দুই দফা বন্যায় দিশেহারা চলনবিলের কৃষক • বিঘাপ্রতি লোকসান ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা • ১৫শ টাকা মজুরিতেও মিলছে না শ্রমিক

চলনবিলে ধানের পর এবার কপাল পুড়ছে ভুট্টা চাষিদের

  রাকিবুল ইসলাম, সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১৫:০৯ |  আপডেট  : ১০ জুন ২০২৬, ১৬:০৯

চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের ওপর থেকে দুর্যোগ যেন কিছুতেই কাটছে না। এই তো কিছুদিন আগের উজান থেকে নেমে আসা আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে আকস্মিক বন্যায় ডুবে গিয়েছিল শত শত বিঘা জমির বোরো ধান। দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও সেই ধান ঘরে তুলতে না পেরে চোখের জল ফেলেছিলেন হাজারো কৃষক। ধানের সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই দ্বিতীয় দফায় হানা দিয়েছে বন্যা। আর এবারের বন্যায় কপাল পুড়ছে ভুট্টা চাষিদের। বৈরি আবহাওয়া, ভুট্টার গাছ পানিতে তলিয়ে যাওয়া, তীব্র শ্রমিক সংকট এবং দ্বিগুণ মজুরি দিয়ে ফসল ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে চলনবিলের প্রান্তিক চাষিরা।

সিংড়া উপজেলার ইটালি, কলম, চামারি, ডাহিয়া ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরী, পাড়িল, সাতপুকুরিয়া, মাগুরা, হিজলী, তিশিখালি, আনন্দনগর, কৃষ্ণনগরসহ বিভিন্ন নিচু অঞ্চলে সামান্য পানি বৃদ্ধি পেলেই তলিয়ে যায় বিলের ফসল। 

সরেজমিনে কাউয়াটিকরী গ্রামের দক্ষিণ মাঠে গিয়ে দেখা যায় ভুট্টা চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদের এক করুণ চিত্র। শুকনো জমিতে পাকা ভুট্টা তোলার যখন ভরপুর প্রস্তুতি, ঠিক তখনই বৃদ্ধি হওয়া আত্রাই নদীর পানি বিলে প্রবেশ করে ২-৩ দিনের ব্যবধানে প্লাবিত হয় ফসলি জমি। এখন কোথাও কোমর আবার কোথাও এক বুক পানিতে নৌকা নিয়ে চাষিদের ভুট্টা ভাঙতে হচ্ছে।

বন্যায় ধান কাটার সময় যেমন শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল, এবার ভুট্টা চাষিদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আগে যেখানে ৫০০-৭০০ স্বাভাবিক মজুরিতে শ্রমিক মিলত, এখন গুণতে হচ্ছে দ্বিগুণ টাকা। দৈনিক ১ হাজার থেকে ১৫শ টাকা মজুরি দিয়েও মিলছে না কামলা (শ্রমিক)।

এদিকে চারিদিকে থৈ থৈ পানি থাকায় ভুট্টা শুকানোর কোনো জায়গা মিলছে না। বাধ্য হয়ে কৃষাণ-কৃষাণীরা দিনরাত পরিশ্রম করে রাস্তার ধারে কিংবা বিলের মধ্যে উঁচু কোনো স্থানে ভুট্টা এনে শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। একদিকে বৈরি আবহাওয়া, অন্যদিকে পানিতে ডুবে থাকায় ভুট্টার রঙ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারমূল্যে।

কৃষক আব্দুল মমিন বলেন, "আমার ১০ বিঘা জমির মধ্যে ৮ বিঘা জমির ভুট্টা পানিতে ডুবে গেছে। শ্রমিক খরচ দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ। ডুবে যাওয়া ভুট্টার ফলন তো কম হচ্ছেই, রং নষ্ট হওয়ায় বাজারে দামও পাচ্ছি না।"

কৃষক শাহিন বলেন, "১০ হাজার টাকা জমি লিজসহ সেচ, সার ও শ্রমিক মিলে প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন পাচ্ছি মাত্র ১২ থেকে ১৫ মণ। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে ৯শ থেকে ১ হাজার টাকায়। উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, উল্টো প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।"

তমেজ উদ্দিন নামে আরেক কৃষক বলেন, "আমাদের এই বিলের মাঠে দুই ধাপে বোরো ধান ও ভুট্টা চাষে চরম লোকসান হলো। পরপর দুই আবাদে মার খেয়ে আমরা এখন নিঃস্ব।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ খন্দকার ফরিদ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ২ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ফলনও ভালো হয়েছে। তবে সম্প্রতি বন্যায় বিলের নিচু এলাকার কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে রয়েছে এবং কৃষিপ্রণোদনা, পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

তবে চলনবিল অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে যদি তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা না করা হয়, তবে আগামী মৌসুমে ঘুরে দাঁড়ানো তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবেনা।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত