আমার কিছু হলে এর দায় ভরসা ও বিএনপিকে নিতে হবে : আখতার হোসেন
রংপুর প্রতিনিধিঃ
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৬ | আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৪
সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন/ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রথম সফরে আসছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তার সফর ঘিরে হারাগাছে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে পৌর বিএনপি। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আখতার হোসেন একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তার কিছু হলে এর দায় ভরসা ও বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে তার দায় ভরসা এবং বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে। আমরা হারাগাছের নিপীড়িত শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোররাতে আখতার হোসেন তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসের শেষাংশে একথা জানিয়েছেন।
ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে আখতার হোসেন লিখেছেন, সরকার গঠন করেছে বিএনপি আর নতুন সরকারের আমলে প্রথম হরতাল হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। রংপুর-৪ এর হারাগাছে আজ আমার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে এমদাদুল ভরসার পৌর বিএনপি। এনারা আসলে বিএনপি করেন না, ভরসা করেন। কিন্তু বিএনপির সরকার গঠনের আভাস পাওয়ার পর থেকে বাড়িঘর ভাঙচুর, লোক পেটানো, রক্তাক্ত করা, লুটপাট, ভয়ভীতি দেখানো, আন্দোলনের নামে সহিংসতা সব করছে বিএনপির নামে।
নির্বাচন এবং হারাগাছ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ১২ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো দিন আমি হারাগাছ পৌরসভায় অবস্থান করি। খুবই খারাপ লাগছিলো কারণ কোনো কেন্দ্রের সামনে এনসিপির শাপলা কলি মার্কার ব্যাজ ধারণ করে কাউকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। ২০টি কেন্দ্রের প্রত্যেক কেন্দ্রের সামনে শত শত ধানের শীষের লোক আর অল্প কিছু মানুষ শাপলা কলির। ব্যাজ না থাকায় তাদের দূর থেকে আলাদা করে চেনাও যায় না।
তিনি অভিযোগ করেন, চর চাতুরী আদর্শ কেন্দ্রে গিয়ে শুনি ভরসার লোকেরা একটু আগেই আমার দুইজন কর্মীকে থাপ্পড় দিয়েছে। ওরা আর কেন্দ্রের কাছেও আসতে পারছে না। হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখি কেন্দ্রের বাইরে শাপলা কলির ভোটার স্লিপ বিতরণের টেবিল ভরসার লোকেরা ভেঙে দিয়েছে। মোল্লাটারী কেন্দ্রে ভরসার লোকেরা শাপলা কলির কর্মীদের শাসিয়েছে, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেছে, লাঠি দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। প্রায় প্রত্যেক কেন্দ্রে একই অবস্থা। প্রশাসনকে বলে, মিডিয়ায় উল্লেখ করে কোথাও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি।
আখতার হোসেন আরও লিখেছেন, রংপুর-৪ আসনে সবসময় নির্বাচন নিয়ে একটা ভয় থাকে যে কাউনিয়া পীরগাছার বাকি সব কেন্দ্রে ফলাফল যাই হোক হারাগাছের প্রার্থী হারাগাছে যেমনে হোক ফলাফল ঘুরিয়ে দেবে। রংপুর-৪ এ ৫ লাখ ৯ হাজার ভোটারের মধ্যে একক এলাকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোট হারাগাছ পৌরসভায়। মোট ভোটার ৫৫, ৪৫১ জন। এই ভোটগুলো নিয়েই এবারও ভরসার প্ল্যান ছিলো। সেই প্ল্যান কিছু তারা বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু ভরসার লোকদের হারাগাছের ভোটের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেখানোর জালিয়াতি বন্ধ করতে পারায় শাপলা কলি জিতে আসতে সমর্থ হয়। তাদের সেই কূটচালের ক্ষোভ এখনো মেটেনি।'
তিনি দাবি করেন, বিকালবেলা আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করি। সারাদিন নির্বাচন নিয়ে ভরসার লোকেরা যা অনিয়ম, অত্যাচার করার করেছে কিন্তু হিসেবের সময় যেন অতিরিক্ত ভোট দেখাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই হিসেবে আমি প্রত্যেক কেন্দ্রে কতো ভোট কাস্টিং হলো সেই হিসেব নিতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে যেতে শুরু করি। প্রায় কেন্দ্রগুলোতে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররা আমাকে অসহযোগিতা করেছেন। আমি ভোট গণনা বিষয়ক প্রার্থীর অধিকার বিষয়ক আইনের উল্লেখ করে করে কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। কোন মার্কায় কত ভোট তখনও তার হিসেব বের হয়নি। শুধুমাত্র কোন বুথে, কোন কেন্দ্র কতটি ভোট পড়েছে সেই হিসেব নিতে পারছিলাম। সময় উল্লেখ করে প্রিজাইডিং অফিসারকে দেখিয়ে সেসব ছোট নোট খাতায় লিখে রাখছিলাম। কিন্তু হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি শত শত ভরসার ভাড়া করা লোকেরা কেন্দ্রের গেট আটকে দিয়েছে। তারা আমাকে মারার হুমকি দিচ্ছে। ইট-পাটকেল ছুড়ছে। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে। আমাকে তারা জ্যান্ত বের হতে দেবে না। এমতাবস্থায় আর্মি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আমি কেন্দ্র থেকে জীবন নিয়ে বের হতে সক্ষম হই।
আখতার আরও অভিযোগ করেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী এমদাদুল ভরসা হাজির হন। তিনি প্রথমে আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার বলা আইনি যুক্তির কাছে হার মেনে নেন। এমনকি আমার সাথে পরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিতে রওয়ানা হন। আমরা হাত ধরাধরি করে দরদি স্কুল কেন্দ্রে প্রবেশ করি। সেখানে কেবল ব্যালট বক্সগুলো খোলা হয়েছে। আমি এবং ভরসা সাহেবের পিএস কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। দুঃখের বিষয় হলো হিসেব নেওয়ার সময় সেখানে শাপলা কলির কোনো এজেন্টে আমি পাইনি। দরদি স্কুলের বাইরে বের হতেই দেখি ভরসা ভাইয়ের গাড়ির গ্লাস ভাঙা। গ্লাসের ভাঙা জায়গায় ছোট গ্লাসের টুকরোগুলো বাইরে বের হতে চাইছে। একটু তাকালেই বোঝা যায় ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছে। মজার বিষয় হলো সেখানে ভরসা ভাইয়ের গাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি, পেছনে আমার গাড়ির পরেই কয়েকটা আর্মির গাড়ি। আর জনসাধারণের সেখানে প্রবেশাধিকার নাই। তবুও ভরসা ভাই এনসিপিকে গাড়ির গ্লাস ভাঙার দায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করলেন। মিথ্যা অভিযোগ দিলেন। তার পিএস বললেন ভিডিও আছে তার কাছে। আমিও ম্যাজিস্ট্রেটকে বললাম ভিডিও দেখে এনসিপির লোক হলেও গ্রেফতার করতে। অথচ ভিডিও এলো না, না কেউ গ্রেফতার হল আর না ভরসার লোকেরা গাড়ি ভাঙা নিয়ে কথা বলছে। নিজের ফাঁদে নিজে ফেঁসে যাবার ভয় ভরসার লোকেদের ভালোই ধরেছে বোঝা যাচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে আখতার হোসেন লিখেছেন, এরপর ১২ তারিখ সারাদিন গেলো, সারারাত গেলো, শাপলা কলি জিতে এলো। ভরসা সাহেব কোথাও কোনো মিডিয়ায় ভোট নিয়ে কোনো অনিয়ম, কোনো অসুষ্ঠুতার অভিযোগ জানালেন না। হারাগাছে ভোটের অনিয়মের যে প্ল্যান তার ছিলো সেই অভিযোগ নিজে আগেভাগে ভরসা করে কেমনে? এজন্য সারাদিন মনে মনে যে অনিয়মের প্ল্যান তার থাকুক, মুখে মুখে সুষ্ঠু ভোটের কথাই বলে গেছেন ভরসা সাহেব।
তিনি লিখেছেন, নিজে হেরেছে, ভেবেছে সরকারও বোধহয় ১১ দলের হবে, এজন্য কিছু সময় তাণ্ডব শুরু করেনি। এরপর যখনই বিএনপি সরকার গঠন করবে এমন আভাস আসতে শুরু করলো ১৩ তারিখ থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠলো ভরসা বাহিনী। ভরসার লোকেরা হারাগাছে এনসিপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করলো। অনেককে মেরে রক্তাক্ত করলো, লুটপাট চালালো।
আখতার হোসেনের অভিযোগ, একদিকে ভরসা নিজে শাড়ি-লুঙ্গি দেয় আর অন্যদিকে তার কর্মীদের দিয়ে লুটপাট চালায়। নির্বাচনের দশ দিন পার হলো হারাগাছে এনসিপির অনেক কর্মী এবং তাদের পরিবার এখনো বাড়িতে যেতে পারে নাই। শাড়ি-লুঙ্গি দেওয়া ভরসা কি তার কর্মীদের দ্বারা বাড়ি ভাঙা, বিয়ের সময় গিফট পাওয়া স্বর্ণ লুটপাটের শিকার সেই অসহায় মায়ের চিৎকার শুনতে পায়? নাকি সেইসব অসহায় গৃহবধূর, শিশুর, মায়ের আর্তচিৎকারে ভরসার আনন্দ?
আখতার হোসেনের দাবি, হারাগাছে ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে ২৭ হাজার পেয়েছে ভরসা, তার থেকে ২২ হাজার ভোট কমে ৫ হাজার ভোট পেয়েছি আমি। কিন্তু হারাগাছে প্রতিটা ভোট আমার কাছে হাজার ভোটের সমান। আমি আমার হারাগাছের ভোটার এবং সবার মর্যাদা রক্ষা করার লড়াইয়ে আছি। ওদের প্ল্যান ছিলো কাস্টিং ভোটের চেয়ে আর ১৫-২০ হাজার ভোট ধানের শীষে বেশি দেখানোর। কয়েকজন সাহসী মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা সেই জালিয়াতি ঠেকিয়েছি। এটা সবাইকে টার্গেটে নিয়ে হত্যার হুমকি দিচ্ছে ভরসা বাহিনী। তাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলে রেখেছে। প্রশাসন এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি৷
হারাগাছ এলাকায় সফর প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, আজ আমি হারাগাছে আসবো শুনে ভরসা বাহিনী সরকারে থেকে বিরোধী দলের একজন নেতার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে। মাইকিং করে দোকানপাট বন্ধ রাখার হুমকি দিচ্ছে। শুনলাম একটু আগে হরতাল প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করবে তারা। আমি হারাগাছে আমার প্রথম সফর করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনের পরদিন। ভরসা বাহিনীর সন্ত্রাসের কারণে পারিনি। আজ আমি হারাগাছে আসবো ভরসা বাহিনীর দ্বারা ভেঙেচুরে রাখা বাড়িঘরগুলো দেখতে৷ বাড়ি ভাঙা, লুকিয়ে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। তাদের জন্য বিচারের দাবি নিয়ে।
আখতার হোসেন দাবি করেন, গত দেড় বছরে আমি হারাগাছ পৌরসভার জন্য তিন দফায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ এনেছি। সেসব বরাদ্দের কিছু কাজ এখন শুরু হবে। সেই বরাদ্দগুলো কোন কোন খাতে খরচ হলে বেশি মানুষের উপকার হবে তা জানতে আজ হারাগাছে আসবো। কয়েকটি আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা যায় কিনা বা অন্য কিছু। শেষ কথা, আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে তার দায় ভরসা এবং বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে। আমরা হারাগাছের নিপীড়িত শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনে এনসিপির প্রার্থী আখতার হোসেন শাপলা প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দেন ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান তিনি। এছাড়া নির্বাচনের পর দিন থেকে টানা চারদিন হারাগাছ, পীরগাছা ও কাউনিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তার সমর্থকরা। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে ভোট পুনর্গননা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এমদাদুল হক ভরসা।
এদিকে আখতার হোসেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে কাউনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও রংপুর-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন কল রিসিভ না করায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কা/আ
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত