পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী সার্জেন্টের গুরুতর অভিযোগ : ভ্রূণ হত্যা ও ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের দাবি
রাজশাহী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:২৩ | আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:২১
রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) কর্মরত এক নারী সার্জেন্টের ওপর তাঁরই স্বামী, যিনি নিজেও একজন পুলিশ পরিদর্শক, অমানবিক নির্যাতন ও প্রতারণা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী নারী সার্জেন্ট মোসাঃ সাবিহা আক্তার তাঁর স্বামী নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক মোঃ মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ভ্রূণ হত্যা, একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং আর্থিক প্রতারণার ফিরিস্তি তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া সাবিহা আক্তারের সঙ্গে ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি মাহবুব আলমের বিয়ে হয়।
সাবিহা অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় মাহবুব তাঁর আগের বৈবাহিক অবস্থা এবং একটি পালিত কন্যা থাকার তথ্য গোপন করেছিলেন। এমনকি পূর্বের স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে মাহবুব যে তথ্য দিয়েছিলেন, তা-ও ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতারণামূলক। বিয়ের পর থেকেই মাহবুব ওই পালিত কন্যার দোহাই দিয়ে সাবিহাকে স্ত্রীর অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে শুরু করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবিহার দাবি, তিনি নিজের বেতনের টাকায় সংসার চালালেও মাহবুব সারাক্ষণ ওই পালিত কন্যার পরামর্শে চলতেন। পাশাপাশি মাহবুব অসংখ্য নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন, যার প্রমাণ সাবিহা তাঁর স্বামীর ল্যাপটপ থেকে সংগ্রহ করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই সাবিহার ওপর চলত অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এমনকি নওগাঁয় কর্মরত থাকাকালীন এক টিকটকারের সঙ্গে মাহবুবের পরকীয়ার ছবি ২০২৪ সালের এপ্রিলে ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
সাবিহার দাবি, তাঁর অনুমতি ছাড়াই মাহবুব পুনরায় বিয়ে করেছেন অথবা অবৈধভাবে অন্য নারীর সঙ্গে বসবাস করছেন।
অভিযোগের সবচেয়ে লোমহর্ষক বিষয়টি হলো জোরপূর্বক গর্ভপাত। সাবিহা জানান, ২০২০ সালে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে মাহবুব ও তাঁর পালিত কন্যা সন্তানটি নষ্ট করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এতে রাজি না হওয়ায় সাবিহার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে ওই বছরের ৩০ জুলাই রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে তাঁর চার মাসের ভ্রূণ হত্যা করা হয়। বর্তমানে তাঁদের ১৯ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান থাকলেও মাহবুব তার কোনো দায়িত্ব পালন করেন না বলে সাবিহা জানান।
কেবল শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনই নয়, সাবিহা বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণারও শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সমস্যার কথা বলে মাহবুব বিভিন্ন সময়ে সাবিহার এনআরবিসি ব্যাংকের এফডিআর এবং আইএফআইসি ব্যাংকের লোন মিলিয়ে মোট ২০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মাহবুব আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, "অভিযোগ অনুযায়ী ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও এটি পারিবারিক বিষয়, তবুও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।"
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত মাহবুব আলম বর্তমানে রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জে বদলির অপেক্ষায় রয়েছেন। বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
ভুক্তভোগী নারী সার্জেন্ট আরও বলেন, "আমি পুলিশের সার্জেন্ট হিসেবে মানুষের সেবা করলেও নিজের ঘরেই বছরের পর বছর নিগৃহীত হয়েছি। মাহবুব আমার জীবন বিষিয়ে তুলেছেন। আমি এই অমানবিক নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার চাই।"
রাজশাহীর এই ঘটনাটি পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নারী সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ন্যায়বিচারের আশায় এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী সাবিহা।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত