সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্কে অনিশ্চিত মধু আহরণ
হেদায়েত হোসাইন, বাগেরহাট থেকে
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫১ | আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০০
সুন্দরবনে ১ এপ্রিল থেকে ২ মাসব্যপী মধু আহরণ মৌসুম শুরু হলেও বনদস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে যাচ্ছেনা মৌচাষীরা। সুন্দরবনে পেশাদার মৌয়ালের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০জন। অপহরণ আতঙ্কের মধ্যে গত ১৭ দিনে বনে মধু সংগ্রহ করতে গেছে ৪২টি নৌকায় মাত্র ২৭৬জন মৌয়াল। বনদস্যু বাহিনী অগ্রিম চাঁদা দাবি করায় অসংখ্য মৌয়াল বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও মধু সংগ্রহে যেতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে জীবন ও সম্পদ হারানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না অধিকাংশ মৌয়লরা। তাই চলতি মৌসুমে অনিশ্চত হয়ে পড়েছে সুন্দরবন থেকে প্রাকৃতিক মধু ও মোম আহরণের লক্ষমাত্র অর্জন। লক্ষমাত্রা অর্জিত না হওয়ার নির্ধারিত রাজস্ব আদায় নিয়েও বাড়ছে বন বিভাগের উদ্বেগ। মৌয়ালরা জানান, বর্তমানে বনদস্যু করিম-শরিফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী ও জোনাব বাহিনী নামে ৭টি বনদস্যু বাহিনী বর্তমানে সুন্দরবনে তৎপর রয়েছে। তাদের সাথে সমঝোতা ছাড়া সুন্দরবনে নিরাপদে মধু আহরণ করা অসম্ভব। এক একটি দস্যু বাহিনী মৌয়ালদের নৌকা প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করেছে। দস্যূদের নির্ধারিত চাঁদা না দিলে মৌয়ালদের অপহরণ, নির্যাতনসহ প্রাণ নাশের ঝুঁকি থাকায় মধু আহরণে সুন্দবনে যেতে ভয় পাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৌয়ালরা জানায়, প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে তারা মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে গেলেও এবার বনদস্যু বাহিনীগুলোর ভয়ে এখনও যেতে পারেননি। বনদস্যুদের টাকা দিয়ে কিছু মৌয়াল মধু আহরণ করতে বনে গেছে। কোস্টগার্ডসহ অন্যন্য বাহিনীর চলমাল অভিযানে সুন্দরবনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই অধিকাংশ মৌয়ালরা জীবিকার তাগিদে মদু আহরনে বনে যাওয়ার কথা বলেছেন। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মো, খলিলুর রহমান জানান, বর্তমানে বনদস্যু আতঙ্কে মধু আহরণে মৌয়ালদের আগ্রহ কমেছে। এই স্টেশন থেকে গত বছর মৌসুমের প্রথম দিনেই মধু আহরণের জন্য ২৯টি নৌকা নিয়ে ২০৩জন সুন্দরবনে গেলেও এবার মৌসুমের প্রথম ১৭ দিনে মাত্র ১১টি নৌকায় ৭৫ জন মৌয়াল সুন্দরবনে গেছেন। এই অবস্থায় এবার পুরো মৌসুমে শরণখোলা রেঞ্জ থেকে মধু আহরণের লক্ষামাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে প্রথম ১৭ দিনে মাত্র ৩১টি নৌকায় ২০১জন মৌয়াল মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে গেছেন। এরমধ্যে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর চাঁদা দাবি করায় প্রাণভয়ে ৬টি নৌকার মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ না করেই লোকালয়ে ফিরে গেছে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, এবছর সুন্দরবনের মৌমাছির চাক থেকে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু ও ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ৩০০ কুইন্টাল মোম আহরণের। আর পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম। গত বছর পুরো মৌসুমে এই বিভাগ থেকে ২০০টি পাস নিয়ে ১৩০০ জন মৌয়াল ৬৫০ কুইন্টাল মধু ও ২০০ কুইন্টাল মোম আহরণ করে। সেখানে এবার এখন পর্যন্ত সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ৪২টি নৌকায় ২৭৬ জন মৌয়াল মধু আহরণে গেছেন। সুন্দরবনে তৎপর ৭টি বনদস্যু বাহিনীর অপহরন আতংঙ্কের কারনে ঝুঁকি এড়াতে মৌয়ালদের দলবদ্ধভাবে মধু সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ভোলা নদী সংলগ্ন অগ্নিকাÐ প্রবন ২৪, ২৫ ও ২৬ নম্বর কমপার্টমেন্ট এলাকার বনে মধু আহরণ না করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মৌয়ালদের। মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বন বিভাগের টহল জোরদার করা হলেও এবার সুবনদস্যু বাহিনীর অপহরন আতংঙ্কের মধ্যে মধু ও মোম আহরণের লক্ষমাত্রা অর্জন না হবার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত