একটা অবিচার।"
যে কাজগুলো আওয়ামী সরকার করেছিল, তারই একটা কাউন্টার এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, যা ইতিবাচক নয় বলেও মনে করেন তিনি।
"যদি ওসমান হাদীর নামে অন্য কিছু করতে চান, তাহলে করা যাক, নতুন হল হচ্ছে দুইটা ছেলেদের হল হচ্ছে আরও অনেক ভবন হচ্ছে সেখানে চাইলে ওসমান হাদীর নামে কোনো একটা ভবন বা হলের নাম করাই যেতে পারে।"
নাম বদলের রাজনীতি কেন?
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নাম বদলের রাজনীতি নতুন নয়। কখনও সংকীর্ণ দলীয় চিন্তায় আবার কখনও এসবের উর্ধ্বে জাতীয় নেতা বা ব্যক্তির অবদানের স্বীকৃতি দিতে নামকরণের উদাহরণ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেরে বাংলা নগর কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো উদাহরণগুলো যেমন তাদের অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে, তেমনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নভোথিয়েটারের নাম বদলে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার কিংবা শেখ পরিবারের একেকজন সদস্যের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা বা ভবনের নামকরণ- এ নিয়ে ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে।
এবছরের ২৬শে জুন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করা প্রতিষ্ঠান, অফিস, স্কুল, গবেষণাগার এবং ছোট ছোট সরকারি স্থাপনার সংখ্যা ৯৭৭টি।
এগুলোর মধ্যে ৮০৮টি স্থাপনার নাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিবর্তন করেছে বলেও জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. খোরশেদ আলম বলছেন, লম্বা সময় ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সারাদেশেই শেখ পরিবারের নামে নামকরণের একটা মহোৎসব দেখা গেছে।
"ওই সময় মাওলানা ভাসানির নাম পরিবর্তন করেও বঙ্গবন্ধু নাম দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে মানুষের মধ্যে কিছু ন্যায্য ক্ষোভ আছে- এটা সত্য, তার একটা ন্যায্য বহিপ্রকাশও আছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ অ্যাকশনটা বেশি করেছে বলেই তার প্রতিক্রিয়া এখন অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে বলেও মনে করেন এই শিক্ষক।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান রয়েছে উল্লেখ করে মি. আলম বলছেন, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বাকি স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম পরিবর্তনের কারণ কী?
এছাড়া বিভিন্ন স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের যে চেষ্টা রয়েছে, তার মধ্যে, মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত ব্যাক্তিদেরকে রিপ্লেস করার একটা প্রবণতাও দেখছেন মি. আলম।
"সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নাম ছিল ইকবাল হল সেটি ফিরিয়ে আনা, সূর্যসেন হলের নাম ছিল জিন্নাহ হল সেটি ফিরিয়ে আনা," এমন চেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এমন সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ শাহান।
তিনি বলছেন, "সরকার তো এসব ক্ষেত্রে কখনই শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলো এর পাল্টা কোনো বার্তা দিচ্ছে না, যার ফলে আবারও সেই একই পথে হাটছি আমরা"
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল, এমন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়া হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আসিফ শাহান বলছেন, "আপনি চাচ্ছেন এই ধরনের ঘটনার পরিবর্তন। কিন্তু সেটাকেই যদি আবার আকড়ে থাকেন তাহলে কিভাবে নতুন বন্দোবস্ত সেটা তো পরিষ্কার নয়," বলেন তিনি।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত