জন্ম কী ওদের আজন্ম পাপের  

  হাসান তামিম       

প্রকাশ: ৩ জুন ২০২১ |  আপডেট  : ২৪ জুন ২০২১

আজকের বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আমার উপর ক্ষোভ প্রকাশ করবেন। হয়তবা নানারকম ট্যাগ লাগাতে পারেন। কিন্ত বাস্তবতাকে আপনাদের অস্বীকার করার সুযোগ নেই। 

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের দেহটা পুরুষ কিন্ত মনটা নারীর কিংবা দেহটা নারীর কিন্ত মনটা পুরুষের মতো। তারা আমাদের সমাজে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ। সামাজিক কুসংস্কারের আবদ্ধে তাদেরকে সকল কিছু থেকেই বঞ্চিত করা হয়। 

এমনকি নিজের পরিবার থেকে প্রতিনিয়ত মানসিক যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ধর্ম এবং সমাজের বেড়াজালে এইসব মানুষগুলো নীরবে কেদে যায়। সকল অন্যায় সহ্য করে যায়। অনেকেই আত্নহত্যার পথ বেছে নেয়।

 সভ্যতার  আধুনিকতার সুফল ভোগ করলেও এদেরকে প্রতিমুহূর্তে বঞ্চিত করা হয়। একবার ভাবেন তো আপনি আমি যদি এমন হতাম তাহলে কি করতেন? কিংবা আপনার আমার সন্তান যদি এমন হয় তাহলে তাদের সাথে ধর্ম এবং সামাজিক কুসংস্কারের দোহাই দিয়ে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করতেন? আমি অথবা আপনি তাদের মত হলে কি অবস্থা হতো আমাদের?  বাস্তবতা চিন্তা করে দেখেন কতটুকু টিকে থাকতে পারতেন?

নানা কারনে এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলি না। কারন এইসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় তোপের মুখে পরতে হয়। নামের আগে নানারকম ট্যাগ ব্যবহার করা হয়। কিন্ত বিষয়টি যখন আমার এক বন্ধুর তখন সমাজের অন্যান্যদের মতো চুপ করে থাকাটা নিজেকে কাপুরুষের পরিচয় দেওয়া। বন্ধুর নিরাপত্তার স্বার্থে তার নামটা প্রকাশ করতে পারছি না। 

ছোট বেলা থেকে তার মধ্যে নারীর আচরন বিদ্যমান কিন্ত প্রকৃতিগতভাবে সে একজন পুরুষ। এই কারনে সে বিভিন্ন সময় নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। 

নিজের আপনজনরাও তাকে বিভিন্ন সময় অপমান অপদস্ত করেছে। শুধু তাই নয় নিজের আপনজনরাই তার ন্যায্য অধিকারটুকু দিতে চায় না। সমাজ কি বলবে, ধর্মীয় দৃষ্টিতে এরা নাকি অভিশপ্ত এই ধরনের নানাবিধ কুসংস্কারের বেড়াজালে আমার বন্ধু জীবনের ত্রিশটি বছর অতিবাহিত করেছে।

 বিভিন্ন সময় সে শারিরীক ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্ত এই বিষয়গুলো যখন তার পরিবারকে জানায় তখন তাকে উলটো দোষারোপ করা হয়। একজন সন্তানের কাছে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে তার বাবা মা এবং পরিবার। কিন্ত বাবা মা এবং পরিবার যখন সন্তানকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে তখন সেই সন্তানের জন্য বেচে থাকাটাই অনেক কষ্ট হয়ে যায়। কারন সে সমাজের কাছে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।  

আমার বন্ধুর প্রকৃতিগত পরিস্থিতির জন্য সে কোনভাবেই দায়ী নয়। সৃষ্টিকর্তা যদি তাকে এইভাবেই সৃষ্টি করে থাকে তাহলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে তাকে অভিশপ্ত বলা হয় কেনো? আমি জানি অনেকেই নানাধরনের যুক্তি প্রদর্শন করবেন। একজন মানুষ বাহ্যিক রুপ একরকম কিন্ত অন্তরটা পুরোপুরি ভিন্ন। 

প্রতিনিয়ত নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ধর্মীয় এবং সামাজিক কুসংস্কার থেকে নিজেকে বাচিয়ে রাখতে লড়াই করছে। একদিন হয়তবা লড়াই করে হেরে যাবে। বিদায় নিবে এই ঘৃণায় ভরা সমাজ থেকে। 

আমাদের সমাজ আধুনিক হয়েছে কিন্ত কুসংস্কার দূর হয়নি। কারন ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে ভুল বাক্য শেখানো হয়।

 যেমন যারা আমাদের মতো নয় তাদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে হবে। তৃতীয় লিংগের মানুষ সম্পর্কে আমাদেরকে নানারকম ভয়ভীতি দেখানো হতো। কিন্ত সত্যি বলতে এরাই সর্বদা সততা এবং বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। কিন্ত ধর্ম এবং সামাজিক কুসংস্কারের বেড়াজালে আমরা সর্বদা তাদের সাথে খুবই বাজে আচরন করি।

 সভ্যতার এই আধুনিকতায় আমাদের এই কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সামাজিকভাবে তাদেরকে ঘৃণা নয় বরং বুক ভরা ভালোবাসা দিতে হবে। তারা আমাদের মতোই স্রষ্টার সৃষ্টি। 

আমার বন্ধুর মতো যারা আছেন তাদেরকে আমি ভালোবাসি শ্রদ্ধা করি। যদি সম্ভব হয় তাদের জন্য কিছু করবো।

 কারন তারা সকলেই অসাধারন মনের অধিকারি হয়। তাদের প্রতি ঘৃণা নয় বরং ভালোবাসা দিয়ে তাদেরকে আগলে রাখার চেষ্টা করবো 

লেখক- প্রবাসী সাংবাদিক  

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত