কোভিড-১৯ : শিশুর জগত ও তাদের ভাবনা

  নারী ও শিশু ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২১, ১:১৬ দুপুর |  আপডেট  : ১ আগস্ট ২০২১, ৪:৩২ দুপুর

শিশুরা বাধাহীন। চলাফেরা, চিন্তা-চেতনায় অপ্রতিরোধ্য। পরিপূর্ণ উচ্ছ্বলতায়। সীমানা নির্ধারণ--বলাই বাহুল্য। এরা চঞ্চল, এরা পাখির মতো ডানা মেলে  স্বপ্নের জগতে উড়বেই...।

থমকে দিলো করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত মানবজীবন। এর থেকে বাঁচার জন্য মানবকুলে উৎকণ্ঠা। আর এই মানবকুল বা মানব জাতির বড় একটা অংশ হলো ‘শিশুরা। এ মুহূর্তে শিশুরা ভুগছে মানসিক চাপে। স্কুল নেই, বন্ধুদের সাথে দেখা নেই, খেলা নেই, ঘরের চার দেয়াল ছাড়া কোথাও যাওয়ার উপায় নেই।

মার্চ ০৮, ২০২০ ইং তারিখে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।  জনসমাগম এড়াতে ১৮ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকে ছুটির মেয়াদ বাড়তে থাকে। দুর্ভাগ্য, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আসে আরও শক্তিশালী হয়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। বর্তমান এ পরিস্থিতিতে চলছে কঠোর লকডাউন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিও জুলাই ‘২০২১ সাল পর্যন্ত চলমান। এ পরিস্থিতিতে শিশুরা গৃহবন্দী। চিন্তার বিষয়-- দীর্ঘ সময় শিশুরা এ অবস্থায় থেকে তাদের মানসিক অবস্থা কী দাঁড়ায়? ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। ছোট একটি শিশু প্রায় দেড় বছর ধরে ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। নেই কোন সামাজিক যোগাযোগ (ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম নয়), সংস্কৃতি চর্চা। এর ফলে শিশুদের মনোজগতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। গভীর উদ্বেগের বিষয়।

দীর্ঘদিনের আবদ্ধ অবস্থা শিশুর সকল ধরনের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি শিশুর ছবি আঁকা, নাচ, গান, আবৃত্তি চর্চা--এসব মানসিক বিকাশের অংশ। এ পরিস্থিতিতে শিশুর সকল ধরনের বিকাশ, বুদ্ধির বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শিশুর সময় কাটানোর জন্য দরকার আরেকটা শিশুর।
 
শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য দেশের প্রায় অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জুম অ্যাপস, গুগল ক্লাসরুম, গুগল মিট, ওয়েবএক্স, ফেসবুক লাইভ, ইউটিউবের মতো বিভিন্ন সাইট ব্যবহার করে তাদের  শিক্ষা কাদের সঙ্গে ক্লাস করছে। কিন্তু শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে ডিভাইসের সামনে বসে ক্লাস করায় তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা। এ সকল সমস্যা দূর করার জন্য শিশুদেরকে বেশি বেশি সময় দিতে অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বেশি সময় অনলাইনে ক্লাস করার কারণে অনেক শিশুর পিঠ, কোমর, চোখ ও ঘাড়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। আর অধিকাংশ সময় জুমে ক্লাস করা নিয়েও বিরক্ত হচ্ছে শিশুরা। মাঝে মধ্যে শোনা যায়,‘ এ করোনা ভাইরাস লাইফটা শেষ করে দিলো। আর ভালো লাগে না এসব। কবে, কখন স্কুলে যাব ’--এ প্রশ্নই তাদের মনে। অভিভাবকরাও কিছু বলবেন তার উপায় কোথায়? কারণ প্রতি উত্তর তোমরা বাইরে যাও, চাকরি করো, কলিগদের সাথে দেখা হয়, গল্প করো...কিন্তু আমরা কোথায় যাবো?

একজন অভিভাবক হিসেবে আমারও জানার আগ্রহ--সত্যিই ওরা কোথায় যাবে, কী করবে? এই সরল প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে, একজন অভিভাবক হিসেবে কী করা উচিত? কোমলমতি এসব শিশুদের রক্ষা করার উপায় কী? আমার জানা নেই। নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাগুরুর সন্নিকটে শিক্ষা গ্রহণ, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ-- এসব থেকে বঞ্চিত তারা। কিন্তু আমাদের শিশুদের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। তারা  স্বপ্ন দেখে ও  স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মোটেও কল্পনার জগতে বাস করে না তারা। আমাদের শিশুরা বিভিন্ন ধরনের গল্পের বই পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়ার তালিকায় রয়েছে জনপ্রিয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক, কলাম লেখক, পদার্থবিদ, শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই। শিশুরা তাঁর লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে হতে চায় বিজ্ঞানী। তারা নাসার বিজ্ঞানী হতে চায়, হতে চায় জুনিয়র আইনস্টাইন। আজকালকার শিশুদের আলোচনার বিষয় সৌরজগত, ফুটবল (কোপা আমেরিকা, ইউরো কাপ) ও ক্রিকেট খেলা ইত্যাদি। অভিভাবকদের জন্য এটি স্বস্তির।
 
এতোকিছুর পরেও সন্তানদের ওপর ভীষণ রাগ করি। দীর্ঘ সময় ডিভাইস নিয়ে থাকার কুফল নিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলেই বেধে যায় লঙ্কাকাণ্ড (একটু আগেই লিখেছি ধারাবাহিকভাবে ডিভাইস ব্যবহারে কী কী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিশুরা)। দীর্ঘক্ষণ ল্যাপটপ, মোবাইল নিয়ে থাকার ফলে খিটখিটে মেজাজ, ধৈর্যের ঘাটতিসহ আচরণগত কিছু পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এছাড়া, প্রাত্যহিক জীবনেও এসেছে ভয়াবহ পরিবর্তন। নিয়মানুবর্তিতা ও শৃক্সখলার বিষয়টি তাদের মাথায়ই নেই। রাত জাগা ও দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে থাকা (ক্লাসের একটু আগে ওঠা) একটি শিশুর জন্য কতোটা ক্ষতিকর তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বোঝে।
    
সকাল ১০টা থেকে বেলা ১:০০টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে (১০ মিনিটের বিরতি কথা থাকলেও) ক্লাস চলে। জুমে ক্লাস করা, গাদাগাদা অ্যাসাইনমেন্ট--এসবের চক্রাকারে পড়ে তারা আজ বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে এটাই বাস্তব যে, জুমে ক্লাস অন করে শিশুরা শুয়ে-বসে সময় কাটায়। ক্লান্তি আর বিরক্ত। যা একটি পরিবারের জন্য বেদনাদায়ক ও কষ্টদায়ক। সন্তানের এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী? সংশ্লিষ্ট মহল এ বিষয়টি আরোও গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ ও নজরদারিতে আনবেন--একজন অভিভাবক হিসেবে এ আকুতি।
 
করোনা সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার দাবিকে অবান্তর বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, করোনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের কম না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা বিজ্ঞানসম্মত নয়। করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শ নেয়া হয়ে থাকে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সহমত পোষণ করে সবিনয়ে বলতে চাই , পড়াশোনা দরকার কিন্তু তার আগে প্রয়োজন সুস্থ স্বাভাবিক শিশুকে রক্ষা করা। এ সমস্ত প্রতিযোগিতায় দুরন্ত শিশুদের ধ্বংস করা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দর ভবিষ্যৎ। বিকলাঙ্গ ভবিষ্যৎ কারো কাম্য নয়। সুস্থ থাকুক শিশুরা, সুন্দর হোক আগামী।
 
লেখক, অ্যাসিস্ট্যান্ট  ডিরেক্টর ও প্রধান
কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ
প্রধান কার্যালয়, উদ্দীপন।
E-mail : shyamasarker@yahoo.com

 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত