কর্তৃপক্ষ দর্শকের ভূমিকায়
রাসায়নিকের প্রভাবে কাউনিয়ায় দেশীয় অর্ধশত প্রজাতির মাছ বিলীনের পথে
সারওয়ার আলম মুকুল
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫২ | আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:৩৪
মাছে ভাতে বাঙ্গালী, পুটি মাছের কাঙ্গালি, এসব কথা এখন শুধুই প্রবাদ। এক সময় দেশি প্রজাতির প্রচুর মাছ পাওয়া যেত রংপুরের কাউনিয়ার নদী-নালা-খাল-বিলে। বর্তমানে দেশীয় সেসব মাছ দেখা যায় না বিলীনের পথে। ভয়ঙ্কর চায়নাদুয়ারী জাল ও রাসায়নিকের দাপটে গত কয়েক দশকে দেশি প্রজাতির অনেক মাছই হারিয়ে যেতে বসেছে।
রংপুরের মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত কাউনিয়ায় তিস্তা, মানাস, বুড়াল নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে দেশীয় অর্ধশত প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব প্রায় বিলীনের পথে। এখন আর গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ নেই। জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা, ফসলের জমিতে ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের যথেচ্ছা ব্যবহার মৎস্য ভান্ডার খ্যাত কাউনিয়ায় অর্ধশত প্রজাতির মিঠাপানির দেশীয় মাছের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। সুস্বাদু দেশীয় মাছ এখন আর তেমন মিলছে না। জেলার শহর বন্দর গ্রামে গঞ্জে সর্বত্রই দেশীয় মাছের চরম সংকট। যদিও অল্প পরিমানে মিলছে তার অগ্নিমূল্য। মৎস্য ব্যবসায়ী ভোলারাম দাস জানান, দেশীও মাছ এখন তেমন পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা অগ্নীমূল্য। মৎসজীবী নরজিৎ জানান, জলাশয় গুলোতে এখন দেশী মাছ পাওয়া যায় না। জলাশয় গুলোতে মৎস্য খামরা ও রিং জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে মা মাছ সহ ডিম নষ্ট করে ফেলছে, ফলে দেশী মাছ মিলছে না। বিগত দিনে সরকারের উদাসিনতা, মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবসম্মত সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অভাব, প্রকাশ্য রিং জালের ব্যবহারের প্রতিকার না হওয়ায় দেশীয় মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। জন সচেতনতা তৈরিতে দায়িত্বশীলরা এগিয়ে আসছে না।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এ অঞ্চলে শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ছিল। মনুষ্যসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতায় অনেক প্রজাতির মাছ এখন চোখে পড়ে না। তাছাড়া নানা সময় নদী-খাল-বিল থেকে কারেন্ট জালের মাধ্যমে ব্যাপকহারে ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে দেশীয় মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কালের গর্ভে মাছে-ভাতে বাঙালির ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। রংপুর অঞ্চলে প্রায় শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে পুঁটি, দারকা, খলিশা, ভেদা, পয়া, গতা, বাইম, কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, শোল, টাকি, চেং, সরপুঁটি, পাবদা, চিংড়িসহ অর্ধশত প্রজাতির মিঠাপানির মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। এ সকল মাছ স্বাদে ও পুষ্টি গুনে ছিল ভরপুর।
স্থানীয় শতশত মৎস্যজীবী সারা বছর তারা মৎস শিকার করে নিজ পরিবারের চাহিদাপূরণ সহ জীবিকা নির্বাহ করত। শুষ্ক মৌসুমে খাল বিল হাওরের পানি কমে গেলে চলত মাছ ধরার উৎসব। কারেন্ট জালের ব্যাপকতায় খাল বিল নদীতে এ মাছের রেনু ধরা পড়ে মাছের প্রজনন চরম ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জালে ধরা পড়ে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার রেনু মাছ। পরিবেশ ও মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে মৎস্য প্রজাতি বিলুপ্তির কারণ হচ্ছে-অপরিকল্পিততভাবে জলাধারে বাধ দেয়ায় ভরা বর্ষা মৌসুমে ডিম ছাড়ার মা মাছ আসতে বাধা পায়। মাছের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়গুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার কারণে মাছের বংশ বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে পানি দূষণ জলাশয়ের গভীররা হ্রাস, কারেন্ট জালের ব্যবহারে দেশী মাছে ধ্বংস হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে মৎস্যজীবী তথা সর্বসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্য দপ্তরের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ও মৎস্য সংরক্ষণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করণের মাধ্যমেই সম্ভব।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত