স্মৃতিতে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর

  ফজলুল হক কাশেম     

প্রকাশ: ৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:৫৯ |  আপডেট  : ২০ জানুয়ারি ২০২২, ১১:১৫

উনিশ শ একাত্তরের মার্চ, উত্তাল বিক্ষুব্ধ মার্চ। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তঝরা একাত্তরের মার্চে আমি ০৬ কি ০৭ বছরের শিশু। বিক্রমপুরের শ্রীনগর সদর প্রাইমারি স্কুলের বড় ওয়ানের ছাত্র। আজও মনে পরে সেই অগোছালো এলোমেলো অশান্ত সময়ের কিছু স্মৃতি। পঁচিশে মার্চের কালো রাতেই য্দ্ধু শুরু হয়ে গেল।
    
যুদ্ধ কি? যুদ্ধ কাকে বলে সেটা ভালো করে বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না। তবে পাক সেনাদের গুলির শব্দ, বিামান থেকে ফেলা বোমার শব্দ আজও কানে বাজে। হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত জেলে পাড়া, ব্রজের পাড়া, শ্রীনগর সদর বাজার সংলগ্ন স্বর্ণকারদের ঘরবাড়ী পাক হানাদারেরা যে গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দিল তার ধোয়া এখনও চোখে ভাসে।
    
ভয়ে সারাক্ষন তটস্থ ছিলাম। ভাইবোন সকলে একত্রে জড়সড়ো হয়ে থাকতাম। পাক সেনাদের স্পীডবোডের ভট ভট শব্দ শুনলেই দৌড়ে নিরাপদ স্থান ভেবে প্রত্যন্ত এলাকায় পরিচিত আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য ছুটে যেতাম।
    
আমাদের ঘরের মেজো কাকা , ছোট কাকা দাদা দাদির ঘরের মূল্যবান তৈজসপত্র, স্বার্নালাংকার দ্রব্য সামগ্রী বাড়ির উঠানের পশ্চিমপাশে বিরাট সুরঙ্গ ঘরের মতো গর্ত করে উপরে টিন ও মাটি দিয়ে পুতে রাখা হয়েছিলো নিখুতভাবে। পাকসেনাদের আগমন টের পেলে ঘর থেকে সামান্য শুকনো খাবার ও জামাকাপড়সহ তৈরি করে রাখা রেডিমেট ব্যাগ সাথে নিয়ে দৌড় দিতাম।
    
প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, গ্রাম থেকেই শোনা যেতো ঢাকা শহরের গুলি , বোমার শব্দ। রাতে প্রচন্ড শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যেত, বোমার আওয়াজে আমাদের টিনের ঘর কেপে উঠতো, আতংকে সময় কাটত। আমাদের বাড়িতে আ্শ্রয় নিয়েছিল স্থানীয় ধনাট্য  ও শিক্ষিত বয়োবৃদ্ধ এক বাবু। শ্রীনগর এলাকার তৎকালীন উচ্চ শিক্ষিত ষোলঘর হাই স্কুলের শিক্ষক বাবু রাজেন্দ্র চন্দ্র গোপ। রাজেন্দ্র চন্দ্র গোপের বংশধর সকলে ভারতে চলে গেলেও স্বদেশপ্রেম এবং সম্মানজনক চাকুরীর সুবাদে (বিশাল ভু-সম্পদ , দালান কোঠা, বাগানবাড়ির মালিক গোপ বংশের একমাত্র উত্তরাধিকার) রাজেন্দ্র বাবু জন্মস্থানেই অবস্থান করেন।


    
রাজেন্দ্র বাবু আমার বাবার পাঞ্জাবী, লুঙ্গি , টুপি পড়তেন। হাতে তসবিহ রাখতেন আর আমার বাবা হাজী আবদুল বারেক এর নিকট থেকে কালেমা তৈয়ব - লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসুল্লøাহ (সঃ) শিখে শিখে জপতেন। বাবাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম মিলিটারীরা হিন্দুদেরকে বেশি মাত্রায় অত্যাচার নির্যাতন করে বলে রাজেন্দ্র বাবু মুসলিম সেজেছে। আতংকের মধ্যেও হাসি পেত বাবুর কান্ড দেখে। সত্্িয সত্যি রাজেন্দ্র বাবু যেন পাক্কা মুসলিম।
    
এরই মধ্যে আমার ছোট কাকা আবদুল হালিম মাস্টার (পরলোকগত) হঠাৎ এক রাতে গোপনে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। বাড়ির কেউ টের পাইনি। খুব ভোরে দাদীর কান্না শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সবাই জড়ো হলো দাদী ছোট কাকার ঘরের সামনে। কাকার পড়ার টেবিলে একটুকরো ছোট কাগজে লেখা “ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি দোয়া করো।” এ লেখা দেখে বাবা বুঝলেন ছোট কাকার গন্তব্য। পরে জানা গেলো প্রতিবেশী আবদুর রশিদ মিয়া ( স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামীলীগ শ্রীনগর থানার প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী) এর ছেলে মোশারফ হোসেন, কাকার বন্ধু আবদুল হাই, মোঃ জয়নাল আবেদীন (কৃষি ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক) আবদুর রাজ্জাক (ধাইসার) সহ অনেকেই পরিকল্পনা করে রাতের আধারে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন দেশকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন করতে।

একবার গ্রামে , মিলিটারী এলো। শ্রীনগর সদর থেকে স্পীটবোর্টে ভট ভট শব্দ করে শ্রীনগর গাদিঘাট খাল দিয়ে বোট চলে গেছে শ্যামসিদ্ধি জেলে পাড়ায়। বিকট শব্দ ‘আগুন জ্বালিয়ে বাড়িঘর পুুড়িয়ে অপর কোন অপারেশনে মিলিটারীরা চলে গেছে অন্যত্র। ভয়ে ভয়ে দূর থেকে দূরু দুরু বুকে দেখছিলাম। কিছু সময় পর গিয়ে দেখলাম জেলে পাড়ায় পাক হানাদারদের নিক্ষেপ করা বোমায় কাদামাটি ভেদ করে বিশাল গর্ত হয়ে গেছে। বাড়িঘর গাছপালা পুড়ছে তো পুড়ছে।

যুদ্ধের দিনগুলো যেন শেষ হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে আসে ষোলই ডিসেম্বর উনিশ একাত্তর পাক বাহিনীর পতন হলো। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বীরবেশে মুক্তিযোদ্ধা কাকা তার কয়েক বন্দুসহ ফিরে এসেছে বাড়িতে মায়ের বুকে। স্বজনদের কাছে দাদা, দাদী, বাবা-কাকাসহ আমাদের আনন্দের সীমা নেই। অনেকদিন পরে বাবা বাজার থেকে পোলাও চাউল, মিষ্টি, দুধ আনলেন। বাড়িতে আমরা ভাইবোনেরা মিলে দৌড়ে মোরগ ধরলাম, জবাই করা হলো। সকলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একত্রে বসে পেট পুরে খাওয়া দাওয়া করলাম। বিজয় উল্লাস দিকে দিকে আনন্দ খুশির বন্যা বইছে।

মুক্তিযোদ্ধা কাকার হাতে এসএমজি। সহকর্মী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সুন্দর সুন্দর অস্ত্র।  আমার হাতে এসএমজি দিয়ে গুলি ছুরতে বললেন কাকা। কাকার সহযোগিতা নিয়ে  বাড়ির পাশের পুকুরে গুলি ছুড়লাম। সে কি আনন্দ।

দেশ স্বাধীন হয়েছে শত্রুমুক্ত হয়েছে। কতিপয় অসাধু মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা না দিয়ে রাজাকার খতম করছে। কেউবা হিন্দুদের ফেলে রাখা সম্পদ দখলে নিচ্ছে। রাতের আধারে গ্রামে ডাকাতি শুরু হয়ে গেল। রাতে লাইট দেখলেই ডাকাত ডাকাত বলে লোকজন চিৎকার দিয়ে উঠতো। প্রায় রাতেই ডাকাতি হতো। ডাকাতি, গুলি, আহাজারির শব্দে সদ্য স্বাধীন দেশে সেই উত্তাল মার্চের কথা মনে  পড়তো নতুন করে। দেশ স্বাধীন হবার পরও এহেন অবস্থা মুরব্বীরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলো পাড়ায় পাড়ায় ৪/৫ জন করে পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিবে। তাই হলো, তবুও ভয়ে আতঙ্কে রাত কাটতো।  একদিন সত্যিই ডাকাত ধরা পড়লো। বর্ষার ভোর রাতে ডাকাতি শেষে নৌকাযোগে ফেরার পথে গ্রামবাসি চারদিক দিয়ে ঘেরাও করলে ডাকাত দল অন্যনোপায় হয়ে ধনচে ক্ষেতে আশ্রয় নেয়। অবশেষে ধরা পড়লো ৫ ডাকাত। উত্তম মধ্যম শেষে চোখ উঠিয়ে দেয়া হলো। বড়দের সাথে ডাকাত দেখতে গেলাম। ডাকাত কি চিনতাম না। অবাক হলাম একি ডাকাতও মানুষ!

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো। অনেকদিন পর স্কুল খুললে যুদ্ধবির্ধ্বস্ত সদ্য  স্বাধীন দেশে স্কুলে রিলিফের দুধ- বিস্কুট এসেছে। ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসাবে অন্যান্য ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে রিলিফের বিলাতী দুধ ও তক্তি বিস্কুট বিতরন করলাম নিজেও নিলাম। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমরা টিকিয়ে রাখবো। দুর্নীতিমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়বো। একাত্তরের রক্তঝড়া, অশ্রুঝড়া যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি মানসপটে আজও ভাস্কর অমলীন।

“ফজলুল হক কাশেম, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসাবে কর্মরত। সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি বিক্রমপুর প্রেসক্লাব, সাধারন সম্পাদক বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, শ্রীনগর থানা। নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক বিক্রমপুর বার্তা। প্রতিষ্ঠাতা বার্তা সম্পাদক , আমাদের বিক্রমপুর।”

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত