36 C
Dhaka
Tuesday, January 19, 2021
No menu items!

আমেরিকা: এখন ধারে কাটছে, না ভারে?

আবু সাইদ লিপু

প্রচুর খেজুর গাছ ছিলো আমাদের বাড়িতে। শীতকালে খেজুর গাছ কাটা, রস আস্বাদন- মহা উৎসবের ব্যাপার। যে লোকটি এই মহারণের কেন্দ্রে থাকতো তার পদবী গাছী। মানুষটির দু’টো কর্ম আমি খুব আগ্রহে লক্ষ্য করতাম ছোটবেলায়। উঁচু খেজুর গাছের সাথে দড়ি দিয়ে নিজেকে আটকে অদ্ভুদ ভঙ্গিমায় গাছ কর্তনের কাজটি। দ্বিতীয়টি অতি ধারালো একটা দা। আমাদের মাদারীপুরের ভাষায় বলে ছ্যান। প্রতিদিন একটা কাঠের টুকরোর উপর দানা বালু ঢেলে সেই ছ্যান ধার দিতেন তিনি। যত ধার তত সহজ এবং নিখুঁত কর্তন।

সোভিয়েত পতনের পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি। যা ইচ্ছা তাই করতো, এখনো করে। তবে অতীতের সাথে কিছু ব্যতিক্রম আছে এখন। আগের পররাষ্ট্রকর্ম বেশ একটা চাতুরিপূর্ণ ছিলো। রিগ্যান, ক্লিনটন, ওবামা এমনকি বুশরাও মার্কিন কুটনীতিকে উচ্চমার্গে পরিচালনা করতেন। জাতিসংঘ নামে একটা সংগঠন আছে বিশ্বে। সেই সংঘের কাজ ছিলো আমেরিকার সকল কর্মকান্ডে বৈধতা প্রদান। ফলে বাকী বিশ্বের তেমন কিছু বলার থাকতো না। রাশিয়া একটু গাই-গুই করতো, কিন্তু ওই পর্যন্তই। আমেরিকা আফগানিস্তান, ইরাকসহ যতগুলো যুদ্ধ করেছে তারা সব নিরাপত্তা পরিষদে পাশ করিয়ে নিয়েছে। উত্তর কোরিয়া বা ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকেও বৈশ্বিক করে নিয়েছিলো। বলতে গেলে বৃটেন, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশের পররাষ্ট্রনীতিরই কোন প্রয়োজন ছিলো না। মার্কিনদের নীতিই ছিলো ওদের নীতি। এতই ধার ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব নেতৃত্বে।

অবস্থা বদলেছে এখন। ইরানের প্রসঙ্গ আনা যাক। বিস্তর কুটনীতি প্রয়োগ করে বৃহৎ শক্তিগুলো ইরানের সাথে একটা পরমানু চুক্তিতে পৌঁছায় প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে। বিশ্ব হাফ ছেড়ে বাঁচে। একটা যুদ্ধের ফাঁড়া কেটে গেলো। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এসেই চেষ্টা করেন সেই চুক্তি বাতিল করতে। এইখানেই দা’য়ের ধার ফেল করে তার। কোন দেশই চুক্তি বাতিলে রাজী হয় না। শেষে সৌদি আরব আর ইসরায়েলের চাপে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা চুক্তি থেকে সরে আসে। জাতিসংঘকে রাজী করাতে পারবে না। তাই নিজে নিজেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেয় ইরানের উপর।

কিন্তু ইরান চুটিয়ে ব্যবসা করে যায় বাকী দেশগুলোর সাথে। এবার আমেরিকা দা’য়ের ধার বাদ দিয়ে ভারে চলে যায়। অন্য দেশগুলোকেও ইরানের সাথে ব্যবসা না করতে চাপ দিতে থাকে। চীনের মোবাইল ফোন কোম্পানি হুয়াওয়ের সিইওর মেয়েকে কানাডাতে গ্রেফতার করা হয়। কানাডা বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তারা কাজটি করেছে। আমেরিকার অভিযোগ, হুয়াওয়ে ইরানের সাথে অবৈধ লেনদেন করেছে। ইউরোপ এবং রাশিয়াকেও চাপ দিয়ে যাচ্ছে সে। অর্থাৎ ইরান-নিষেধাজ্ঞা টেকসই করতে সর্বশক্তি দিয়ে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। ধার চুলোয় গেছে, তাই ভার দিয়ে কাটার প্রাণান্ত প্রয়াস।

তুরস্কের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী পর্যালোচনা করা যাক। ট্রাম্প হঠাৎ করেই সিরিয়া থেকে সৈন্য অপসারণের ঘোষণা দেয়। বিষয়টা তুরস্কের জন্য পোয়াবারো হয়ে উঠে। ততক্ষণাৎ সে সিরিয়ায় সেনা পাঠিয়ে শত্রু কুর্দিদের সরিয়ে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। সারা আমেরিকায় ছিঃ ছিঃ উঠে যায় – আমেরিকা যুদ্ধ শেষ না করে সিরিয়া ত্যাগ করেছে। উপায়ান্তর না দেখে ট্রাম্প তুরস্ককে উপর্যুপরি হুমকি দিতে থাকে সিরিয়ায় সৈন্য না পাঠাতে। বজ্রকঠিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিও থাকে তাতে। অথচ এরদোগান পাত্তাই দেন না। শেষে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র মন্ত্রী আর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে তুরস্কে প্রেরণ করেন একটা সমঝোতা করতে। প্রেসিডেন্টকে বাদ দিলে আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এরাই। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরদোগান সাফ জানিয়ে দেন যে, তিনি এদের সাথে দেখা করবেন না। শুধু এটুকুই আমেরিকার জন্য বিরাট চপেটাঘাত। পরে অবশ্য সেই ভারের চাপে তাদের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হলো, তুরস্কের মত দেশ আমেরিকার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে না করেছিলো। মার্কিন কুটনীতির ধার কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

সৌদির সাথে সাম্প্রতিক তেল কুটনীতির বিষয়টাও প্রণিধানযোগ্য। ব্যাপকভাবে আমেরিকান শেল অয়েল উত্তোলনে তেলবিশ্ব শংকিত। তেলের দাম বেশী। আমেরিকা সমানে তেল উঠাচ্ছে। ওদিকে তেল নিয়ে সৌদি আরব এবং অন্য খেলোয়াড় রাশিয়ার মধ্যে ঠুকাঠুকি পুরোনো। বেশ কিছু তৈলাক্ত দেশের সংগঠন ওপেক মোটামুটি সৌদির পকেটস্থ। ইরানজুজুর ভয়ে সৌদি আরব আমেরিকাকে গুরু মেনেছে গত সাত দশক ধরে। যে কোনো বিপদে গুরু রক্ষা করবে এই তাদের বিশ্বাস। ওপেক সৌদির পকেটে মানে আমেরিকারও পকেটে। কিন্তু সেই নিয়ম এখন খাটছে না।

এমতাবস্থায়, তেলের দাম কমাতে ওপেক তেল উত্তোলন বাড়িয়ে দেয়। ওদিকে, রাশিয়া কম যাবে কেন? তারাও পাল্লা দিয়ে তেল উঠাতে থাকে। তেলে তেলে সয়লাব হয় দুনিয়া। দাম কমতে থাকে হু হু করে। ট্রাম্প শুরুতে বগল বাজাতে থাকেন- তেলের দাম কমায় ভালোই হয়েছে বলে। আমেরিকান ভোক্তারা কম দামে তেল কিনতে পারবে। এরই মধ্যে শুরু হয় করোনাভাইরাসের আক্রমণ। তেলের চাহিদা কমে যায় ধপাস করে। অথচ বাজার তেলে তেলতেলে।

তেল উত্তোলনের প্রযুক্তিগত কারণে আমেরিকার উত্তোলন খরচ সৌদি বা রাশিয়ার তুলনায় বেশী। তেলের দাম কমায় আমেরিকার উত্তোলন লোকসানে পড়তে থাকে। ট্রাম্পের টনক নড়ে। উত্তোলন কমাতে চাপ দিতে থাকে ওপেক আর রাশিয়াকে। কে শোনে কার কথা। ট্রাম্পের কোন কুটনীতির ধারই কাজে লাগে না। আমেরিকার তেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মত অবিশ্বাস্য ঋণাত্মক হয়ে যায়।

তখনই ট্রাম্প তুরুপের সর্বশেষ তাসটা বের করেন, অর্থাৎ প্রচন্ড ভার প্রয়োগ করেন। মানে সৌদিকে হুমকি দেন- ওপেক তেল উত্তোলন না কমালে সৌদিকে ইরান থেকে সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করা হবে। এটাই ছিলো ট্রাম্পের সর্বশেষ অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী এক পত্রিকা বলেছে, তেল উত্তোলন কমানোর মত সামান্য একটি কুটনীতি বাস্তবায়নের জন্য ট্রাম্প সৌদি আরবের সাথে ৭৫ বছরের বন্ধুত্বকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো।

আমেরিকা এখনও বিরাট শক্তি আর অর্থনীতির দেশ। তার ভারও অনেক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ধারের কুটনীতি ভার দিয়ে সারতে থাকলে সেই ভারও সংশ্লিষ্টদের সহ্য ক্ষমতার মধ্যে চলে আসতে পারে একসময়। তখন ভারকেও থোড়াই কেয়ার করার সংস্কৃতি মনোভাব তৈরি হয়ে যেতে পারে কোনো কোনো দেশের মধ্যে। মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হলো- ট্রাম্প কি আমেরিকাকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছেন?

লেখক: কানাডার জিওটেকনিক্যাল বিভাগে কর্মরত

সর্বশেষ

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় সকল নৌযান বন্ধ, যাত্রীদের দুর্ভোগ

নিউজ ডেস্ক: ঘন কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সোমবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে ফেরি ও লঞ্চসহ সব রকমের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।নদী পারের...

সিনেট থেকে পদত্যাগ করলেন কমলা হ্যারিস

নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস সিনেট থেকে স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ জানুয়ারি) পদত্যাগ করেছেন। ২০...

মার্কিন ইতিহাসে সব থেকে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বাইডেন

নিউজ ডেস্ক: মার্কিন ইতিহাসে সবথেকে প্রবীণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামীকাল বুধবার শপথ গ্রহণ করছেন জো বাইডেন। গত বছরের নভেম্বরেই বাইডেনের বয়স হয়েছিল ৭৮...

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অভিনেতা মুজিবুর রহমান দিলু আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রিয় অভিনেতা মুজিবুর রহমান দিলু আর নেই। মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি...

মেহেরপুর সদর উপজেলার উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

মেহের আমজাদ, মেহেরপুরঃ মেহেরপুর সদর উপজেলা পরিষদের আয়োজনে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মেহেরপুর সদর উপজেলার উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।...