একটিতে বিদ্রোহীদের জয়ের সম্ভাবনা
চিতোর অব বেঙ্গল খ্যাত মাদারীপুরের ৩টি আসনের ২টিতে বিএনপি
শফিক স্বপন, মাদারীপুর
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:১২ | আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৩
“খেজুর রস-খেজুর গুড়, দক্ষিনের দ্বার মাদারীপুর”। পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, ময়নাকাটা, পালরদী ও মধুমতি নদীর পলি বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রূপ-লাবণ্যে পরিপূর্ণ এক উর্বর ভূমি এক সময় এই জনপদটি পরিচিত ছিলো ‘চিতোর অব বেঙ্গল’ নামে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পরপরই মাদারীপুরের ৩টি আসনের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা,চায়ের দোকান কিংবা হাট-বাজরে সর্বত্রই নির্বাচনের আমেজ দেখা যাচ্ছে।পথসভা, গণসংযোগে, মাইকিং এ ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি, জামাতসহ ১১ দলীয় জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঝুলছে প্রার্থীদের বিলবোর্ড, পোস্টার, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি, ছুটছেন ভোটাদের দ্বারে দ্বারে। মাদারীপুরের ৩টি আসনে মোট প্রার্থী রয়েছে ২৫ জন। প্রচার প্রচারনায় এগিয়ে বিএনপি থাকলেও জামায়াতে ইসলামী প্রচারে কৌশল অবলম্বন করছেন। কে লড়ছেন কার সাথে শিবচর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে মাদারীপুর-১ আসন গঠিত। বরাবরই এই আসন একটি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এবং আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দূর্গে হানা দিতে মরিয়া বিএনপিসহ অন্যান্য দল। তবে এ আসন বিএনপি’র হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা এ আসনে বিএনপি’র মনোনয়নে ব্যাপক নাটকয়িতা দেখা গেছে। এ আসনে প্রধমে শিবচর উপজেলা বিএএনপি’র সদস্য কামাল জামান এর মনোনয়ন ঘোষণা করেও পরবর্তীতে মনোনয়ন স্থগিত করে আন্দোলন অবরোধের পর মনোনয়ন নিশ্চিত করেন শিবচর বিএনপির দীর্ঘদিনের সভাপতি নাজমুল হুদা মিঠু চৌধুরীর স্ত্রী নাদিরা আক্তার। তিনি বলেন; আমার
পরিবার শহীদ জিয়ার সময় থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে নিবেদিত। আমার শ্বশুর শামসুল হুদা চৌধুরী ও চাচা শ্বশুর এই আসন থেকে ধানের শীষে নির্বাচন করেছেন। দলের দুঃসময়ে আমরা হাল ছাড়িনি। দল আমার পারিবারিক ঐতিহ্য ও ত্যাগ বিবেচনা করেই মনোনয়ন দিয়েছে। অপরদিকে বিএনপি’র সদ্য বহিস্কৃত যুগ্ম আহবায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করছেন। তিনি তার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেন; আমার বয়স এখন ৭০ বছর। জীবনের পুরোটা সময় বিএনপির জন্য বিলিয়ে দিয়েছি। এবারই আমার শেষ নির্বাচন। দল আমার বয়স বা ত্যাগ কোনোটিই বিবেচনায় নেয়নি। শিবচরের আমার একটি বিশাল ভোট ব্যাংক আছে। তাই কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। জীবনের শেষ সময়টুকু আমি জনগণের সেবায় কাটিয়ে দিতে চাই।
এদিকে শিবচর উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক কমিটির সদ্য বহিস্কৃত সদস্য কামাল জামান মোল্লা জাহাজ প্রতীক নিয়ে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ে শতভাগ এগিয়ে । তিনি বলেন; আমি দলের ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতা। কিছু কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে আমার মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছে। আমি তারেক রহমানের ঘোষণায় বিশ্বাসী যে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা
হবে। আমি জেল-জুলুম সহ্য করে দল গুছিয়েছি। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাহাজ মার্কায় বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে মাদারীপুর-১ আসনটি দলকেই উপহার দেব। মাদারীপুর সদর উপজেলার ১টি পৌরসভা, ১০টি ইউনিয়ন এবং রাজৈর উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে মাদারীপুর -২আসন গঠিত। এ আসনের মাঠে সরব বিএনপি,জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় ঐক্যজোট খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ আসনে বিএনপি, জামায়াতের ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা নেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে সার্বক্ষণিক সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং থেকে শুরু করে প্রতিটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগ দিচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাদারীপুর-২ আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়াা। দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এ আসনের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে না থাকায় দলটির বিশাল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। স্থানীয় ভোটারদের মতে, আওয়ামীলীগ সমর্থকদের নীরব সমর্থন যে প্রার্থীর ঝুড়িতে পড়বে, তিনিই পরবেন জয়ের মালা। এ আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া। তবে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিএনপি থেকে সদ্য বহিস্কৃত নেতা মিল্টন বৈদ্য। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রিকশা প্রতীকে লড়ছেন বাংলাদেশ
খেলাফত মজলিসের মাওলানা আব্দুস ছোবাহান খান।
বিএনপি’র প্রার্থী ধানেরশীষ প্রতীকের জাহান্দার আলী মিয়া বলেন; তারেক রহমান ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন করেছেন। আমি বিজয়ী হয়ে উনার আস্থার প্রতিফলন ঘটাবো। মাদারীপুর জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য সদ্য বহিস্কৃত মিল্টন বৈদ্য ইতিপূর্বে দুইবার নির্বাচন করলেও জয়ের মুখ দেখেননি। এবার দলীয় প্রতীক না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে
মাঠে নেমেছেন। বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করায় স্থানীয় কর্মীদের সাথে তার একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড়অংশ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনী মাঠে প্রভাব বিস্তারে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। মাওলানা আব্দুস ছোবাহান খান (১১ দলীয় জোট) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এ কেন্দ্রীয় নেতা মূলত পেশায় ব্যবসায়ী এবং সপরিবারে ঢাকায় থাকেন। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিতি কম থাকায় তাকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে আগ্রহ সীমিত। তবে জোটের ভোটব্যাংক নিয়ে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন,বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়ার সাথেই আমার মূল প্রতিদ্বন্দিতা হবে বলে মনে করি। মাদারীপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর একক অবস্থান খুব শক্তিশালী না হলেও
তাদের একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। জোটগত কারণে তারা একক প্রার্থী দেয়নি। অন্যদিকে, আওয়ামীলীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ভোট টানতে প্রার্থীরা পর্দার আড়ালে নানা কৌশলী প্রচার চালাচ্ছেন। অনেক পরিচিত আওয়ামীলীগের মুখকেও প্রার্থীদের পক্ষে নীরব বা সরব কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তৃণমূলের সাথে সম্পৃক্ততা স্থানীয় ইমেজ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগের বিবেচনায় এখন পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া মাদারীপুর-২ আসনে জয়ের পথে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন।
কালকিনি ও ডাসার উপজেলা এবং কালকিনি পৌরসভাসহ মাদারীপুরের ৫ ইউনিয়ন নিয়ে মাদারীপুর-৩ আসন গঠিত। এ আসন বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার পতনের পর বর্তমানে রাজনৈতিক ময়দানে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় বিএনপিকে এখন সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ আসনে বিএনপি’র মনোনীত ধানেরশীষের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন রয়েছেন খোস মেজাজে। তার বিরুদ্ধে শক্ত কোন প্রার্থী না থাকায় তিনি জয়ের ব্যপারে নিশ্চিত।
আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, ‘আমি ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে নির্যাতিত একজন কর্মী হিসেবে মাদারীপুর-৩ আসনের তথা জেলার নেতা-কর্মীদের আস্থায় আসতে পেরেছি। পাশাপাশি আমি জানি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান সে প্রত্যেকটি নেতা-কর্মীর কর্মের খবর রাখে। সেজন্যই আমি আশা করতেছি যে, আমি একজন কর্মী ও ভালো কর্মী হিসেবে, একজন নির্যাতিত কর্মী হিসেবে যেহেতু আমি এলাকার নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে জনগনের মনজয় করতে পেরেছি, আস্থায় আসতে পেরেছি ইনশাআল্লাহ আগামী এওয়াদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীক বিপুল ভোটে বিজয় ছিনিয়ি আনবো ইনশাআল্লাহ তবে তার প্রধান বাধা হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর কালকিনি পৌরসভা আমীর রফিকুল ইসলাম। তিনি জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও ১১ দলীয় ঐক্যজোট প্রার্তী হওয়ায় তিনিও দাড়িপাল্লা মার্কায় জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। এ আসনে বিএনপি’র নির্বিঘ্নে জয়ের বাধা জামাত এগুচ্ছে কৌশলে। মাদারীপুর-২ আসনে জামাতের প্রার্থী না থাকায় বড় বড় নেতারা মাদারীপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্তী রফিকুল ইসলামে জয়ের ব্যপাওে উঠে-পড়ে লেগেছে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোটাররা দাড়িপাল্লা নাকি ধানের শীষে বিজয় দেখবেন এমনটাই দেখার বিষয় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির দিকে।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত