যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত থাকায় যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরান

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫২ |  আপডেট  : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:৫৯

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত থাকায় ইরান জানিয়েছে, তারা দেশ রক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুত। একই সঙ্গে নতুন সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার তুরস্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। তিনি বলেন, তেহরান অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমাগত জোরদার করতে চায়।এই সফর এমন এক সময় হচ্ছে, যখন আঞ্চলিক নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা থেকে বিরত রাখতে এবং দুই পক্ষকে কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার যাকে ‘আর্মাডা’ বলে অভিহিত করেছেন, সেই বিশাল মার্কিন নৌবহর ইরানের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান নিচ্ছে। এর নেতৃত্বে রয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী।এদিকে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা একের পর এক কঠোর বার্তা দিচ্ছেন।

এসব বার্তায় স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং প্রতিরক্ষাই এখন তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার।ইরানের শীর্ষ আলোচক দলের সদস্য কাজেম গারিবাবাদি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে জানায়, এই মুহূর্তে তেহরানের অগ্রাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং আমাদের দেশ রক্ষায় ২০০ শতাংশ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।

কাজেম গারিবাবাদি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু বার্তা আদান–প্রদান হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হলেও ইরান আত্মরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে।তিনি উল্লেখ করেন, গত জুনে আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ইরান প্রথমে ইসরায়েল এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শিকার হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা জোরালোভাবে তুলে ধরছে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়। এরপর থেকেই একের পর এক সামরিক মহড়া চালানো হয়েছে।বৃহস্পতিবার ইরানি সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, তাদের বহরে ১,০০০ নতুন ‘কৌশলগত’ ড্রোন যুক্ত হয়েছে।

এসব ড্রোনের মধ্যে রয়েছে আত্মঘাতী ড্রোন, যুদ্ধ ও নজরদারি সক্ষম ড্রোন এবং সাইবার যুদ্ধের উপযোগী উড়োজাহাজ, যা স্থল, আকাশ ও সমুদ্রে স্থির বা চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।সেনাপ্রধান আমির হামাতি এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, আমাদের সামনে থাকা হুমকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত যুদ্ধক্ষমতা ও যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করাই সেনাবাহিনীর কর্মসূচি।

এর আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হামলা সহ্য করেও ইসরায়েল এবং প্রয়োজনে পুরো অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যেতে সক্ষম।

‘আমাদের মানুষ মরবে’
তেহরানসহ সারা দেশে ইরানিরা ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, কখনো হুমকি, কখনো আলোচনার ইঙ্গিত ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছেন।ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকেরা সরকারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ ওয়াশিংটন দাবি করছে, চলতি মাসে দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভ ও হাজারো মানুষের মৃত্যুর পর প্রায় অর্ধশতক পুরোনো এই রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

তেহরানে আল জাজিরাকে এক তরুণী বলেন, ‘আমেরিকা কিছুই করতে পারবে না’। তিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বক্তব্যের সুরে বলেন, ‘আল্লাহ না করুন, তারা যদি আমাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র তাদের ঘাঁটিগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।’

তবে সরকারের সমর্থকদের এই দৃঢ়তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শঙ্কাও রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় কোনো যুদ্ধ হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ জনগণকেই।

তেহরানের এক ছাত্রী বলেন, ‘আরেকটি যুদ্ধ হলে তা ইরান ও ইসরায়েল দুই দেশের জন্যই ভয়াবহ হবে। কিন্তু এতে মরবে আমাদের দেশের মানুষ।’পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হলে ধ্বংস আর সর্বনাশ নেমে আসবে। আমি সত্যিই চাই না এমন কিছু ঘটুক।’ নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকার দেওয়া সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।

বেসামরিক প্রস্তুতি
সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য সরকার বেসামরিক প্রস্তুতিও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের কিছু বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যাতে তারা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে খাদ্যসহ জরুরি পণ্য আমদানি করতে পারেন।একই সঙ্গে বিমান হামলা থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র ঘাটতি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

তেহরানের মেয়র ও কট্টরপন্থী রাজনীতিক আলিরেজা জাকানি বৃহস্পতিবার বলেন, নগর কর্তৃপক্ষ ‘অগ্রাধিকার প্রকল্প’ হিসেবে ভূগর্ভস্থ পার্কিং শেল্টার নির্মাণ করবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই প্রকল্প শেষ হতে আগামী কয়েক বছর লেগে যাবে। অর্থাৎ, সংঘাত দ্রুত শুরু হলে ইরানিদের হাতে আশ্রয়ের জায়গা খুবই সীমিত থাকবে।

নতুন যুদ্ধ শুরু হলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কাও প্রবল। গত জুনের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় যেমনটা হয়েছিল।৮ জানুয়ারি রাতে দেশজুড়ে ভয়াবহ বিক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার পুরো ইরানে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। প্রায় ৯ কোটির বেশি মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর অন্যতম দীর্ঘ ও ব্যাপক ব্ল্যাকআউট।

প্রায় তিন সপ্তাহ পর কর্তৃপক্ষ সীমিত আকারে ইন্টারনেট ফিরিয়ে দিলেও বেশির ভাগ মানুষের যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত।যারা কোনোভাবে অনলাইনে ফিরতে পেরেছেন, তারা সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী দমন–পীড়নের ছবি ও ভিডিও দেখে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

তেহরানের এক তরুণী বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, আবার কোনো রাতে ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙবে না তো! চারদিকে এত মৃত্যু দেখছি… যুদ্ধ হোক বা না হোক, আমাদের চারপাশে এখন মৃত্যুই ঘুরছে।’

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত