যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য, রাজধানীতে প্রতিদিন অতিরিক্ত আদায় ১৮২ কোটি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:২৮ |  আপডেট  : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:১৫

রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহনে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ কোটি ট্রিপ যাত্রী সাধারণের কাছ থেকে ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে বলে দাবি করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। 

মঙ্গলবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই দাবি করেন। চতুর্থ যাত্রী অধিকার দিবস উপলক্ষে ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গত ১ বছরে দুইবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয় গণপরিবহনের ভাড়া। এতে অস্থির হয়ে ওঠে গণপরিবহন খাত। বর্তমানে নগরীর কোনো পরিবহনে সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর নেই। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। এই সময়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদ করায় তর্কের জেরে গণপরিবহগুলোতে ২৫টি যাত্রী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। ১৪ যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে হত্যা ও ১০ যাত্রীকে আহত করা হয়েছে। এতে গণপরিবহন ব্যবহারে যাত্রী সাধারণের মাঝে ভীতি সঞ্চার হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। 

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ উপ-কমিটির ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ২০ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ করেছে। এ সময় দেখা যায়, জাইকার সমীক্ষানুযায়ী রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহনে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ কোটি ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হয়। গত এক বছরে দুই দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গণপরিবহনে অস্বাভাবিক হারে ভাড়া নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে চেষ্টা করেও এই রাজ্য থামাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবহন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। 

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পর্যবেক্ষণকালে বিভিন্ন যানবাহনের চালক, সহকারী ও ভাড়া আদায়কারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালিকের দৈনিক জমা, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, সড়কের চাঁদাবাজি, গাড়ির মেরামত খরচ ও দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধিতে তারা এহেন ভাড়া নৈরাজ্য চালাতে বাধ্য হচ্ছে। পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, রাজধানীতে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত আদায় করছে বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহন।

রাজধানীর ৫ হাজার বাস-মিনিবাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হয় উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, লক্কড়-ঝক্কড় এসব সিটি সার্ভিসের শতভাগ বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এসব বাস-মিনিবাসে যাতায়াতে যাত্রী প্রতি মাথাপিছু গড়ে ১৭ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া দিতে হয়। এতে ৫০ লাখ ট্রিপ যাত্রী দৈনিক গড়ে সাড়ে ৮ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে। 

এছাড়াও রাজধানীতে ১৫ হাজার বৈধ অটোরিকশার পাশাপাশি আরও ১৫ হাজার ঢাকা ও আশপাশের জেলায় নিবন্ধিত অটোরিক্শা অবৈধভাবে চলাচল করে। ৩০ হাজার অটোরিকশা দৈনিক গড়ে ১২ ট্রিপ হিসেবে ৩ লাখ ৬০ হাজার ট্রিপ যাত্রী বহন করে। এসব অটোরিকশায় প্রতিট্রিপে গড়ে ১৪৫ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় হয়। এতে দৈনিক ৩ লাখ ৬০ হাজার ট্রিপ যাত্রীকে অটোরিকশা খাতে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, হিউম্যান হলারের ভাড়া নির্ধারণের আইন থাকলেও সরকার ভাড়া নির্ধারণ না করায় এখানে বরাবরই দুই থেকে তিনগুণ বাড়তি ভাড়ায় যাতায়াত করতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের যাত্রী সাধারণকে। ১২ হাজার বৈধ হিউম্যান হলারের পাশাপাশি মেয়াদোর্ত্তীণ, লক্কড়-ঝক্কড়, স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি আরও প্রায় ১৮ হাজার হিউম্যান হলারসহ ৪০ হাজার হিউম্যান হলার রাজধানীতে দৈনিক গড়ে ৮০ লাখ ট্রিপ যাত্রী বহন করে। প্রতিট্রিপে যাত্রীপ্রতি গড়ে ৮ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। এতে ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা কেবল হিউম্যান হলারের যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী দাবি করেন, ৫ লাখ রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, ট্যাক্সিক্যাবে দৈনিক গড়ে ২ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার ট্রিপ যাত্রী বহন করছে। এসব যানবাহনে যাত্রীপ্রতি গড়ে ৭৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এসব যানবাহনে প্রতিদিন গড়ে ১৬২ কোটি ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এহেন ভাড়া নৈরাজ্যে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে, পণ্যমূল্য বেড়েছে, সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। 

ভাড়া নৈরাজ্য প্রতিরোধে এবারের যাত্রী অধিকার দিবসের অন্যতম দাবি

পরিবহনখাত আমূল সংস্কার করতে হবে। পরিবহনে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক লেনদেন ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় নিশ্চিত করতে হবে। নগদ লেনদেন বন্ধ করতে হবে।
ভাড়া নির্ধারণে মালিক সমিতি একচ্ছত্র আধিপত্য বন্ধে অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের কারিগড়ি জ্ঞান সমৃদ্ধ লোকজন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বাসভাড়া নির্ধারণ কমিটি পুণর্গঠন করতে হবে।
ব্যয় বিশ্লেষণের নামে মালিক সমিতির প্রেসক্রিপশনকে সঠিক ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা যাবে না। ভাড়া নির্ধারণে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির তালিকা মাঠ পর্যায়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও ক্যাবের প্রতিনিধি নিয়ে যাচাই বাছাই করে চূড়ান্তভাবে ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাস ভাড়ার তালিকা সংস্কার করতে হবে। যাত্রীসাধারণ শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলে বুঝে, এমন ভাড়ার তালিকা বড় হরফে ডিজিটাল ব্যানারে বাসের ভেতরে সাঁটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পজ মেশিনের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টিকিট দিয়ে ভাড়া আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
ওয়েবিলের নামে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়, সিটিং সার্ভিস ও গেইটলক সার্ভিস বন্ধ করতে হবে।
গণপরিবহনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, আসন যাত্রী সাচ্ছন্দে বসার উপযোগী রাখতে হবে।
গণপরিবহনের বাহ্যিক পরিবেশ উন্নত করতে হবে। সার্বক্ষণিক পাখা চালু রাখতে হবে।
গণপরিবহনে যাত্রী সেবা প্রদান, যাত্রী সেবার মানোন্নয়নসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যাত্রী প্রতিনিধির মতামত নিতে হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে জরিমানার ক্ষেত্রে একক মালিকানার বাসে ২০ হাজার টাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট সাংবাদিক মাসুদ কামাল, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্য, অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কোম্পানিজের চেয়ারম্যান রফিকুল হোসেন কাজল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি হানিফ খোকন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অপরাধ বিজ্ঞানী প্রফেসর মোজাহেরুল হক ও যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল প্রমুখ।
 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত