দেওয়ানগঞ্জে ভাসমান সেতু ভেঙ্গে ভাই-বোনসহ ৫ জন নিহত
ছাইদুর রহমান, জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬, ১২:৫২ | আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৫:২৩
জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ভাসমান সেতুতে ঈদে ঘুরতে আসা মানুষের প্রচন্ড চাপে সেতু উল্টে পানিতে ডুবে সহোদর ভাই-বোনসহ ৫ জন মারা গেছে। শনিবার (২১ মার্চ) বিকালে দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার সামনে এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ঝালুরচর এলাকার সহোদর ভাই-বোন শের আলীর মেয়ে খাদিজা (১২) ও ছেলে আব্দুল মোতালেব (৬), অপর সহোদর ভাই-বোন ডাকাতিয়াপাড়া এলাকার জয়নাল মিয়ার ছেলে নিহাদ (১৩) ও মেয়ে মায়ামনি (১০) এবং বেলতৈল এলাকার হাবিবুল্লাহর ছেলে আবির (১৪)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার সামনে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান ড্রাম সেতু দিয়ে অপর প্রান্তের চরে যাতায়াত ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে পৌর কতৃপক্ষ। ঈদের দিন হওয়ায় ঘুরতে আসা মানুষের প্রচন্ড ভিড় জমে ভাসমান সেতুর উপর। বিকালে মানুষের প্রচন্ড চাপে ভাসমান সেতুটি উল্টে মাঝখান ভেঙে মানুষজন পানিতে পড়ে যায়। এ সময় বেশিভাগ মানুষ সাঁতরে পাড়ে উঠে আসতে পারলেও বেশ কয়েকজন শিশু পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে উদ্ধার করে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক খাদিজা, আব্দুল মোতালেব, নিহাদ, মায়ামনি ও আবিরকে মৃত ঘোষণা করেন।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবীব জানান, একে একে ৬ শিশুকে হাসপাতালে আনা হলে ৫ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত শিশু শান্তিকে (১৫) চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার সাথে সাথে দেওয়ানগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজ শুরু করে। পরে জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী এসে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। এরপর ময়মনসিংহ থেকে ডুবুরীরা ঘটনাস্থলে আসে। মোট ৫ ঘন্টা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। আর কেউ নিখোজ না থাকায় রাতে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হয়।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন জানান, নিহতদের পরিবারকে সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রত্যেক পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা করার ঘোষণা দিয়েছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে পুলিশ সুপার মোছাঃ ফারহানা ইয়াসমীন বলেন, ভাসমান সেতুতে সবসময় লোকসমাগম হয়, ঈদের কারণে আরও বেশী লোকসমাগম হওয়ায় এবং গতরাতে ঝড়ে ভাসমান সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেতুটি ভেঙে যায়। এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা। তবে অবকাঠামোগত কোন ত্রুটি ছিল কিনা তা হয়ত পৌরসভা বা জেলা প্রশাসন খতিয়ে দেখবে। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জামালপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
এলাকাবাসী জানায়, দেওয়ানগঞ্জ থানা মোড় সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত এই ভাসমান ড্রাম সেতুটি দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে সেতুটি কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তবুও বিকল্প পথ না থাকায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু দিয়ে পারাপার হচ্ছিলেন দুই পারের শত শত মানুষ। তাছাড়া ঈদের দিন এই সেতুতে অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছর বছর আগে প্রয়াত পৌর মেয়র মরহুম শাহ নেওয়াজ শাহানশাহ এই ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে পৌরসভা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ মোহাম্মদ নুরুন্নবী অপু সেতুটির লোহার অংশ দিয়ে মেরামত করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেতুটি সংস্কার কিংবা মেরামতের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কেউ। সেতুর বেশ কয়েকটি অংশে কাঠ ও বাঁশ ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। কোথাও দড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল, আবার কোথাও লোহার পাটাতন ভেঙে পড়েছিল। এ অবস্থায় অনেক আগে থেকেই সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। মানুষের অতিরিক্ত ভারে আজ সেতুর একটি অংশ ভেঙ্গে গিয়ে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত