36 C
Dhaka
Tuesday, January 19, 2021
No menu items!

সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি–

এসএম আবুল হোসেন

করোনা কালে ঘর বন্দি ঈদ উদযাপন করতে গিয়ে মনে পড়ে গেল ছেলে বেলার ঈদ উদযাপনের মধুময় স্মৃতি। তখন রাজধানী ঢাকার এমন জৌলুস ছিল না, ছিল না এমন শান্ শওকত। তবে ঈদ ছিল অপার আনন্দময়।

শৈশবে বা কৈশোরকাল ঈদের ঝাপটা লাগতো কয়েকদিন আগে থেকেই। নতুন জামা কাপড় বানাতাম। মা নতুন জামা কাপড় তুলে রাখতেন কাঠের আলমারিতে।

আমাদের যেন তর সইতো না। খেলার ফাঁকে মাঝে মাঝে ছুটে গিয়ে নতুন জামা কাপড় ছুঁয়ে দেখতাম। ঘ্রাণ নিতাম। খুব গোপনীয় রক্ষা করতাম।

ঈদের আগে যাতে বন্ধুরা নতুন জামা কাপড় দেখে না ফেলে। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে থাকতাম সরকারি কোয়ার্টারে। বন্ধুর অভাব ছিল না। ঈদের আগে কয়েকদিন আগে থেকেই ঈদ ঈদ আমেজ চলে আসতো। আমাদের ঈদ উৎসব মূলত শুরু হয়ে যেত রেডিও টেলিভিশনে নজরুল ইসলামের ‘ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গান বাজার সাথে।

তখন দেখতাম বিভিন্ন রাস্তায় এবং কোয়ার্টারের গেটে মেহেদী বিক্রি করা হতো। দেখতাম বাবা আমার বোনদের জন্য মেহেদী পাতা কিনে আনতো। চাঁদ রাতে বোনেরা তাদের বান্ধবীদের নিয়ে শীল পাটায় সেই মেহেদী পাতা বাটতো মনের আনন্দে।

পান খাওয়ার খয়ের, কমলার খোসা এবং আরো কি যেন মেশানো হতো মেহেদী পাতার সাথে। ইফতারের পর মা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন ঈদের রান্না নিয়ে আর বোনেরা বান্ধবীদের নিয়ে হাতে মেহেদী লাগাতো।

আমরা ছেলেরা বোনদের আড্ডায় হানা দিতাম। আমাদের হাতে লাগতো বোনদের মেহেদী। এরপর প্রতিযোগিতা কার মেহেদী কত লাল হয়। তখন মেহেদী লাগানোর এত আধুনিক উপকরণ ছিল না। কাঠি দিয়ে বিভিন্ন নকশা করে দুই হাতে মেহেদী লাগাতো। আমরা ছেলেরা মেহেদী লাগানো হাত ঘন্টাখানেক পর মেহেদী ধুয়ে ফেলতাম। কিন্তু বোনদের দেখতাম হাতে মেহেদী লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো।

ঘুমের মধ্যে ছিল সতর্ক যাতে মেহেদী বিছানা নষ্ট না করে। ঘুমের মধ্যে কিভাবে যে হাত ব্যালেন্স করতো আল্লাহ জানেন। ঈদের দিনটি ছিল বন্ধুদের সাথে ঘোরাঘুরি। সকালে ঘুম থেকে উঠে কসকো সাবান দিয়ে গোসল করা। তারপর বাবার সাথে নামাজ পড়তে যাওয়া।

তখন আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল চক বাজারের ঈদের মেলা। পুরো রমজান মাস চকবাজার থাকতো ইফতার বাজার। ঈদের দিন হয়ে বসতো মেলা। ভাবতাম রাতারাতি ইফতার বাজার কি ভাবে মেলায় পরিণত হতো।

ঈদ সেলামি নিয়ে চলে যেতাম চকবাজার। ঘুরে বেড়াতাম আর সাধ্য অনুযায়ী পছন্দের জিনিস কিনতাম। টমটম, টিনের তৈরি পিস্তল, লঞ্চ। সে সময় কোকাকোলা, সেভেন আপ ফান্টার বোতলে রং এবং স্যাকারেন বা কৃত্রিম চিনি দিয়ে তৈরি শরবত ছিল লোভনীয়। দশ পয়সা বোতল।

সেই শরবত পান করে কি যে তৃপ্তি পেতাম বলে বোঝানো যাবে না। অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। মেলা থেকে কিনে আনা খেলনা পিস্তল দিয়ে বন্ধুরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলতাম।

একদল মুক্তি যোদ্ধা আরেক দল পাকিস্তানী আর্মি। বলে রাখছি চকবাজার ঈদ মেলা ছাড়াও আশুরা উপলক্ষে হোসেনী দালান ইমাম বাড়ার সামনের খোলা মাঠে এবং তৎসংলগ্ন সড়কে মেলা বসতো । এই মেলা আশুরার পরদিন চলে যেত আজিমপুর।

ঈদের আরেকটি বিনোদনের উৎস ছিল মিরপুর চিড়িয়াখানা। বিআরটিসির বাসে গেলে যা ভাড়া দিতাম তাই নিত। যান্ত্রিক এবং ডিজিটাল যুগে সেই নির্মল বিনোদনের কথা মনে পড়লে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটা মনে পড়ে ‘ দিন গুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না।

লেখকঃ এস এম আবুল হোসেন সাংবাদিক ও লেখক