গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে এবার তিন ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১ মে ২০২৬, ১০:১৫ |  আপডেট  : ১ মে ২০২৬, ১১:০৫

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে এবার তিন ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।এ বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, যা আগেরবার ছিল ১৪৯তম।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস (৩ মে) সামনে রেখে এ বছরও ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, তথ্যের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টাস উইথআউট বর্ডারস (আরএসএফ)।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের ইতিহাসে প্রথমবারের মত অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে অন্তভুক্ত হয়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর এর আগে কখনো এত নিচে নামেনি।

পাঁচটি উপসূচকে পাওয়া নম্বর নিয়ে মোট নম্বরের ভিত্তিতে এই সূচকে প্রতিটি দেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পাঁচ উপ সূচক হল- রাজনৈতিক সূচক, অর্থনৈতিক সূচক, আইনি সূচক, সামাজিক সূচক ও নিরাপত্তা।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে এ বছর বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪, স্কোর ৩১.৯। গত বছর একই সূচকে বাংলাদেশ ছিল ১৪৫, স্কোর ছিল ২৯.৩। অর্থাৎ এই সূচকে আগের বছরের চেয়ে বাংলাদেশের ১০ ধাপ উন্নতি হয়েছে।

গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ ১৫ ধাপ পিছিয়েছে। এ বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯, স্কোর ৩১.৬৭; গত বছর অবস্থান ছিল ১৩৪, স্কোর ৩৩.৮০।

গণমাধ্যমের আইনি ক্ষমতার সূচকে এ বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম, স্কোর ৩৪.৩৮। গত বছর অবস্থান ছিল ১৫০, স্কোর ৩৬.৭১। একধাপ পিছিয়েছে।

গণমাধ্যমের সামাজিক সূচকে এ বছর বাংলাদেশ আছে ১৪৮তম অবস্থানে, স্কোর ৩৭.৬০। গত বছর ছিল ১৪৪, স্কোর ছিল ৩৯.৮৭। অর্থাৎ বাংলাদেশ ৪ ধাপ পিছিয়েছে।

গণমাধ্যমের নিরাপত্তার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এ বছর ১৬১, স্কোর ৩০.৫১। গত বছর ছিল ১৫৯, স্কোর ছিল ২৯.১৭। অর্থাৎ বাংলাদেশ দুই ধাপ পিছিয়েছে।

সার্বিক সূচকে এ বছর বাংলাদেশের মোট স্কোর ৩৩.০৫; গত বছর যা ছিল ৩৩.৭১।

আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অন্তত ১৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের ২০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এই মানুষদের বড় একটি অংশ মূলধারার গণমাধ্যমের ‘নাগাল’ পায় না। এখানে সংবাদ ও তথ্য আদান-প্রদানে ইন্টারনেটই বড় ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এখানে বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং সংবাদ সংস্থা বাসস মূলত সরকারের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার স্পস্ট অভাব আছে। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার মুদ্রিত সংবাদপত্র-সাময়িকী, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েকশ নিউজ পোর্টাল রয়েছে।

তিনটি বেসরকারি টিভির নাম তুলে ধরে তাদের সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়, জনপ্রিয় চ্যানেলগুলো আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপন্থি থাকলেও তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত ছিল। তবে ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।

গণমাধ্যমের রাজনৈতিক কাঠামো বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে প্রতিটি সরকার গণমাধ্যমকে নিজেদের ‘প্রচারের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ওই সময় সেন্সরশিপ, সাইবার হয়রানি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানি, দমন–পীড়নমূলক আইন ও পুলিশের সহিংসতার মুখে সাংবাদিকতা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

গণমাধ্যমের আইনি বাধা হিসেবে, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে প্রণিত বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’- এর কথা তুলে ধরা হয়েছে। আরএসএফ বলছে, এই আইন সাংবাদিকদের বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সুযোগ দেয়।

প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের আর্থিক দিক নিয়ে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের অধিকাংশ বড় গণমাধ্যমের মালিক অল্প কিছু বড় ব্যবসায়ী। তারা গণমাধ্যমকে ‘প্রভাব বিস্তারের ও মুনাফার হাতিয়ার’ হিসেবে দেখেন। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাকেই গণমাধ্যমগুলো বেশি গুরুত্ব দেয়।

গত এক দশকে ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর হামলায় অনেক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে এসব গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ সাংবাদিকদের হুমকি ও হয়রানি করছে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখনো ‘পুরুষশাসিত পেশা’ রয়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

আরএসএফ বলছে, বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হন।

সার্বিক সূচক প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে বলেন, “গত ২৫ বছরের একটি পর্যালোচনার মাধ্যমে আরএসএফ কেবল পেছনের দিকে তাকাচ্ছে না; বরং একটি সহজ প্রশ্ন নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে। আর কতদিন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ, সংবাদদাতাদের পদ্ধতিগত বাধা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই নিরবচ্ছন্ন ক্ষয় সহ্য করব?”

ভুল ও অপতথ্য রোধে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যাবশ্যক: এমএফসি

গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে পরিপূরক আইনি কাঠামো, টেকসই আর্থিক ভিত্তি এবং অযাচিত প্রভাবমুক্ত পরিবেশের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন (এমএফসি)।

বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বিদেশি দূতাবাসগুলোর এই জোটের এমন বক্তব্য আসে।

এমএফসি বলেছে, “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা জোরদারে সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাচ্ছে বাংলাদেশে মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিয়শনের কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক। একইসঙ্গে ডিজিটাল যুগে ভুল ও অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকার স্বীকৃতি দিচ্ছে।

“পরিপূরক আইনি কাঠামো, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকাসহ অন্যান্য সহায়ক পরিবেশের উপর ভর করে চলে গণমাধ্যমের সক্রিয় কার্যক্রম।”

বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছে এমএফসি।

সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রসারে সরকার ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারও করেছে এমএফসি বাংলাদেশ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করা ৫১ দেশের জোট মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন। ২০১৯ সালে কানাডায় প্রতিষ্ঠিত এই মোর্চার বর্তমান কো-চেয়ার যুক্তরাজ্য ও ফিনল্যান্ড।

এবার বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত