শহরের ৬০ শতাংশের বেশি কিশোর-কিশোরী মানসিক চাপে ভুগছে!

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৫৭ |  আপডেট  : ১৪ জুন ২০২৪, ২১:৩৯

দেশের ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী শহুরে ছেলেমেয়েদের ৬০ শতাংশের বেশি মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ভোগে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। এই স্ট্রেসের ফলে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। যেমন- তাদের একটি বড় অংশ স্থূলতা ও বিষণ্ণতা বা অবসাদে ভোগে।

শহুরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে মাত্র আড়াই শতাংশ নিয়মিত খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রম করে। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন, পাবলিক হেলথ ইন্সটিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সংস্থা এই গবেষণা করেছে। তাতে দেখা যায়, সন্তানদের মানসিক চাপের ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতনতা খুবই কম। ফলে তা সামলাতে পরিবার ও স্কুলের সহায়তা খুবই কম পায় তারা।

যা নিয়ে মানসিক চাপে থাকে কিশোর-কিশোরীরা

গবেষণা দলের সদস্য আমব্রিনা ফেরদৌস বলেন, ২০১৯ সালে ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে এ নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) গবেষণা নিবন্ধটি অনুমোদন দিয়েছে। এতে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ছেলেমেয়ের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

বয়ঃসন্ধিকালে তারা নানা মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর হরমোনের বহু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ। ভালো স্কুলে ভর্তি, দুর্দান্ত ফলসহ শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্য- এমন নানাবিধ চাপ তৈরি হয় কিশোর-কিশোরীদের ওপর।
 
ফেরদৌস বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ বোধ করে পড়াশোনা নিয়ে। এছাড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, স্কুলের পারফরম্যান্স এবং রোমান্টিক সম্পর্কের কারণেও স্ট্রেসে পড়ে তারা। আবার নিজেদের শারীরিক অবয়ব নিয়েও তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।

নেপথ্য কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহুরে ছেলেমেয়েদের জাঙ্কফুড খাওয়ার প্রবণতা বেশি। খেলাধুলা ও পরিশ্রমের সুযোগও কম। ফলে তাদের ওবেসিটির সমস্যা হয়। এ নিয়েও মানসিক চাপে পড়ে তারা।

যে কারণে এই মানসিক চাপ

সহগবেষক ফেরদৌস বলেন, কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব, একক পরিবারের কারণে একাকীত্ব, স্কুলে বা অবসরে সমবয়সীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বুলিংয়ের কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। প্রায়শই তারা নিজেদের সমস্যার কথা পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না।

তিনি যোগ করেন, কোনও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বন্ধু বা সমবয়সীদের ওপর নির্ভর করে ছেলেমেয়েরা। বাড়তি ওজন কমাতে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ কিংবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বদলে খাওয়া কমিয়ে দেয়। পরে যা তাদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে।

এই সমস্যা ব্যাপক

গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৬ শতাংশের বেশি শহুরে কিশোর-কিশোরীর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। আর ৩০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে দিনের বড় সময় বাড়িতে থাকে। এছাড়া ঘরের বাইরে খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে মাত্র ২.৬ শতাংশ। শহর এলাকায় খোলা জায়গার অভাব এবং ইনডোর গেমের প্রতি আকর্ষণের কারণে স্থূলতার সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।

ফেরদৌস বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। কিন্তু নানা ধরণের বিষণ্ণতা ও অবসাদ কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সামাজিক ট্যাবু কাজ করে। বেশির ভাগ মা-বাবা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না। যে কারণে ছেলেমেয়েদের জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে।

তার ভাষ্যমতে, অনেকেই না বুঝে কুসংসর্গে পড়ে বিপথগামী হয়। কেউ মাদকাসক্তিসহ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কেউবা আবার আত্মহননের পথও বেছে নেয়।

তিনি বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে তাদের সাহায্য দরকার। তারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এ নিয়ে সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে পরিবার ও স্কুলগুলোর ভূমিকা আরো জোরালো হওয়া দরকার।

সমস্যা চিহ্নিত করে, একে এড়িয়ে না গিয়ে সমাধানের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণায়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত