36 C
Dhaka
Tuesday, January 26, 2021
No menu items!

আমাদের বালকবেলার ঈদ-স্মৃতি

বিভুরঞ্জন সরকার

এবার এক অন্য রকম ঈদ এসেছে। উৎসবের মেজাজ নেই। আনন্দের পরিবেশ নেই। এক ভয়াবহ মারণব্যাধি সব মানুষকে এক চরম অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি করেছে। জীবনের ভয়, জীবিকার অনিশ্চয়তা, কবে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসবে সেই ভাবনা, সব মিলিয়ে অস্থির সময়, অস্বস্তির সময়। তারপরও ঈদ এসেছে। ঘরে ঘরেই হয়তো সীমিত পরিসরে, আত্মীয়-মেহমানের অনুপস্থিতিতে ধর্মাচার অনুযায়ী ঈদ পালিত হবে।

আজ এই দুর্যোগের ঈদকে সামনে রেখে মনে হচ্ছে কেমন কাটতো আমাদের বালকবেলার ঈদের আগের দিন এবং ঈদের দিন? আমরা কি রোজা বা ঈদ উপলক্ষ্যে হিন্দু-মুসলমান আলাদা হয়ে যেতাম? নাকি উৎসবের আনন্দটা সবাই একযোগে ভাগাভাগি করে নিতাম? আমার যতোদূর মনে পরে, সেই ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আমরা ঠিক ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী উৎসবের আনন্দ ভাগ করিনি। কি করতাম আমরা? আমরা হিন্দু ছেলেরা কি নামাজ পড়তাম বা রোজা রাখতাম? মুসলিম ছেলেরা কি পূজা করতো বা মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করতো? বিষয়টা তেমন ছিলো না। আমরা যারা হিন্দু ধর্মানুসারী ছিলাম, আমরা জানতাম, রোজা রাখবেন ইসলাম ধর্মানুসারীরা। কিন্তু তারা যখন দিনে শেষে রোজা ভাঙবেন, ইফতার করবেন, তখন আমরা তাতে অংশ নেবো। ধর্মটা যার যার, আনন্দটা সবার। ঠিক তেমনি ঈদের দিনও আমরা নামাজ পড়িনি ঠিকই কিন্তু ঈদগাঁ ময়দানে উপস্থিত হয়েছি। কাছে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখেছি। নামাজ শেষে কোলাকুলি করেছি। মুসলিমদের কেউ কেউ জিলেপি কিনে দিয়েছেন, আমরা খেয়েছি। অথবা কেউ আবার ঈদগাঁ থেকে সোজা আমাদের নিয়ে গেছেন বাড়িতে। সেমাই, ফিরনি এবং পোলাও-মাংস খাইয়ে তারপর ছেড়েছেন। পূজা-পার্বণে আমাদের মুসলমান বন্ধুরা আমাদের সঙ্গে মন্ডবে গিয়েছে , নাড়ু-মোয়া বা পূজার অন্য প্রসাদ খেয়েছে। কেউ বলেনি হিন্দুদের পূজায় গেলে মুসলমানিত্ব চলে যাবে। আবার ঈদ আনন্দে আমরা অংশ নিলে হিন্দুত্ব থাকবে না – এমন কথাও আমরা সেকালে শুনিনি। গোড়া হিন্দু কিংবা রক্ষণশীল মুসলমান হয়তো তখনও ছিলেন, কিন্তু সমাজে তাদের প্রাধান্য ছিলো।

আমার বেশ মনে আছে, আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়তে কয়েক বছর ঈদে নতুন কাপড় পেয়েছি সাইদুর নানার কাছ থেকে। ভুলু চাচা, দুলু চাচার বাবা সাইদুর রহমানকে আমি নানা ডাকতাম। এক মুখ সাদা দাড়ির সাইদুর নানা দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তার কাছ থেকে ঈদ উপহার পাওয়া ছিলো আমার কাছে এক বড় আনন্দের ব্যাপার। এছাড়াও আরো কারো কারো কাছ থেকে ঈদ বকশিস পাওয়াও ছিলো খুবই আনন্দদায়ক।

রোজা যখন শেষ হয়ে আসতো তখন আমরাও এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করতাম। ঈদ আসছে – ভাবতেই কেমন যেন খুশি খুশি লাগতো। দরজির দোকানে দোকানে ঘুরে নতুন জামা-কাপড় বানানো দেখতাম। নতুন কাপড়ের গন্ধ দারুণ লাগতো। ওগুলো আমার ছিলো না। তবু আনন্দ করতে সমস্যা হয়নি।

শেষ রোজার দিন বিকেল হলেই আমরা দল বেধে হাই স্কুলের মাঠে গিয়ে সমবেত হতাম। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য। আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য আমরা স্কুল মাঠে জড়ো হতাম। চোখ থাকতো পশ্চিম আকাশে এক ফালি চাঁদের দিকে। যার চোখে ঈদের চাঁদ প্রথম ধরা দিতো, তাকে নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাসের সীমা থাকতো না। চাঁদ দেখার যে স্বর্গীয় আনন্দ সেটা ‘চান রাতে’ ভালো বোঝা যেতো। একদিকে চাঁদ দেখার আনন্দ, অন্যদিকে রেডিওতে বেজে উঠতো : রমাজনের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ—আহ্, সে রাতে আমাদের চোখেও আসতো না নিদ – ঘুমহীন রাতও ছিলো কতো মায়াময়!

ঈদ উদযাপন নিয়ে বিভ্রাটও দুএকবার হয়েছে। কেউ নিজ চোখে চাঁদ না দেখে ঈদ করবেন না। কেউ আবার রেডিওর ঘোষণা শুনেই রোজা শেষ করার পক্ষপাতী। গত বছরও ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে চাঁদ দেখা কমিটি তুলনাহীন নাটকীয়তা করেছে। প্রথম বৈঠক শেষে বলা হলো, দেশের কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। কাজেই ৩০ রোজা শেষে ঈদ। ব্যাপারটা অনেকের কাছেই খটকা লাগে। সৌদি আরবে যেদিন ঈদ হয় তারপর দিন আমাদের দেশে সাধারণত ঈদ উদযাপন হয়, তা কোনো কারণে দেশে চাঁদ দেখা যাক আর নাই যাক। তো, এবার তার ব্যতিক্রম কেন? সৌদি আরবে মঙ্গলবার ঈদ হয়েছে, কাজেই বুধবার বাংলাদেশে ঈদ হবে। প্রায় সব মুসলমানের তেমনই প্রস্তুতি। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও চাঁদ দেখা যাওয়ায় বুধবার ঈদ উদযাপনের খবর প্রচার হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা টিকা-টিপ্পনি ছড়াতে থাকে ।

টনক নড়ে আমাদের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির। রাত এগারোটায় তড়িঘড়ি মিটিং করে নতুন ‘এলান’ জারি হয়, না, চাঁদ দেখা গেছে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারিতে, তাই বুধবারেই ঈদ। পুরো বিষয়টিতে সাধারণ মানুষ বড়ই আমোদ উপভোগ করেন। কেউ কেউ এমনও বলেন যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঈদ আনন্দ-আয়োজনে মানুষের সেভাবে মনোরঞ্জন করতে পারে না বলেই এবার চাঁদ দেখা কমিটি একটু ব্যতিক্রমী ঈদ-আনন্দ উপহার দিলো। কেউ কেউ আবার বিষয়টিতে রাজনীতির সস মেশাতেও ভুল করেননি। তাদের বক্তব্য : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে আছেন। তার হুকুম ছাড়া কিছু হয় না। ফলে চাঁদ দেখা কমিটি বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভাবতে পারেননি যে, চাঁদ ওঠা না-ওঠা যে তার নির্দেশের অপেক্ষা করে না, এটা তার পারিষদবর্গের মাথায় নেই!

যাহোক, এবার চাঁদ দেখতে পাওয়া নিয়ে কোনো সংকট হয়নি। সৌদি আরবে রবিবার ঈদ। আমাদের দেশে সোমবার। ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বিড়ম্বনা কিন্তু গত বছরই প্রথম হয়েছ তা নয়। আমাদের ছোটবেলাতেও এমন বিভ্রাটের কথা আমার মনে পড়ছে। পর পর দু’দিন ঈদ উদযাপনের ঘটনাও ঘটেছে। যতদূর মনে পড়ছে ১৯৬৮ সালে আমাদের এলাকায় চাঁদ দেখা না-দেখা নিয়ে বিরাট বিরোধ দেখা দেয়। সেবার সম্ভবত মেঘলা আকাশের কারণে আকাশে এক ফালি বাঁকা চাঁদকে হাসতে দেখা যায়নি। আমরা যথারীতি দল বেধে হাই স্কুলের মাঠে গিয়ে চাঁদ দেখার জন্য পলকহীন চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু চাঁদ তো আর উঁকি দেয় না। কেউ সোল্লাসে চিৎকার দিয়ে বলে উঠছে না, ওই তো চাঁদ, আমি দেখেছি, আমি দেখেছি। ‘আয় আয় চাঁদ মামা’ বলে কেউ কেউ বিলাপ সঙ্গীতও গাইতে শুরু করেছিল। কিন্তু চাঁদ সেবার আড়ি ভাঙলো না। আমরা বিফল মনোরথ হয়ে বাজারে ফিরে এসে দেখি, সবাই জটলা করছেন। কি হবে এখন। সৌদিতে তো আজ ঈদ হলো। আমরা কি তাহলে চাঁদ না দেখেও কাল ঈদ করবো? রেডিওতে ততোক্ষণে পরের দিন ঈদ পালনের ঘোষণা হয়ে গেছে। মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো। এক পক্ষ নিজ চোখে চাঁদ না দেখে ঈদ করবেন না। আর এক পক্ষ সবাই যা করে সেদিকেই থাকতে চান। দীর্ঘ কাজিয়া শেষে ঠিক হলো, ঈদ দু’দিনই হবে। চাঁদ দেখে যারা ঈদ করতে চান তারা একদিকে, আর লোকমুখে শুনে কিংবা তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যারা চাঁদের বিষয়টা দেখেছেন তারা একদিকে। তবে এক দিনে ঈদ হচ্ছে না শুনে আমরা প্রথমে কষ্ট পেলেও পরে খুশি হয়েছিলাম। কারণ দুইদিন ধরে ঈদের উপাদেয় সব খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

এবারের ঈদ আনন্দহীন। নতুন কাপড়, সুরমা-আতর-সেমাই-পোলাও না হলেও ঈদ হচ্ছে। এমন ঈদ যেন আর না আসে সেই কামনা সবার।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক