পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করে বিশ্বব্যাংক নিজেই বঞ্চিত হয়েছে: মসিউর রহমান

  গ্রামনগর বার্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২২, ২০:০৬ |  আপডেট  : ২৫ জুন ২০২২, ০৪:২২

পদ্মা সেতুর মতো একটি বড় ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রকল্প থেকে সরে গিয়ে বিশ্বব্যাংক নিজেদের বঞ্চিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। বলেছেন, বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ায় আমরা বঞ্চিত হইনি। আমাদের লাভ হয়েছে।

শনিবার (১৮ জুন) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু নির্মাণ: বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল দেশসমূহের এক যুগান্তকারী বিজয়’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে তিনি এই কথা বলেন।

পদ্মা সেতুর কথা তুলে ধরে ড. মসিউর রহমান বলেন, ‘আমার ধারণা- এ ধরনের জটিল রিভার্স সিস্টেমে আগামী এক থেকে দেড়শ বছরের মধ্যে সেতু আর হবে না। আমি বলবো- বিশ্বব্যাংক এ ধরনের একটি বড় ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ মতো প্রকল্প থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেছে। আমরা বঞ্চিত হইনি।

আমাদের একটি লাভ হয়েছে। সেটি হলো- এ ধরনের সেতু করার সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের যে আত্মবিশ্বাস এবং সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এতে প্রতীকী অর্জন যেটা সেটা টাকা পয়সার চেয়ে অনেক বেশি।’

পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প নিয়ে শেখ হাসিনার সাহসের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চরম একটা রাজনৈতিক সাহস ও সুবিচারের লক্ষণ। এটা আমরা সব সময় সব জায়গায় সব নেতার মধ্যে দেখি না।’

ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘পদ্মা সেতুর প্রথম যখন আলোচনা শুরু হয়, তখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। আমরা বিশ্বব্যাংক, এডিবি তাদের প্রথমে অনুরোধ করি। আমি তখন ইআরডি সচিবের দায়িত্বে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী। তারা প্রথমেই বললো, এ কাজে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না। পরে এ বিষয়ে জাপান সরকারের সহযোগিতা কামনা করা হয় ‘

এসময় তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থ থেকে সরে যাওয়া, দুর্নীতির অনুমাননির্ভর অভিযোগ ও ওই সময়ে সরকারের অবস্থান এবং নিজেদের অর্থায়নে সেতু তৈরির নানা ঘটনা তুলে ধরেন।

এক পর্যায়ে তাকে বিদেশে বড় প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার প্রলোভন দেওয়া হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমি দেশ ছেড়ে যাইনি। কারণ মনে করেছি দেশ ছাড়লে আমার পায়ের নিচের মাটি চলে যাবে। আবার আশঙ্কা করছিলাম, বিদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার ফাঁকে আমাকে জোর করে স্বাক্ষর করে নেয় কি না।

জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, তরুণ প্রজন্ম আজ প্রস্তুত। পদ্মা সেতুর স্পিরিটকে ধারণ করে তারা এগিয়ে যাবে।

শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু দীর্ঘদিসের লালিত স্বপ্ন। আজ আর স্বপ্ন নয়। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা। আমাদের অহংকার। বাঙালির আত্মনির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। অতুলনীয় নিদর্শন। চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজস্ব অর্থায়নে শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ।

তিনি বলেন, স্ব-অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়া দিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংককে তাদের বৈশ্বিক ল্যান্ডিং সিস্টেম নিয়ে আবার ভাবতে হবে। যারা অংশীজন তাদের সবার প্রতি ন্যায্যতা করতে হবে-এটা আমরা শুনে থাকি। কিন্তু পদ্মা সেতুর ব্যাপারে কী হলো? বিশ্বব্যাংক হঠকারিভাবে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের ভিত্তিহীন অভিযোগ করে। সেই কথিত দুর্নীতির প্রমাণ চাওয়ার পরও আমরা পাইনি। লেনদেন ব্যতীত অনুমান নির্ভরতার ওপর ধারণা করে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়।

স্পিকার বলেন, পদ্মা আমাদের কাছে কেবল একটি ইট-পাথরের নির্মিত সেতু নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে লক্ষ-কোটি বাঙালির আবেগ। আমাদের ভালোবাসা আমাদের গৌরব। দেশের মানুষ সেদিন শক্তি যুগিয়েছিল। কারণ মানুষের শক্তিতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন। আমরা আজ আমাদের সক্ষমতাকে উদযাপন করছি।

তিনি বলেন, আবারও প্রমাণ হয়েছে, বাঙালি জাতি যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমরা পারি। পদ্মা সেতু আমাদের বিজয়ের প্রতীক, উন্নয়নের প্রতীক। ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক। আমাদের হার না মানার প্রতীক। আমাদের সক্ষমতার প্রতীক। বঙ্গবন্ধু কখনও বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে আপস করেননি। আমরা বারবার প্রমাণ করেছি নিজেদের দৃঢ়তা।

স্পিকার বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সর্বত্র। বাড়িতেও আলোচনা। ছেলে-মেয়েদের সাথে আলোচনা হয়। আমার মেয়ের বয়স ২৮ আর ছেলের ১৮। তাদের সাথে আলোচনায় যে অভিমত পাই, মেয়ে বলেছে, পদ্মা সেতু আমাদের নেতা শেখ হাসিনার সাহসের প্রতীক। শেখ হাসিনার দৃঢ়তার প্রতীক। ছেলে বলেছে, পদ্মা সেতু আমাদের নৈতিক সততার প্রতীক। ভবিষ্যতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রতীক।

সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. সামসুল আলম বলেন, পদ্মা সেতু অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য সাহসের প্রতীক। এটা শতবর্ষে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থাকবে। পদ্মা সেতু বাঙালি জাতিকে প্রথম তার আর্থিক সামর্থে্যর পরিচয় বহন করে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাকিপন্থী এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদরা ব্যাপকভাবে সোচ্চার হয়েছিল। তারা বলেছিল- এই সেতু করা সম্ভব নয়। এটি শুরু করতে পারবে কিন্তু শেষ হবে না। এটা ভেঙে পড়বে। এটা করতে গেলে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন, পদ্মা সেতুর কাজ তো বন্ধ হয়ইনি বরং আমরা এই সময়ে আরও ১০টি মেগা প্রকল্প নিয়েছি।

অর্থনীতিবিদ ড. এম খলিকুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক সত্তা দিয়ে এটা বিবেচনা করেছেন এবং সেতু নির্মাণ করে তার যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়ে আমাদের অগ্রগতি আরও সুদৃঢ় ও ত্বরান্বিত করেছেন।

সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ড. গোলাম রহমান বলেন, পদ্মা সেতু আন্তর্জাতিক ও বিশ্বব্যাংকের কূটনীতিক চালে পড়েছিল। দুর্নীতির নামে বাংলাদেশকে যেভাবে অপমান অপদস্থ করার অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এই সেতু করেছেন।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত