চা-শ্রমিকদের জীবন কিন্তু চায়ের মত স্নিগ্ধ নয়

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১৪:৪০ |  আপডেট  : ২০ জুন ২০২৪, ১১:২২

একাকীত্বে কিংবা আড্ডায়; আলাপে কিংবা আলোচনায়, প্রেমে কিংবা বিপ্লবে এক কাপ চা সকলের সঙ্গী। ন্যাশনাল টুডে'র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সেকেন্ডে মানুষ ২৫ হাজার কাপ চা পান করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন দুই বিলিয়ন কাপেরও বেশি চা পান করা হয়। 

তবে এই চা শ্রমিকদের জীবন কিন্তু চায়ের মত স্নিগ্ধ নয়। উন্নত জীবনযাপনের ব্রিটিশ বেনিয়াদের প্রলোভনে জন্মভুমি ছেড়ে বাংলাদেশের চা বাগানে কাজ করতে আসে একদল মানুষ। কিন্তু কাজে এসে তাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা নিয়ে তারা ফিরে যেতে চায় নিজ জন্মভিটায়। এজন্য ডাক দেওয়া হয় মুল্লুকে চলো (দেশে চলো) আন্দোলনের।

১৯২১ সালের ২০ মে। চাঁদপুরের মেঘনাঘাটে পিতৃপুরুষের আদি ঠিকানায় ফিরে যেতে চাওয়া চা শ্রমিকদের ওপর নির্বিচার গুলি চালিয়েছিল ব্রিটিশ সৈন্যরা। মৃত্যু হয়েছিল কয়েক হাজার চা শ্রমিকের। এর পর থেকে প্রতি বছরই দিনটিতে নিহত সে শ্রমিকদের স্মরণ করা হচ্ছে। পালন করা হচ্ছে চা শ্রমিক দিবস হিসেবে। মুল্লুক চলো বা নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন এ দেশের চা জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এক গুরুত্ব পূর্ণ অধ্যায়। শতবছরের বেশি সময় পেরোলেও আজও দিবসটির সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি।

১৮৫৪ সালে তৎকালীন অবিভক্ত আসাম বর্তমানে সিলেটে চায়ের বাগানের সিংহভাগের দখলে ছিল ব্রিটিশ বণিকরা। মাইলের পর মাইল বিশাল চা বাগানে কাজ করবার জন্য বিহার,উড়িষ্যা,অন্ধ্রপ্রদেশ,উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিচু বর্ণের হিন্দু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনকে নানা প্রলোভনে চা বাগানে নিয়ে আসা হয়। যদিও কিছুদিনের মধ্যেই তা পরিণত হতো দুঃস্বপ্নে। বিশাল পাহাড় ও বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে বাগান তৈরি করতে গিয়ে মারা পড়েন অনেকে। খাটুনিও ছিল অমানুষিক। জীবনযাত্রাও ছিল মানবেতর।

একপর্যায়ে পণ্ডিত গঙ্গাদয়াল দীক্ষিত ও দেওশরণ ত্রিপাঠির নেতৃত্বে মুল্লুকে ফেরার প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক দুঃসহ জীবনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার লাভের আকাঙ্খায় সিলেট থেকে পায়ে হেঁটে নিজ দেশের উদ্দেশে বের হন । পায়ে হেটে চাঁদপুর মেঘনা স্টিমার ঘাটে পৌঁছান। সেখানে ব্রিটিশ গোর্খা সৈনিকরা নির্বিচারে গুলি করে শত শত চা শ্রমিককে হত্যা করে মৃত দেহ মেঘনায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর বাধ্য করানো হয় চা বাগানের বস্তিতে প্রত্যাবনের জন্য। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ এই সময়ে আজো অজানা ঠিক কত সংখ্যক চা শ্রমিককে সেদিন হত্যা করা হয়েছি।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী বলেন, ঘটনার পর পেরিয়েছে ঠিক ১০৩ বছর।ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে পাকিস্থান এর পর স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে অনেক। কিন্তু বদলায়নি চা শ্রমিকদের জীবন মান। সারা দিনের খাটুনির পর বাগানে মজুরি মিলছে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানিসহ মৌলিক সব সূচকেই পিছিয়ে চা শ্রমিকের জীবন। বদলায়নি চা শ্রমিকদের জীবন মান। সারা দিনের খাটুনির পর বাগানে মজুরি মিলছে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা

চা শ্রমিকদের গণহত্যা দিবসটি পালনে বাগান মালিকদের রয়েছে অনীহা উল্লেখ করে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদের সহ সভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, চা শিল্পের আকাশচুম্বী উন্নতি হলেও চা শ্রমিকদের নির্মম গণহত্যার শত বছরের অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। এখনো রাষ্ট্রীয় ভাবে চা শ্রমিক দিবসটি পালনের স্বীকৃতি আজো উপেক্ষিত।

দেশে চা জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্য প্রায় ৮ লাখ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মানুষেরা চা শ্রমিকের কাজ করে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সংগতি রেখে শুধু মজুরী নয়, জীবনযাত্রার অন্যান সূচকে অনেক পিছিয়ে চা জনগোষ্ঠী।

আন্তর্জাতিক চা দিবস। প্রতি বছর ২১ মে উদযাপিত হয়। ভারত বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মালাউই, মালয়েশিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার মতো চা উৎপাদনকারী দেশসমূহ ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি উদযাপন করে আসছে। পূর্বে ১৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করা হতো। ২০১৯ সালে, চা সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি গোষ্ঠী ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক চা দিবসের উদ্দেশ্য হলো চা-কর্মী ও উৎপাদকদের ওপর বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রভাব সরকার ও জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং অর্থনৈতিক সমর্থন ও ন্যায্য বাণিজ্যের সংযোগ স্থাপন করা।

২০০৪ সালে বিশ্ব সামাজিক সম্মেলনের পর ২০০৫ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক চা দিবস উদযাপিত হয় ভারতের নতুন দিল্লিতে। পরবর্তীতে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে দিবসটি উদ্‌যাপনের আয়োজন করে শ্রীলঙ্কা। আন্তর্জাতিক চা দিবস উদ্‌যাপন ও এর সাথে সম্পর্কিত বিশ্ব চা সম্মেলন যৌথভাবে বিভিন্ন শ্রমকল্যাণ সমিতি আয়োজন করে থাকে

২০১৫ সালে ভারত সরকার খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মাধ্যমে দিবসটির উদ্‌যাপন আরো বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২০ সাল থেকে ২১ মে দিবসটিকে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে পালন করার কথা ঘোষণা করা হয়।

ধারণা করা হয়, বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চা পানকারীদের সংখ্যাও বাড়বে। ভারত ও চীনে চায়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে। চা পানে এই দুটি দেশ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ অবদান রাখে। চা মূলত চীন থেকে এসেছে।

 

সান

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত