শিক্ষায় অবদানের জন্য একুশে পদক ও লাঞ্ছিত নারী?

  অভিজিৎ বড়ুয়া অভি

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৪, ১৪:১২ |  আপডেট  : ১০ জুন ২০২৪, ১১:১২

আজ খুবই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, স্বাধীনতাকামী বাঙালির স্বপ্নপূরণের ‘অগ্নিঝরা মার্চ’ মাসে ৮ মার্চ নারী দিবসের দিনে ঘটে যাওয়া এক বেদনা দায়ক ঘটনায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার থেকে  শিক্ষায় একুশে পদক প্রাপ্ত একজন ব্যক্তির দ্বারা এক নারীকে “বেইশ‍্যা” বলে অবহিত এবং শাড়ি ধরে টানা-হেঁচড়া করে লাঞ্ছিত ও শারীরিক শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালানোর খবর সময় টিভি, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক আজাদী, দৈনিক পূর্বদেশ, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখে পড়ে, একজন নারীর পক্ষে একরাশ লজ্জা নিয়ে এই প্রবন্ধ লিখতে বসেছি।
 
৮ মার্চ চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় আয়োজনে, বৌদ্ধ জনসাধারণ বিহারে প্রবেশ করার সময় বাঁধা প্রদানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও কথা কাটাকাটি হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ, বাংলাদেশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি- মহিলা’র সভাপতি রেখা রানী বড়ুয়াকে, শিক্ষায় একুশে পদক প্রাপ্ত এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ডঃ জিনবোধি ভিক্ষু সকলের সামনে “বেইশ‍্যা, বেয়াদব, শয়তান” বলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অকথ্য গালিগালাজ করেন এবং এক পর্যায়ে তার শাড়ির আঁচল খুলে ফেলে তাঁকে শারীরিক শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালায়। এসময় পাশে থাকা তাঁর স্বামী, স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে স্ত্রীর হাতে থেকে হ্যান্ডপার্টস নিয়ে ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর মাথায় আঘাত করেন। ভিডিওতে এইও দেখা যায় ঐ মহিলার স্বামী উপস্থিত পুলিশ কর্মকতাদের তাৎক্ষণিক স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করার বিষয়ে অবহিত করছেন। পরে এই হ্যান্ডপার্টসটিকে একটি মহল ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুকে জুতা দিয়ে পিটিয়েছে প্রচার করে অন্যান্য বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শান্তিকামী বৌদ্ধ নরনারীর মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডা মুহূর্তে ডালপালা বিস্তার করে বিভিন্ন উত্তেজনা মূলক কর্মকান্ড শুরু হয়, এই সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে।
 
দুঃখজনক হলো আমাদের রাষ্ট্রে ধর্মীয় ব্যক্তিরা কোন নারীর প্রতি অন্যায় করলে সাথে সাথে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনে মহিলার চরিত্র হরণে সমাজ ব্যস্ত হয়ে উঠে। সেরকমই এই ক্ষেত্রেও ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর পক্ষে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রতিবাদ সভা করে, বৌদ্ধ ভিক্ষুর উপর আঘাতের বিষয়কে সামনে এনে নারীর লাঞ্ছিত করার বিষয়কে গৌণ করার জন্য একটি গ্রুপ ‍অপতৎপরতা শুরু করে। বৌদ্ধ বিহারে ঐ নারীর নামে পোষ্টার, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও তৈরী করে ঐ  লাঞ্ছিত নারীকে শতবার, বারেবার পুনঃ লাঞ্ছিত করা শুরু হয়। যদি ভিক্ষুকে অন্যায়ভাবে আঘাত করা হয়, তাহলে তাও তদন্তপূর্বক বিচার করা হোক। কিন্তু তা বলে, প্রকাশ্যে দিবালোকে নারীর শাড়ি ধরে টানা-হেঁচড়া করে লাঞ্ছিত ও শারীরিক শ্লীলতাহানির চেষ্টাকে গৌণ করার সুযোগ নেই। আর স্ত্রীর লাঞ্ছিত ও শারীরিক শ্লীলতাহানির চেষ্টা দেখে যেকোন স্বামীর প্রতিবাদ খুবই স্বাভাবিক।
 
ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর পক্ষে সাংবাদিক সম্মেলনে বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ঐ মহিলা ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর মোবাইল নিয়ে নিয়েছিলেন। আবার ঐ ভুক্তভোগী মহিলা পরেরদিন পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, নিজের শাড়ি ও সম্ভ্রম রক্ষার জন্য তিনি মোবাইলটি ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর হাত হতে নিয়ে পাশে উপস্থিত পুলিশ কর্মকতাকে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা ভিডিও পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, সেখানে পুলিশ প্রশাসনের অনেকে এবং মহিলা পুলিশও ছিলেন। তাহলে ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর মোবাইল নিয়ে নিলে উনি তা পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে পারতেন বা মহিলা পুলিশ দিয়ে ঐ মহিলার দেহ তল্লাশী করাতে পারতেন। কিন্তু তিনি কিছুই না করে ঐ মহিলার শরীরে হাত দেন এবং শাড়ি ধরে টানা-হেঁচড়া করতে থাকেন। নারী দিবসে নারীকে এর চেয়ে ভাল উপহার আর কিবা হতে পারে। তাছাড়ুও শিক্ষায় একুশে পদক প্রাপ্ত ব্যক্তি, একজন শিক্ষক ও ধর্মগুরু, তিনি যদি এতই অসহিষ্ণু হন, তাহলে একুশে পদকের সম্মান রক্ষাত্বে বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনার প্রয়োজন।
 
সাংবাদিক সম্মেলনে মহিলা অভিযোগ করেন, ডঃ জিনবোধি ভিক্ষু, তাকে “বেশ‍্যা, বেয়াদব, শয়তান” বলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অকথ্য গালিগালাজ করেন। যেখানে সরকার নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান দিচ্ছেন, নারীদের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, আমাদের গার্মেন্টস আজ নারীদের কারণেই বিশ্বে শীর্ষ স্থানে, তাছাড়াও আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা ও জয়িতা সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাই! আমরা নারীশক্তির ক্ষমতা, সাহস এবং সহনশীলতাকে কুর্নিশ জানাই, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের প্রশংসা করি।” মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন (রিমি) নারী দিবসে বলেছেন, নারী নেতৃত্ব বিকাশে সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সেখানে আমরা একুশে পদক সে ব্যক্তির হাতেই তুলে দিচ্ছি, যার দৃষ্টিতে নারী হীন, বেইশ্যা এবং যিনি নারীর শাড়ি নিয়ে টানা-হেঁচড়া করেন।    
 আবার উক্ত বিষয়ে ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা নারীর শারীরিক শ্লীলতাহানির চেষ্টা বিষয়ে প্রশ্ন করলে, উপস্থিত ব্যক্তিগণ উত্তর দেন এবং ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুকে আঘাত ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। জানা যায় উভয় পক্ষের মধ্যে বিহার কেন্দ্রিক দ্ধন্ধ রয়েছে। উক্ত বিষয়ে মহামান্য আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
 
আজ একরাশ লজ্জা নিয়ে জাতির কাছে জিজ্ঞাসা, একজন একুশে প্রদক প্রাপ্ত ব্যক্তি, একজন ধর্ম গুরু, একজন শিক্ষক কিভাবে একজন নারী ও মাতৃ জাতিকে বেইশ‍্যা বলে সম্বোধন করেন? আমাদের বাঙ্গালীদের অহংকার বঙ্গবন্ধু জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, যার কাছ থেকে ডঃ জিনবোধি ভিক্ষু একুশে পদক গ্রহণ করেছেন, আমাদের সংসদের নেতা একজন নারী, আমাদের বিরোধী দলের নেতা একজন নারী। যদি কেউ নারী জাতিকে অশ্রদ্ধা, অসম্মান, লাঞ্ছিত করেন, তার দৃষ্টিতে নারীরা যদি হয় বেইশ্যা, তাহলে তিনি কি একুশে প্রদক পাওয়ার যোগ্য? বুদ্ধ ধম্মে শাক্যমুনি শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধ তথাগত ভিক্ষুণী সংঘ করে নারীদের সম্মান দিয়েছেন, নগরবধু আম্রপালীকেও সম্মান দিয়ে সংঘে আশ্রয় দিয়ে সকল মাতৃজাতিকে সম্মান দিতে শিক্ষা দিয়েছেন। মাতৃভাষা দিবসে শিক্ষায় অবদানের জন্য যাকে একুশে পদক দেয়া হয়েছে, সেই মাতৃ উনার কাছে অসম্মানের। এই কি একজন একুশে প্রদক প্রাপ্ত ব্যক্তি, আচরণ? এতে কি একুশে প্রদকের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয় না?
 
উক্ত বিষয়টি তদন্তপূর্বক সুবিবেচনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সানুনয় অনুরোধ করছি। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক যারা পান তাদের আচার আচরণ বিবেচ্য। বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড.ইউনূসের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটন। নোবেল জয়ী ড. ইউনূসকেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রের আইনে সাজা পেতে হয়েছে।

 গণমাধ্যমের সংবাদ এবং ডঃ জিনবোধি ভিক্ষুর পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তাকে আঘাত ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগও তদন্ত পূর্বক দোষী ব্যক্তির শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি রেখা বড়ুয়া’র সহিত এমন ঘটনা খুবই অনভিপ্রেত। একজন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার থেকে শিক্ষায় একুশে পদক প্রাপ্ত ব্যক্তির এমন অসহিষ্ণু আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। একুশে পদক প্রাপ্ত গুণী ব্যক্তির আচরণ আরো সংযত , নিয়ন্ত্রিত, পরিমিত, শান্ত, বিনীত, হওয়া বাঞ্ছনীয়। একুশে পদক পাওয়া ব্যক্তি প্রকাশ্য দিবালোকে নারীর শাড়ি ধরে টানা-হেঁচড়া করবেন, নারীকে বেইশ্যা বলবেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাতে একুশে প্রদকের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়। সুতরাং তদন্ত করে ডঃ জিনবোধি ভিক্ষু দোষী প্রমাণিত হলে তার একুশে পদক পুনঃ বিবেচনার দাবী রাখে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা ঐ নারীকে হেয় করে বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও তৈরী করে ঐ  লাঞ্ছিত নারীকে শতবার, বারেবার পুনঃ লাঞ্ছিত করছে, তাদের বিষয়ে দ্রুত ডিজিটেল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নেয়ার দাব করছি।
 
কারণ তারা ধর্মীয় বিষয়কে সামনে এনে ঐ নারীকে সামাজিকভাবে বর্জন করার ডাক দিয়ে লাঞ্ছিত করছে, নারীর পরিবারকে সামাজিকভাবে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।  

লেখকঃ অভিজিৎ বড়ুয়া অভি কথা সাহিত্যিক, কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। 
 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত