পদ্মা পাড়ের ইতিকথা 

  প্রকৌশলী আবুল হোসেন

প্রকাশ: ৭ জুন ২০২১ |  আপডেট  : ২২ জুন ২০২১

“আর এক পাও আউগাবি তো দুই টুকরা কইরা হালাইমু খানকি পোলা” বলেই এক পায়ে ভর করে, গেংরিনে আক্রান্ত অন্য পা মাটির সাথে হেচরিয়ে হেচরিয়ে ঘাড়টা সূর্য বরাবর উচু করে ।  শরীরটা হাতির শুরের মতো সামনে ঝুলায়ে, মুখ খুলে খিস্তি খেউড় ছাড়তে ছাড়তে ঘরের ভিতর থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকে মফিজ মৃধা  ।  

ডান হাতে মরিচা ধরা কাঁচি আর বাঁ হাতে লুঙ্গির গোছা ধরা অবস্থায় মফিজ মৃধা রাস্তার উপরে এসে দুমড়ে মুচড়ে ঠাস্ করে পড়ে যায় ।  পড়বে না কেন ? মফিজ মৃধা চোখে দেখে না । 

অতীতের স্মৃতি আর বুকে ক্রমাগত পোষে রাখা ক্ষোপ, আক্রোশ বহন করতে পারছে না একা – বয়েসের ভারে নূয্য দেহ, রক্ত জবার মতো বিদীর্ণ দু’টি চোখ আর মুখের অসংখ্য ভাজে আটকে পরা ধূলি-কণা মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে  ।  এখনো দেহে আছে যুদ্ধের পর মাটিতে পুঁতে থাকা পরিত্যক্ত বোমার মতো কিছু বারুদ ।  বয়স অনেক পেরিয়ে গেলেও শেষ হয় নাই ত্যাজ ।  এখনো শত্রু কে ধাওয়া করতে চায় জীবনকে বাজি রেখে ।  

তার হাতের কাঁচি যতই শো, শা, করে সামনে পিছনে ঘুরাক না কেন – সে যে বাতাস ছাড়া আর কিছুই দুই ভাগ করতে পারবে না – এটুকু বুঝার ক্ষমতা এখন আর মফিজের নেই । 

 লৌহজং গান্ধীর মাঠে বসে নেতাদের ক্রমাগত আশ্বাসের বক্তৃতা শুনতো গালে হাত পেতে– “তোমাদের জন্য স্থায়ীভাবে নদী রক্ষা বাঁধ হবে, নদী ভাঙ্গনে নি:স্ব মানুষের হবে পুনর্বাসন আবার সামনে এগিয়ে যাবে জীবন -নতুন দিনের শুভ সূচনায়” ।  

স্বপ্ন দেখতো পছন্দ করতো মফিজ, ঝড়ে ভাঙ্গা গাছের মতো আবার শিরদাঁড়া উচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণায় ।  হবে, হবে শব্দটি যে ভবিষ্যত কাল থেকে বর্তমান কালের “হয়েছে” শব্দতে রূপ পাবে না – তা জীবনের সায়াহ্নে এসে অশিক্ষিত মফিজের মগজ বুদ্ধিতে না বুঝেলেও অনুভুতিতে শরীর বুঝে হাড়ে হাড়ে ।  

কুঁড়ে ঘরের ছনের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা ধান কাটার কাঁচি, থালা আর গ্লাস ছাড়া তেমন কোন সম্বল নেই মফিজের ।  তিন বছর আগে সাথে থাকা ছোট স্ত্রী রাহেলা বিবি মারা গেছে বাসের চাপায় ভিক্ষে করতে গিয়ে ।  

সেই দিন থেকে জীবনে নেমে আসে আরোও ঘোর অন্ধকার ।  কেউ দিলে খায় আর কেউ না দিলে অভুক্ততা অবস্থায় কেটে যায় দিন I বার বার নদী ভাঙনের পর কনকসার বাজারের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার ঢালুতে তার শেষ ঠাঁই হয়েছে সরকারী জায়গায় পরিত্যাক্ত ছনের ঘরটিতে ।  

এক সময়ের দুর্দান্ত, ত্যাজি ঘোড়ার মাতো দাবড়ায়ে বেড়ানো ধান কুইনা, গাড়ৈ গাঁও , গাওদিয়া, রানাদিয়া, তেউটিয়া, লৌহজং চরের মফিজ মৃধা এখন “ মফিজ্জা পাগলা “  । 

 একদিন যার ডাকে হাজার হাজার চরবাসী ঢাল, সড়কি, টেঁটা নিয়ে জীবন বাজি রেখে পিঁপড়ার সারির মতো লাইন ধরে দাঁড়াতো চর দখলের লড়াইয়ে I যার শক্তির উপর ভর করে হুঙ্কার দিত চরের ভূমিহীনেরা I সে আজ ঘর পোড়া নিঃসঙ্গ পরিত্যাক্ত কালো খুঁটির মতো একা দাঁড়িয়ে আছে এক কোনে I 

মন চায় আরেক বার আগুন লাগুক এই দেহে ।  ধুয়ায় মুখ লুকায়ে পুড়ে পুড়ে ছাড়খার হোক এই দেহ- বিভৎস জীবন থেকে পাক মুক্তির সনদ । 

একবার আশির দশকে চরবাসী আর সাবেক অধিবাসীদের(স্থায়ী অধিবাসী)মাঝে বিরাট দ্বন্দ্ব হয়েছিল ।  তখন এই মফিজ মৃধার ভয়ে সাবেকরা চরে যেতে ভয় পেত ।  

মফিজ মৃধার ভয় দেখায়ে অনেক মা বাচ্ছাদের ঘুম পাড়াতো I প্রতি পক্ষকে ভয়ঙ্কর শত্রু হিসাবে পরিচিত করা শত্রু শত্রু খেলার সহজ সুত্র ।  সাবেক নেতাদের গুটির চালে প্রচারিত হয় মফিজ, ডাকাতের সর্দার হিসাবে ।  

সাবেক অধিবাসী নেতাদের ভিতরে লুকায়িত ছিল ভূমিদস্যুতার চরিত্র ও চর দখলের লোভ ।  সাবেকদের হারানো ভূমি ফিরিয়ে পাওয়ার নামে, চরবাসীদের বিরুদ্ধে দাড় করায় সাধারণ সাবেক অধিবাসীদের ।  

মফিজ ছিল নদী ভাঙ্গা ভূমিহীন, হারিয়েছিল বাপ দাদার রেখে যাওয়া বসত ভিটা, হারিয়েছে সাবেক অধিবাসীর খেতাব, হয়েছে “চৌরা”  ।  

সে চিন্তার পরতে পরতে অনুভব করতো মফিজ - ঘর পুড়লে, ঘর তৈরী করা যায় কিন্তু নদীতে ভাঙ্গলে মানুষ সব হারায় – কিছুই থাকে না I হয় নি:স্ব, শুরু হয় জীবনে সীমাহীন দুঃখ কষ্ট ।  

চরে বাস করা কতো ভূমিহীনদের সে দিয়েছে ভূমি, কতো অভুক্তকে দিয়েছে গোলার ধান, কতো ঘর-চুলাহীনকে দিয়েছে মাথা গোজার ঠাঁই, তার কোন হিসেব নেই I অথচ আজ তার প্রতিবেশী হয়েছে বেওয়ারিস কুকুর, বিড়াল, নিঃস্ব বেঁদে, মুচি, রিক্সাওয়ালা আর ডোবা নর্দমার দুর্গন্ধ মল মূত্র । 

মফিজের কাছে এখন বেচেঁ থাকার মানে, প্রতি সেকেন্ডের শ্বাস-প্রশ্বাসে বায়ুর আদান-প্রদান, সুস্বাস্থ্য মানেই এক খন্ড জীবিত মাংস, খাওয়া মানেই জিব্বা আর মুখ নেড়ে কিছু গেলা, মানুষ মানেই একা একজন – শত্রু মানেই চারিপাশের আলো-বাতাস, ছুটি মানে “ বিদায় পৃথিবী “ – আনন্দ মহল মানেই শেষ গন্তব্য “অন্ধকার কবর” ।

এক সময় গাওদিয়া চরে মফিজের বাড়িতে ছিল কাঠের দুইটি দোতলা ঘর । একটি উত্তর ভিটায় আর একটি দক্ষিনের ভিটায়। পূর্ব-পশ্চিমে খড়ের পালা, তার সাথে লাগোয়া এক কুড়ি গরুর আস্তাবল। দুই স্ত্রী আর সাত ছেলে, তিন মেয়ে নিয়ে ছিল সুখের সংসার I ছেলেরা কেউ প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল না বলেই, ছিল চর কেন্দ্রিক জীবন ধারণে অভ্যস্ত। 

আজ ভাগ্যের খেলায় হেরে সন্তানেরা কেউ সাভারে, কেউ ঢাকার কমলাপুরে, আবার কেউ ফতুল্লার বস্তিতে। নিজেদের দু-মুঠো খাদ্যের খোঁজে সারা দিন যায়। যে জীবন প্রতিদিন খুঁজে নিজের খাদ্য, আকাশ যাদের হয় দিন শেষে মাথা গোজার ছাউনি। প্রশ্নাতীত থাকে ক্লান্তিতে আর গ্লানিতে ভরা সেই জীবনে মানবতা, সাংসারিক দায়দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা ।

পদ্মার করাল গ্রাসে প্রতিবারই মানুষ বাড়ি হারায়, ব্যবসা হারায়, হারায় স্মৃতির মনি কোঠায় সঞ্চিত শিশু থেকে যৌবনে বেড়ে উঠার টুকরো টুকরো স্বপ্ন । 

প্রশ্ন করে পদ্মা নদীর কিনারে বসে ভিটে-মাটিহারা মফিজেরা “ রাক্ষসী পদ্মা তোর বুকে এতো জল, তারপরেও কেন তৃষ্ণার্থ তুই আমাদের চোখের নোনা জলের জন্য ? “  । 

পদ্মা শিকারী  । সে বুঝে না, মা হারা শিশুর কান্না I অনুভুতিতে নির্বোধ, গোয়ার্তুমিই যার খেলা – খেলা শেষে করুনা করে একদিন হয়তোবা ভিটে-মাটি ফিরিয়ে দেয়  ।  সেটা আর ভিটে-মাটি থাকেনা সোনার টুকরা গ্রামের আদলে, থাকেনা মন ভুলানো পথ ঘাট, থাকে না জীবন জীবিকার সহায় সম্বল ।  নতুন নাম হয় তার “বালু চর” ।  

নদী ভাঙ্গনের খেলায় রাজনীতি হয় ক্ষুধার্তের মুখের সামনে সুতায় ঝুলানো লোভের বিস্কুট I সহায় সম্বলহীন মানুষগুলি হয় বেওয়ারিস অর্থাৎ ঠিকানাবিহীন ।  

নেতাদের ঠোঁটে ঝিলিক দেয় মধুরবুলি  ।  পকেটে ফুটে মালপানি নামক ঠুস্ ঠাস্ খুশির অতশবাজি ।  

অন্ধকার আকাশে শুরু হয় বারুদে ঘষা আগুনের খেলা I ওরা কুকিল সাজে সমাজে , নর্তকী সাজে সাজ ঘরে I ওদের মদির মত্ততায় ঘুঙুরের আওয়াজ প্রতিযোগিতা করে কান্নার ধ্বনির সাথে ।  একদিকে গরীবের ঘর ভাঙ্গে, অন্য দিকে গড়ে উঠে টাকার পাহাড়ে আনন্দের বাজার । 

এক সময় মানুষ মানুষকে বিক্রি করতো দাস প্রথার আওতায়, পণ্যর আদলে I আজ সভ্যতার চাদরে ঢাকা কিছু মানুষ, মুখে দেশপ্রেমিক, কাগজে সুশীল, বেশ ভূষায় সুফি সফেদ I এরা নিপীড়িত মানুষের সুখ, স্বপ্নকে বিক্রি করে মিথ্যা আশ্বাসের বাগাড়ম্বরতায়, আত্মপ্রবঞ্চনা আর অরাজনৈতিক রাজনীতির হিংস্র এককে । 

তারা জানে - সমস্যা জিইয়ে রাখলে সমাধানের জন্য ভুক্তভোগীরা তাদের কাছে আসবেই I তাই তারা অভায়ারণ্যের সিংহ সেজে শিকার করে হরিণ শাবক আর উচ্ছিষ্ট ছুঁড়ে মারে দেশপ্রেমের নামে অভুক্তদের মাঝে ।

 সমস্যা সমাধান হলে তাদের মূল্য হবে ঝরা ফুলের মতো (যদিও আমি রাজনীতিবিদদের ফুলের মতো ভাবতে পছন্দ করি)। কারণে অকারণে পথের ধূলায় মিশে হবে পতিত অথবা কখনো পথচারীর পায়ে হবে দলিত । শেষ হবে স্বপ্ন দেখানোর ভোজবাজির খেলা। তাই মফিজদের ভাগ্যে দেখা হয় না স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ, হয়ে যায় উদ্বাস্তু – শেষ হয় না স্বপ্ন দেখা।
 
মফিজের জীবন চলতে চলতে একদিন হয়ে যায় মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি I কুকুরের আনাগোনা আর পঁচা গন্ধের বাতাস বলে দেয় “ মফিজ আজ  অসম্পূর্ণ মানুষ থেকে হয়েছে সম্পুর্ন লাশ “ । তার মতো অনেক মফিজ পাগলা হয়তো এবারও বসত গড়বে ছনের ঘরে খোলা মাঠে অথবা নর্দমার পাশে, রাস্তার উচু নিচু ঢালুতে পদ্মার তাড়া খেয়ে । 

জনগনের ভাগ্য দেবতারা বিধাতার থেকে পদোন্নতি পেয়ে অবৈধ অর্জিত টাকা পাচার করে স্থায়ী বসতি গড়বে আমেরিকায়, কানাডায় । ফুলে ফেঁপে একজন থেকে হয়ে যায় দশ জন । প্রেতাত্মারা ত্রানদাতা সেজে আত্মহারা হয়ে দিবে প্রাপ্তির ঢেকুর ! 

পদ্মা পাড়ে চাঁদের আলোয়, জোস্না জোয়ারে নাচবে আহ্ কী আনন্দ গানে গানে I অঙ্গ দোলাবে কেউটে জিভে, চোখে প্রলেপ দিবে ডাইনী কাজলে, আদরে ছড়াবে নীল বিষ ! 
 
মৃত্যুও যাদের ঘৃণা করে উপেক্ষিত অনাদরে, সহজে কাছে টানে না ভয় আর অসহায়ত্বে I সেই মফিজেরাও পাবে ধন্যবাদ একদিন – ওদের মতো ছোট লোকেরা পথে ঘাটে পড়ে না থাকলে, উদ্ধারের নামে মহাযজ্ঞ সুসম্পন্ন না করলে, তাদের কী পদোন্নতি হতো? কপালে কী জুটতো জনগনের বন্ধু নামের “রাজটিকা” ! জয়তু ছোট লোক রমিজ মৃধারা ! চলছে চলবে স্বপ্ন দেখানোর মহাযজ্ঞ ! শেষ হবে না কোনদিন পদ্মা পাড়ের ইতিকথা নামক গল্পের ।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত