36 C
Dhaka
Wednesday, January 27, 2021
No menu items!

‘জ্যোতি বসু-র দুই কীর্তি : চন্দন আর নন্দন’

কেশব মুখোপাধ্যায়

চন্দন বা চন্দন বসু হলেন জ্যোতি বসু-র পুত্র, আর ‘নন্দন’ হলো বাম শাসনামলে নির্মিত পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র ।

জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে, ‘চন্দন’ এবং ‘নন্দন’ এবং উপরে ঊর্ধ্ব কমার মধ্যে উল্লিখিত বাক্যটির দ্বারা।

বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে নানা আক্রমণের তীর নিক্ষেপ বামবিরোধী রাজনীতির অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য ছিল ।

যদি ভুল না করি, শীর্ষে ঊর্ধ্ব কমার মধ্যে উল্লিখিত বাক্যটির উদ্ভাবক তৎকালীন বিরোধী নেত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং ।

১৯৮০-র ১১ এপ্রিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ক’রে, কলকাতা রবীন্দ্রসদন-এর পাশে থাকা জলাশয়ের ওপর নির্মিত হয় পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র- ‘ নন্দন’।

নন্দন-এর নামকরণ এবং এর ক্যালিগ্রাফি তৈরি করেন সত্যজিৎ রায় ‌। ওই চলচ্চিত্র কেন্দ্র এবং তাকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত নানান কর্মকাণ্ড বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়-সহ অন্যান্য চলচ্চিত্র প্রেমীরা ।

১৯৮৫-র ২ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন, তৎকালীন তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রভাস ফদিকার প্রমুখের উপস্থিতিতে। জলাশয়কে মোটামুটি বজায় রেখে, তার ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ‘পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ নন্দন-এর উদ্বোধন করেন সত্যজিৎ রায় ।

নন্দন-এর উদ্বোধন : ছবির বাঁদিক থেকে উদ্বোধক সত্যজিৎ রায়, মুখ্যমন্ত্রী জ্যোটতি বসু, তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রভাস ফদিকার এবং মৃণাল সেন ।

সোয়া দুকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই চলচ্চিত্র কেন্দ্রের ভিতর আছে তিনটি প্রেক্ষাগৃহ, ফিল্ম লাইব্রেরি, আর্কাইভ, প্রদর্শনীর জন্য স্থান ।

চন্দন এবং নন্দন নিয়ে জ্যোতি বসুকে রাজনৈতিক খোঁচা দেওয়া হলেও, জ্যোতি বসুর মনোজগতে চলচ্চিত্র-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে আলাদা কোনও আবেগ কখনোই ছিল না ।

বরং সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করলে, উত্তর পাওয়া যেত ‘…ওটা বুদ্ধ বলবে…’ । ওই কথার দ্বারা জ্যোতিবাবু বোঝাতে চাইতেন, সাহিত্য-চলচ্চিত্র ইত্যাদি তাঁর নিজস্ব বিষয় নয় ।

জ্যোতি বাবুর বিরুদ্ধে যে সমালোচনাই থাক, তিনি কখনও নিজস্ব বিষয় বা গন্ডির বাইরে যেতেন না । এবং সর্ব বিষয়ে নিজের পারদর্শীতা প্রমাণ করতে গিয়ে, কখনও নিজেকে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করেননি ।

অবশ্য শুধু জ্যোতিবাবু নন, পশ্চিম বাংলার রাজনীতিবদের সঙ্গে সাহিত্য – সংস্কৃতির সম্পর্ক অতি ক্ষীণ । সামান্য কিছু ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই থাকে । এক্ষেত্রেও ছিল, আছে ।‌

একদা রাজ্য কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ যখন সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, সেই সময় বিরোধী বামদের দ্বারা তিনি ‘অশিক্ষিত’, ‘মূর্খ’ বলে আখ্যায়িত হয়েছেন।

কিন্তু সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পর, তাঁর ‘কষ্টকল্পিত’ এবং অন্যান্য লেখা, অনেককেই বিস্মিত করেছিল ।

১৯৭৭-এ থেকে পশ্চিম বাংলায় যে বাম জমানা বা বাম শাসনের শুরু, ৩৪ বছর পর ২০১১-র ‘পরিবর্তন’-এর ঝড়ে তার অবসান ।

১৯৭৭-এর পূর্বে পশ্চিম বাংলায় ১৯৬৭ এবং ‘৬৯-এর যুক্তফ্রন্ট শাসনের সামান্য কিছু সময়কে বলা যায়, বাম শাসনের প্রস্তুতিপর্ব । ১৯৬৭ এবং ‘৬৯ সালে যুক্তফ্রন্ট শাসনের দুটি পর্বেই উপ-মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন জ্যোতি বসু ।

বিগত শতাব্দীর নয় দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, পশ্চিম বাংলার তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী তরুণ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে কিছু মানুষের ধারণা হতে থাকে, রাজনীতি থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ বেশি । যদিও ধারণাটি সঠিক নয় বলেই মনে করি ।

বাম রাজনীতির পাশাপাশি বুদ্ধদেববাবু কিছু সাহিত্য চর্চা করতেন, এখনও করেন । বাম ঘরনার কবি, সাহিত্যিক,শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ছাড়াও, বিগত শতাব্দীর নয় দশকের মাঝামাঝি তিনি কয়েকজন জনপ্রিয় ‘বুর্জোয়া’ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে নিজ আগ্রহে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন । এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ।

কলকাতার ‘নন্দন’ চলচ্চিত্র কেন্দ্রর প্রতি বুদ্ধদেব বাবুর যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল তা সর্বজন স্বীকৃত ।

মন্ত্রী হিসেবে মহাকরণের কাজ সেরে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পার্টি অফিস বা বাড়ি ফেরার পথে, মাঝে মধ্যে কিছু সময়‌ তিনি নন্দনে কাটিয়ে যেতেন ।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, ‘পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র নন্দন’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না ।

কারণ ১৯৮১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বুদ্ধদেব বাবু পরাজিত হন এবং সকল সরকারি কর্মকাণ্ড থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন।পরের নির্বাচনে অবশ্য তিনি জয়লাভ করেন এবং রাজ্য মন্ত্রীসভায় আবার তথ্য -সংস্কৃতি দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রসঙ্গত বলা যায়, ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর, রাজ্য বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভা এবং রাজ্য রাজনীতিতে যে কয়েকজন বাম নেতা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন, তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁদের অন্যতম ।

বয়সের কারণে জ্যোতিবাবু পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পর, ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ পশ্চিম বাংলার শিল্প – সাহিত্য – সংস্কৃতি জগতের মানুষকে উৎসাহিত করেছিল ।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য লেখক বুদ্ধিজীবীরা দুটি অংশে ভাগ হয়ে, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি প্রশ্নে তৎকালীন বাম শাসকদলের ভূমিকার পক্ষে এবং বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ।

দুটি ক্ষেত্রেই যেমন ছিল কিছু নীতিগত দিক, অন্যদিকে তেমনি ছিল ব্যক্তিগত সুযোগ হাসিলের দিক । যা পরবর্তী পর্যায়ে স্পষ্ট হয় বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিগত সুযোগ হাসিলের কর্মতৎপরতায় ।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রশ্নে তৎকালীন শাসক বাম দলের পক্ষ নিয়ে, যারা মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বাবুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেশি গলা চড়িয়ে ছিলেন, ২০১১ সালে রাজ্যে বাম শাসনের অবসানের পর, তারাই একশো আশি ডিগ্রী ডিগবাজি খেয়ে বর্তমান শাসক শিবিরে অন্তর্ভক্ত হয়েছেন ।

মাছ যেমন জল ছাড়া বাঁচতে পারে না, কবি ইত্যাদি তকমাধারী সুযোগ সন্ধানীরা তেমনি ক্ষমতার ছত্রছায়া ছাড়া !

এরা জানে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকলে, জোটে অর্থ, পুরস্কার-সহ নানান ক্ষেত্রে নানা সুযোগ-সুবিধা এবং … ।

২০১১ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের শোচনীয় পরাজয়ের পর, কেউ কেউ কিছুটা পরিহাস করে বলেছিলেন, রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবন মহাকরণ ছেড়ে আসতে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যতো না কষ্ট পেয়েছেন, তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র নন্দন ছেড়ে যেতে ।


নিচের ছবি :
ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ হীরালাল সেন
(জন্ম : ১৮৬৬, মানিকগঞ্জ, মৃত্যু: ১৯১৭ কলকাতা) ‘থেকে শুরু করে’, সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে, ঋত্বিক ঘটক থেকে শুরু করে, প্রমথেশ বড়ুয়া-কানন দেবী থেকে শুরু করে, উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র, ছবি বিশ্বাস ইত্যাদি থেকে শুরু করে, শেষপর্যন্ত … ‘কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৮’ উপলক্ষে, সত্যজিৎ রায় দ্বারা একদা উদ্বোধন হওয়া চলচ্চিত্র কেন্দ্র : নন্দন নবরূপে সজ্জিত ।


লেখকঃ কেশব মুখোপাধ্যায় সাংবাদিক লেখক ও সংগঠক কোলকাতা