জ্বালানি সংকট: ঘাটে বসে আছে শত শত ট্রলার-জাহাজ

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৯ |  আপডেট  : ৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:০৬

ফাইল ছবি

এবার ডিজেল সংকটে পড়েছে সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়োজিত ফিশিং ট্রলার ও পণ্য পরিবহনে যুক্ত লাইটার জাহাজগুলো। ডিজেল সরবরাহ কমানোর প্রভাবে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানালেন চালকরা। নিরুপায় হয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে অলস বসে আছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার ও লাইটার জাহাজ। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চট্টগ্রামের ফিসারি ঘাটেও প্রভাব পড়েছে। গত ছয় দিন ধরে ঘাটে আসছে না আগের মতো মাছ। বাজারেও মাছের দরে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ আগের মতো মাছ না আসায় যা আসছে তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বেসরকারি ডিপোতেও এর প্রভাব পড়ার কথা জানিয়েছেন ডিপো পরিচালনাকারীরা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দাবি, সাগরে মাছ ধরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলছেন জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকরা। তাদের দাবি, হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে বসে আছে। নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা কমেছে অন্তত ৭০ ভাগ।

লাইটার জাহাজের মালিকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রামের ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না লাইটার জাহাজের মালিকরা। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা থেকে খুব কম পরিমাণে তেল পাচ্ছেন, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এটি দিয়ে চলা যায় না। জ্বালানির এই সংকট নিরসন চেয়ে লাইটার জাহাজ মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে দুই দফায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বরাবরে চিঠি দিলেও কোনও সমাধান মেলেনি। ফলে ঘাটে আটকা জাহাজ।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হয়। এরপর নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়।  

জাহাজ মালিকদের সংগঠনের দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে পণ্য খালাস করে দেশের ৫০টি অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন করে থাকে লাইটার জাহাজগুলো। এসব জাহাজের জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। বেশিরভাগ লাইটার জাহাজের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল [বিডব্লিউটিসিসি]। বিডব্লিউটিসিসির নিবন্ধিত লাইটার জাহাজের সংখ্যা ১ হাজার ২০০টি হলেও ১ হাজার ৫০টির মতো জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। এর বাইরে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন আড়াইশর বেশি লাইটার জাহাজ চলছে।

বিডব্লিউটিসিসির হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং হয়। সেগুলো বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে যাওয়া এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে গড়ে আড়াই লাখ লিটার ডিজেল দরকার হয়। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে মেরিন ডিলারদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় ডিজেল সংকটে নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। যার সমাধান এখন পর্যন্ত মেলেনি।

জ্বালানি সংকটের সমাধান চেয়ে গত সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে চিঠি দেন লাইটার জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের [বিডব্লিউটিসিসি] আহ্বায়ক সফিক আহমেদ। চিঠিতে বলা হয়, ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সংকটে লাইটার জাহাজগুলো মাদার ভেসেল [বড় জাহাজ] থেকে নিয়মিত মালামাল লোডিংয়ে যেতে পারছে না। এমনকি পণ্যবোঝাই করে খালাসের উদ্দেশ্যে যেতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে বন্দরে আসা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে লাইটার জাহাজগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা দরকার। এজন্য সরবরাহকারী সংস্থার অধীন মেরিন ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী তেল প্রদানের অনুরোধ করছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সফিক আহমেদ রবিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘লাইটার জাহাজে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। পর্যাপ্ত তেল মিলছে না ডিপোগুলো থেকে। তেল সমস্যার সমাধান চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে দুই দফায় চিঠি দিয়েছি। তার আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু কোনও সমাধান মিলছে না।’

তিনি বলেন, সড়কপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় প্রতি টন পণ্য পরিবহনে খরচ হয় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। লাইটার জাহাজে প্রতি টন পণ্যে খরচ পড়ে সাড়ে ৫০০ টাকা। সবচেয়ে কম টাকায় পণ্য পরিবহন করা গেলেও নৌপথকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বেশিরভাগ লাইটার জাহাজ ঘাটে বসে আছে।

একই অবস্থা বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে। চট্টগ্রামের ২১টি ডিপোয় রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনা হয়। এরপর কনটেইনারে ভরে বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। আবার কনটেইনারে আমদানি পণ্যও বন্দর থেকে এনে ডিপো থেকে খালাস দেওয়া হয়। এসব কাজের জন্য এক হাজার কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি এবং ২৫০ যন্ত্রপাতি রয়েছে, যেগুলোর জন্য দরকার ডিজেল।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের কথা জানান। চিঠিতে বলা হয়, ডিপোগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দিনে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড - এই তিনটি কোম্পানি ডিপোগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে ডিপোগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ছে।

জ্বালানি সংকটে ভুগছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার। ফিশিং ট্রলারের মালিক নুরুল আমিন বলেন, ছোট ট্রলার ১৮শ থেকে ২ হাজার লিটার, বড়গুলো সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার তেল নিয়ে সাগরে যায়। এখন এই পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনেক মালিক সাগরে ট্রলার পাঠাচ্ছেন না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন। আগে যেখানে ১৪-১৫ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত থাকতে হতো বর্তমানে সেখানে ৮-৯ দিন কিংবা আরও কম সময়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। এতো কম সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাছও পাওয়া যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দফতরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী বলেন, সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে দুই ধরনের ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে একটি ছোট আকারের কাঠের ট্রলার এবং অপরটি বাণিজ্যিক জাহাজ। ছোট ট্রলারগুলো ৪০ মিটার গভীরতার মধ্যে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকে। দেশে এই ধরনের ট্রলারের সংখ্যা ২৯ হাজার। বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো ৪০ মিটারের দূরে গভীর সাগরে গিয়ে মাছ ধরে। এই ধরনের বাণিজ্যিক ট্রলারের সংখ্য ২৬৮টি। তবে নিয়মিত মাছ ধরছে এ ধরনের বাণিজ্যিক ট্রলারের সংখ্যা ২৩৪টি। কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক আমাদের মৌখিকভাবে বলেছেন মাছ ধরার জন্য সাগরে যাওয়ার যে পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন, তা তারা পাচ্ছেন না। তবে মৌখিকভাবে অবহিত করলেও কেউ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে বলেননি।

তবে একাধিক জেলে ও ট্রলার মালিক জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে নদীতে মাছ আহরণ অনেকাংশ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় মৎস্য বন্দর ও মোকামগুলোতে। অনেক জায়গায় কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ফলে শুধু জেলে নয়; আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে।

এই সংকটের মধ্যেই সামনে আসছে আরেক বড় চাপ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। এর লক্ষ্য মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করা। জেলেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ। তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা; সব মিলিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, বাঁশখালী এবং সীতাকুণ্ডের খবর নিয়ে জেনেছি সাগরে মাছ ধরা ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে এই পরিমান জেলে মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি তারা।

তিনি আরও বলেন, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা ৫৮ দিনের জন্য বন্ধ হচ্ছে। এ কারণে আমরা ফুয়েল সংকটের বিষয়টিকে আর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না। মাছ ধরা বন্ধের সময়ে ট্রলারগুলোতে যাতে জ্বালানি সরবরাহ না করে, সেজন্য ফিলিং স্টেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

কা/আ 

সৌজন্যেঃ বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত