জামালপুর সদরের নান্দিনা-লক্ষীরচর সেতুর ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও স্থাপনা সরাচ্ছেনা ভুমি মালিকরা
ছাইদুর রহমান, জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১৯:১৩ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ২১:০৮
ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার পরেও স্থাপনা সরিয়ে না নেয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদের উপর নান্দিনা-লক্ষীরচর সেতুর নির্মাণ কাজ। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের (নান্দিনা বাজার অংশে) গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পিলারের কাজ শুরু করতে না পারায় সেতু নির্মাণ কাজ আরো পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে করে নদীর দুইপাড়ের লক্ষাধিক মানুষের চলাচলে ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না ।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের কারণে জামালপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের লক্ষীরচর ও তুলশীরচর ইউনিয়নের সাথে দেশ স্বাধীনের পর থেকেই নান্দিনা ও উপজেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এসব অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিতে ভরসা একমাত্র নৌকা। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার জন্য পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জামালপুরের নান্দিনা-লক্ষীরচর সড়কে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ৬০৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০মিটার প্রস্তের একটি পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) । সেতু নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয় ১০৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সেতুর দুই প্রান্তের ৩ একর ৬০ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণে ব্যায় ধরা হয় ২৫ কোটি ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পায় জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ চৌধুরীর মালিকাধীন মেসার্স চৌধুরী এন্টার প্রাইজ। গত ২০২২সনের ১৬ নভেম্বর সেতু নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর সেতুর কাজ সম্পন্ন করে জনগনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতুটির কাজ অর্ধেকও শেষ না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৮ জুন করা হয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গড়িমসির কারণে কাজে গতি আসেনি। ফলে কাজ পিছিয়ে পড়ে। ২৪ এর ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের কারণে ঠিকাদার পালিয়ে যায়। ফলে দীর্ঘ ৭-৮ মাস কাজ বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে কাজ শুরু হলেও চলছে ডিমেতালে। এর মধ্যেই দেখা দিয়েছে আরেক বিপত্তি। সেতুর উভয় প্রান্তে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকাও পরিশোধ করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের নান্দিনা বাজার অংশে প্রকল্প স্থান থেকে অনেকেই স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছে না। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পিলারের কাজ শুরু করা যাচ্ছেনা। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই অন্তত একটি পিলারের কাজ শেষ করতে না পারলে সেতুর কাজ আরও এক বছর পিছিয়ে যাবে।
এলজিইডি সূত্র জানায়, সেতুর মোট স্পেন ধরা হয়েছে ১৫টি। তার মধ্যে ৯টির কাজ শেষ হয়েছে, অ্যাবটমেন্টসহ মোট পিলারের সংখ্যা ১৬টি, এ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে ১৩টি। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের ৩টি পিলার ও সেতুর মাঝখানে ১০০ মিটারের একটি স্টিল গার্ডারের কাজ এখনও শুরুই করা হয়নি। সেতুর দুই প্রান্তের ৬০০ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে উত্তর প্রান্তের সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ চলছে। আর দক্ষিণ প্রান্তের সড়কের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। দক্ষিণ প্রান্তে নান্দিনা বাজার থেকে সেতুতে উঠানামার জন্য গোল চত্বরের কাজেও হাত দেয়া হয়নি। সূত্র মতে এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৫ ভাগ। আর ঠিকাদারকে বিল দেয়া হয়েছে ৪৬ কোটি ১৫ লাখ। রোববার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে নান্দিনা বাজারের অনেক ভূমি ও স্থাপনার মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেনা। সেতুর নকশার স্থানে এখনও ২০টি স্থাপনা, বহুতল ভবন, মার্কেট, বসত বাড়ি, দোকানপাট রয়েছে।
স্থানীয় ভুমি ও বহুতল ভবনের মালিক লোকমান হোসেন হিরা জানান, নান্দিনা বাজার অংশে নদের পাড়ে আমার বহুতল পাকাভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে সব স্থাপনা ভেঙ্গে সরিয়ে নিয়েছেন। তার ভাষ্য, অনেকেই স্থাপনা সরিয়ে নিতে বিলম্ব করছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির কাজে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নান্দিনা বাজার অংশে সেতুর গুরুত্বপূর্ণ একটি পিলারের স্থানে রোকেয়া বেগম নামে একজনের স্থাপনা রয়ে গেছে। তিনি তার দাবিকৃত ক্ষতি পূরণের সমুদয় টাকা পেয়েও স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেননা। তাছাড়া আরো দু’টি পিলার ও গোল চত্বরের জায়গাতেও রয়েছে দোকান পাট ও স্থাপনা। ফলে সেতুর গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পিলারসহ অন্যান্য কাজ করা যাচ্ছেনা। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও ভূমি ও স্থাপনা ভেঙ্গে না দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে রয়েছেন জেলা সদরের পূর্বাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। এ ব্যাপারে জনস্বার্থে তিনি জেলা প্রশাসন ও এলজিইডি’র উর্ধতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
স্থানীয়রা বলেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদী পানিতে ভরে টইটুম্বুর হয়ে যাবে। আর এতে পানির উপর পিলারের কাজ সম্ভব হবেনা। পিলারের কাজ শেষ করতে না পারলে সেতুর নির্মাণ কাজ আরো অন্তত এক বছর পিছিয়ে যাবে। ফলে এ অঞ্চলের লাখ মানুষের ভোগান্তি রয়েই যাবে। এ ব্যপারে জামালপুর এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহাম্মেদ বলেন, সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয় ভূমি মালিকরা টাকা নিয়েও তাদের স্থাপনা সরিয়ে না নেয়ায় কাজে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থাপনা সরিয়ে নিতে তাদেরকে একাধিকবার নোটিশ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ ইউসুপ আলীর সরকারি মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও জমি ছেড়ে না দেয়ার ব্যাপারে জেলা প্রশাসন থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাষক (রাজস্ব) সুমি আক্তার বলেন, সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে এলজিইডিকে জমির দখল বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত