স্বাদ আছে সাধ্য নেই, পাটশাক আলু ভর্তাই সম্বল

কাউনিয়ায় ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছে নিন্ম ও মধ্যবিত্তরা

  সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩৫ |  আপডেট  : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০০

অতিরিক্ত দামে ইলিশ এখন সাধারণ ও নি¤œ আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে, ফলে তারা শুধু দেখেই স্বাদ মেটাচ্ছেন। ভরা মৌসুমেও মাছের চড়া দাম। প্রতি কেজি ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকার বেশি এবং বাজারে সরবরাহ কম থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্ব ভোগীদের কারসাজিতে ইলিশ কেবলই স্মৃতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চাষ করতে হয় না, নেই উৎপাদন খরচও। তারপরও কয়েক বছর ধরে নাগালের বাইরে ইলিশের দাম। আর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ‘পহেলা বৈশাখ’ এলেই ব্যবসায়ের উপলক্ষ্য হয় এই মাছ। পান্তার সঙ্গে ইলিশ খেতে উচ্চবিত্তরা কিনলেও মধ্য ও নি¤œআয়ের মানুষের পাতে তোলা যেন বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিনে টেপামধুপুর হাটে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মনছুর আলী কে ইলিশের কথা জিগ্যেস করতেই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন, আগে কত বড় বড় ইলিশ মাছ উঠতো বাজারে, সেই মাছ এখন আর বাজারে দেখি না, খাইতেও পারি না। তিনি বলেন রূপালী ইলিশের সেই ঘ্রাণে আজও মনে পড়ে, খুঁজি আমার সোনালী শৈশব, দুরন্ত কৈশর। বয়সের ভারে দূর্বল হয়ে পড়লেও মনে পরে দুরন্ত কৈশরের কথা। আজ সব অতীত, অতীত হয়েছে ইলিশের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য। হাটে মাছ কিনতে আসা কাজিমুদ্দিন আক্ষেপ করে জানান, আমরা গরীব মানুষ, আমাদের ভাগ্যে ইলিশ নেই। এত দামের মাছ এগুলা এখন বৃত্তবান ও সৌখিন মানুষদের জন্য। গত বছর একটা জাটকা কিনেছিলাম, এই বছর এত দাম দিয়ে কিনতে পারবো কী না জানিনা। সিলভারকার্পই এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ইলিশ মাছ। বাংলা নববর্ষে বিত্তবান ও মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো ইলিশের চেহারা দেখলেও, নি¤œআয়ের মানুষদের কপালে জোটে। বর্তমানে জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু বিত্তবানদেরই মুখের খাবার। কাউনিয়ায় বৈশাখে স্বাদ আছে সাধ্য নেই, নি¤œআয়ের পরিবার গুলো দেখেই ইলিশের স্বাদ মেটায়। আগে নি¤œআয়ের মানুষ থেকে শুরু করে প্রায় সকলেই ইলিশ মাছ খেত। বর্তমানে ইলিশ মাছ খাওয়া তো দুরের কথা এর স্বাদেই ভুলে গেছে মানুষ। ইলিশ কিনতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত। কাউনিয়ার কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আলুর বাম্পার ফলন ফলিয়েছে, তার সন্তান যখন ইলিশ খেতে চায় তখন ৩০০ কেজি আলু বিক্রি করে কিনতে হবে ১ কেজি ইলিশ। ইলিশ শব্দটা বলতেই বাঙ্গালীর জিভে জল আসে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার জানান, জাতীয় মাছ ইলিশে রয়েছে প্রোটিন, উচ্চ মাত্রায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড, নায়সিন, ট্রিপ্টোফ্যান, ভিটামিন বি-১২, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম সহ অন্যান্য ভিাটামিন ও মিনারেলস। ডাঃ খন্দকার মমিনুল জানান, ইলিশ মাছ মানুষের হার্ট ভাল রাখে, হার্টের সুস্থতা বজায় রাখে। ইলিশ মাছে থাকা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে, চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, দৃষ্টিশক্তি কমে আসার সমস্যা দুর করে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, ইলিশ মাছ সামুদ্রিক মাছ হওয়ায় এতে সম্পৃক্ত চর্বি কম থাকে, যার কারনে মানুষের হার্ট ভাল থাকে। আয়োডিন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক ও পটাশিয়ামে ভরপুর ইলিশ মাছ। আয়োডিন থায়রয়েড প্ল্যান্ট সুস্থ রাখে, সেলেনিয়াম উৎসেচক ক্ষরনে সাহায্য করে যা ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে। ইলিশে থাকা খনিজ বিশেষ করে খনিজ দাতঁ এবং ক্যালসিয়াম হাড়ের পুষ্টির জন্য খুব প্রয়োজনীয়। ম্যাগনেসিয়াম ও লৌহ স্বাভাবিক শরীর বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য জরুরি। ইলিশে থাকা ভিটামিন এ রাতকানা রোগ দুর করতে সাহায্য করে, ভিটামিন ই শিশুদের রিকেট রোগ থেকে রক্ষা করে এবং ভিটামিন ডি খুব কম খাবারেই পাওয়া যায়। মাছ বিক্রেতারা শুশিল দাস বলেন, আড়তে মাছ নেই তাই দাম বেশি। দাম বাড়ার পেছনে কোনো সিন্ডিকেট আছে কিনা প্রশাসনের দেখা উচিত। ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ খেতে পারে না, এটা অন্যায়। নি¤œআয়ের পরিবারের মানুষরা শুধু ইলিশ মাছ দেখেই তাদের স্বাদ মেটায়। কেনার ক্ষমতা তাদের আর নেই। তাই  বৈশাখ তাদের পাটশাক আর সুটকি দিয়েই পার করতে হবে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত