36 C
Dhaka
Thursday, January 21, 2021
No menu items!

অদেখা জীবন!

আব্দুর রহমান

জীবন এক অন্তসারশুন্য বাস্তবতা।যে জীবন বয়ে চলে মানুষের; থমকে দাড়িয়ে কজন সে জীবন দেখে? কজনই বা বোঝে! প্রকৃতিতে বহুমাত্রিক যে জীবন তার সাথে আমরা কতটা পরিচিত?যেমনটা জীবনানন্দ দাশ বলেছেন…. যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের- তার সাথে মানুষের হয়নাকো দেখা। জীবনের অনিশ্চিত ভ্রমনে কখনও কখনও সেই অদেখা জীবন দৃষ্টিগোচর হয়।এরকমই কিছু জীবন দেখেছিলাম আমি বহুকাল আগে।সে জীবন ফড়িংয়ের নয়, দোয়েলের নয়।জীবন্ত মানুষের!

দিন তারিখ এই মুহুর্তে মনে নেই।বছর পাচেক আগের কথা।বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি।তখনও রোযার মাস চলছে। বন্ধু মাসুদ হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বলল…… সামনে ঈদের দুইদিন পরে সিলেট ঘুরতে যাবে!বন্ধু শফিকের ছোট ভাই নাহিদের খালা বাড়ী সিলেটে।এর অাগে কখনও সিলেট যাওয়া হয়নি অামার! কিন্তু সেখানকার পাহাড়,বৃষ্টি, আতিথেয়তার কথা অনেক শুনেছি।সহসাই রাজী হয়ে গেলাম।

অতপর কাঙ্খিত দিনে যাত্রা শুরু হল অামাদের।অামরা ছিলাম চারজন।মাসুদ,শফিক,ছোট ভাই নাহিদ এবং আমি।খুব ভোরে বালাশুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।রাস্তায় তেমন জ্যাম না থাকার কারনে খুব সকালেই আমরা ঢাকা চলে আসলাম।গুলিস্থানে নেমে আমরা রিকশা নিলাম।উদ্দেশ্য কমলাপুর রেলস্টেশন! রিকশা চলছে মতিঝিলের কোন এক অখ্যাত সড়কে।যেই না শাপলা চত্বর পার হয়েছি ; অমন সময় দেখি এক লোক রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে পরম প্রশান্তিতে পায়ের রানের চিপায় চুলকিয়ে চলেছে…. রিকশাওয়ালা যতই হর্ন দেয়, ও ব্যাটা নড়ে না।ওনার ভাবখানা এমন যে, যতই হর্ন দাও আর উপর দিয়ে রিকশাই উঠিয়ে দাও, অামি বাপু নড়ছি না। চুলকানির শ্রেষ্ঠতম তৃপ্তি পরম শান্তিতে অামি অাজকে অাস্বাদন করিবই। যাইহোক রিকশাওয়ালাই পাশ কাটিয়ে চলে অাসলেন।কিন্তু সে দৃশ্য দেখে অামরা হো হো হো করে হেসেছিলাম।সে কথা মনে পড়লে অাজও হাসি পায়।

কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌছে ভাবলাম, স্টেশনের সামনের খালি জায়গাটাতে একটু হাটাহাটি করি, অার শফিক টিকিট কাটতে যাক।ভোরের নরম শীতল বাতাস গায়ে এসে লাগছে।ভালই লাগছে। চারপাশটা দেখার চেষ্টা করছি।হঠাৎই দেখলাম অনেকগুলো মানুষ খোলা অাকাশের নিচে শুয়ে অাছে।মস্ত খোলা অাকাশটাই তাদের বেচে থাকার ছাদ।ভোর হওয়া যাদের জীবনে কোন নতুনত্ব অানেনা।নতুন দিনের অালো ফোটেনা। অাহা জীবন! কী জীবন! সেই একই জীবন!জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ভোরবেলার অলস ঘুম ঝেড়ে, ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত দেহটাকে নিয়ে পথে বেড়িয়ে পড়ে।পথই তাদের একমাত্র ঠিকানা।জীবন ও দেহের সমস্ত অায়োজন পথই শুষে নেয়।পথ থেকে পথের কর্মচন্চলতায় বেচে উঠে জীবন!

পায়ে পায়ে রক্ত মেখে,পথে পথে ক্লান্তিকর যাত্রাবেলায় অাদর্শ,ভিটেমাটি,জমি-জিরাত,ধনসম্পদ সর্বস্ব ত্যাগ করা স্বীকৃত ওয়ারিশ অথবা বেওয়ারিশ অনাথ উদ্বাস্তু অাদমসন্তান এরা। জীবন এখানে এমনি করে বয়ে চলে।দেহের ভারে নু্্যব্জ হয়ে প্রকৃতির কাছে কি নিদারুন অাত্বসমর্পন!

তাই মনে হয়, অামরা শুধু পেয়েছি খন্ডিত দেশ, খন্ডিত ভাষা,খন্ডিত মানবতা!

হঠাৎ শফিকের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম, কিরে কি দেখিস?টিকিট কাটা তো শেষ।চল ভেতরে যাই।অামি কিছু না বলেই ওর পেছন পেছন হাটতে শুরু করলাম স্টেশনে দু একটা বইয়ের দোকানও অাছে।মাসুদ অার নাহিদ বই দেখছে। বাঙালি বই পড়াটাকে এখনও বিলাসিতা মনে করে। একটু জাতে উঠার জন্য অনেকেই অহেতুক বই নিয়ে নানান কায়দায় পৃষ্ঠা উলটায়।যেন তার সবই জানা। উচ্চমার্গীয় পাঠক একেবারে! অামরাও সেরকম একটা ভান ধরলাম।দু একটা বইও দেখলাম। অবশেষে ট্রেনে উঠার সময় হল।জীবনের প্রথম ট্রেন ভ্রমন। এক অনন্য অনুভুতি।পরক্ষনেই সেই অনুভুতি অাস্তে অাস্তে ফিকে হয়ে যেতে লাগল ; যখন দেখলাম ট্রেনে কোন সিট খালি নেই।বিরক্ত হয়ে ভাগ্যকে তিরস্কার করা শুরু করলাম, শালার প্রথমবার ট্রেনে উঠছি, তাও সিট নাই।কেমন লাগে? ট্রেন থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখছিলাম, কাউকে পাওয়া যায় কিনা! কোনরকম বসার তো ব্যাবস্থা করতে হবে! এতটা পথ দাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব! পাওয়াও গেল একজনকে। সে বলল… খাবারের বগিতে বসার ব্যাবস্থা করে দিতে পারবে।প্রতিজনে তাকে ৩০০ টাকা করে দিতে হবে।খাবারের বগি কেমন হবে? কেমন সীট কিছুই জানিনা। ভাববারও সময় নাই।অগত্যা অামরা তার প্রস্তাবে সম্মত হলাম। তিনি অামাদের খাবারের বগিতে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখি পেপসির বোতল সারি সারি রেখে উপরে কাঠ বিছিয়ে দিয়েছে।সেটাই নাকি সিট।মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।যখনই ভাবি ওই কাঠের উপর বসেই পুরোটা পথ যেতে হবে।কিছুই করার নেই!তখনই অামার বিরক্তি বাড়তে থাকে।

অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়ে যায়।নিজেকে অভাগা মনে করে কাঠের তক্তার উপর সেই কৃত্রিম সিটে বসে পড়লাম। বিরক্তি এড়াতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম।রেললাইন, পরিত্যক্ত বগি, দুরে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া উচু উচু বিল্ডিং, রেললাইনের পাশেই ছোট ছোট খুপড়িঘর যা কিছু দৃষ্টির সীমানায় দেখা যায়, চেয়ে রইলাম।এরই মধ্যে দেখি কয়েকটা অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে রেললাইনের উপরেই প্রকাশ্যে নেশা করছে। ওদের বয়েসী ছেলেমেয়েরা পরম যত্নে মা- বাবার কাছেই থাকে।স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে। জন্মায়িত সম্ভাবনা বিকাশের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু এদিকে সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু।সে মৃত্যু ঠেকাবার কেউ নেই।নেই রাষ্ট্র, নেই সমাজ- পরিবার, এমনকি বাবা- মা। ওদের কেউ নেই।ওরা রাস্তায়ই বড় হয়।ওরা টোকাই, অনাথ। সভ্য সমাজ ওদেরকে সুবিধাবন্চিত শিশু ডাকলেও: অনাথ শব্দের ভেতর যে মর্মভেদী যাতনা, সুবিধাবন্চিত শব্দে তা নেই।একবার কথা বলার ইচ্ছা হল, কিন্তু ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার অাশংকায় ইচ্ছাকে দমিয়ে শুধুই দেখে গেলাম। এক অন্য জীবন!

বিপত্তিটা বাধল যখন দেখলাম অামাদের বগিতে হুড়মুড় করে কিছু হিজড়া উঠে পড়ল।মুহুর্তেই পরিবেশটা একটা গুমোট ভাব নিল।সবাই একেকজনের দিকে তাকিয়ে অপ্রকাশিত ভয়,বিরক্তি, ঘৃনা প্রকাশ করল। অামিও বিরক্ত হলাম, মনে মনে ভাবলাম এদের সাথে একসাথে বসে কিভাবে যাব।এরা যে নোংরা নয়। ধুর ছাই! ট্রেনের মজাটাই নষ্ট হয়ে গেল।কিন্তু ওরাও যে অামাদের মতই অাদমসন্তান তা বোঝার মত বোধ তখনও হয়নি অামার।সঙ্গত কারনেই অামি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। বাইরে তাকিয়ে রইলাম। মাঝে মাঝে ওদের উচ্চারিত অশ্লীল বাক্য কানে অাসতে লাগল। অন্য অনেক যাত্রীর মধ্যে নিজেকে সংকুচিত করে তটস্থ হয়ে রইলাম।

অাস্তে অাস্তে ট্রেন চলতে শুরু করল।ট্রেনের গন্তব্য দক্ষিনমুখী।অামরা বসেছি উত্তরমুখী। ছোটভাই নাহিদকে বললাম, কিছু খাবার নিয়ে অাসতে। নাহিদ টাকা নিয়ে ক্যান্টিনের দিকে গেল।

ট্রেনের গতি বাড়ার সাথে সাথে অামার মাথা ঘোরা শুরু হয়ে যায়। কারন উল্টোদিকে বসার অভ্যেস অামার নেই। ট্রেন চলছে রাজধানী ঢাকার মধ্যে দিয়ে।কেউ কোন কথা বলছে না।সবার মধ্যেই বিক্ষিপ্ত চিন্তা কাজ করছে।ট্রেন উত্তরা পৌছে কিছুটা বিরতি নিয়ে অাবার চলা শুরু করল। শফিকের পাশেই বসে ছিল এক হিজড়া! একেবারে গা ঘেষাঘেষি করে।মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে হিজড়াটা অদ্ভুত চাহনিতে কিছু খোজার চেষ্টা করছিল। শফিকের অবস্থা দেখে অামরা তিনজন মুচকি মুচকি হাসছিলাম। ট্রেন চলছে তো চলছে।ঝকঝক শব্দের মাত্রা বেড়েই চলেছে।কত গ্রাম, নদী ব্রীজ পার হয়ে এগিয়ে চলছে এক অদ্ভুত মাদকতায়।হিজড়াদের উপদ্রবে গল্প করতে ইচ্ছে হলনা।চোখটা বন্ধ করে ঘুুমানোর চেষ্টা করলাম।একসময় চোখে তন্দ্রার মত লেগে অাসল।কতক্ষন এভাবে কেটেছে বলতে পারবনা।যখন তন্দ্রা ভাঙ্গল, তখন কোথায় পৌছেছি সেটাও বলতে পারবনা।কিন্তু স্পষ্টতই দেখলাম ছোট ছোট পাহাড় কেটে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা তেরি করা হয়েছে।সেখান দিয়েই ট্রেন চলেছে।

বিখ্যাত ভ্রমন কাহিনীকার সন্জীব চট্রেপাধ্যায় তার পালামৈা উপন্যাসে লিখেছেন….. বন্গবাসীদের কেবল মাঠ দেখার অভ্যাস, মৃত্তিকার সামান্য স্তুপ দেখিলেই তাহাদের বড়ো অানন্দ হয়।অতএব তৎকালে সেই ক্ষুদ্র পাহাড়গুলি দেখিয়া অামার যে কিন্চিৎ অানন্দ হইবে না, তা অার এমন কি!

অামারও সেই মুহুর্তে তদ্রুপ কিন্চিৎ অানন্দ লাগা শুরু হল।ঘুমের ঘোর কাটাতে ওয়াশরুম থেকে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে, ঠিক দরজার কাছে দাড়ালাম।সামনাসামনি বসা এক হিজড়ার সাথে মাসুদ কথা বলছে।অামি তেমন অাগ্রহ বোধ করলাম না। জানালার পাশে দাড়িয়ে রইলাম।মাঝে মাঝে উকিও দিচ্ছিলাম।ঠিক তখনই ওই হিজড়াটা মাসুদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে অামাকে বলল, এই ভাইয়া! ওভাবে বাইরে উকি দিওনা।চোখে ময়লা এসে লাগবে।জন্গল অার পাহাড়ী রাস্তা তো! অামি তার এই অযাচিত উপদেশ খুব একটা ভালভাবে নেইনি।কিন্তু তার বলার মধ্যে একটা ধরন ছিল।কর্তৃত্বপরায়ন সেই উপদেশবাক্য অামি এড়াতেও পারলাম না।

একঘেয়েমি কাটাতে অাবার মাসুদের পাশে এসে বসলাম। মাসুদ হিজড়াটাকে জিজ্ঞেস করছে, সে কোথায় থাকে? কোথায় যাবে? ওরা কেন উশৃংখল জীবনযাপন করে?মানুষতো এগুলি ভাল চোখে দেখেনা।অাস্তে অাস্তে হিজড়াটা সহজ হল।পান চিবাতে চিবাতে কথা বলা শুরু করল।বলতে লাগল অামার অদেখা জীবনের সমান্তরাল উপাখ্যান।

তার নাম সাথী।শৈশবে অাট দশটা ছেলের মতই সে জন্ম নিয়েছিল।মা- বাবার স্বপ্বে – জাগরনে সে ছিল তাদের অসামান্য উপহার। দিন-মাস- বছর পেরিয়ে সাথী যখন একটু বড় হল… সে মেয়েদের পোশাক পড়ে অায়নার সামনে নিজেকে দেখত।সাজতে পছন্দ করত।নিজের ভেতর অন্য কারও অস্তিত্ব অনুভব করত।

মা- বাবা ছেলের এই স্বভাব মোটেই ভালভাবে নিতে পারেনি।প্রথম প্রথম ওর গা থেকে মেয়েলি পোশাক খুলে দিত অার বলত, এগুলি তোমার পোশাক নয় বাবা! খুলে ফেলো! মা জোর করে সে পোশাক খুলে দিত।বাবা- মা যখন জানতে পারলেন ছেলে তাদের স্বাভাবিক নয়।হিজড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে, সন্মানের কথা চিন্তা করে তারা নিজেদের পাপের ফল হিসেবে মনে করে অহর্নিশি শোকোর মাতম শুরু করলেন।

একটু বড় হয়ে যখন সে স্কুলে ভর্তি হল, সেখানেও সবাই জানতে শুরু করল।স্কুলে কোন ছেলে বন্ধুর সাথে সে মিশতে পারত না। কোন ছেলে তার সামনে অাসলে অপ্রস্তুত হয়ে যেত।ভয়ে অাড়ষ্ট হয়ে যেত। ছেলেরা যেসব খেলাধুলায় অংশগ্রহন করত; সে তার কোনটাতেই অাগ্রহ দেখাত না।স্কুলের বন্ধুরা ওকে ক্ষ্যাপাত মাইগ্যা বলে। ওর সান্নিধ্য ছিল সকলের জন্য কৌতুকের।যেন অনেকগুলি মানবসন্তানের ভেতর একটা উদ্ভট অপরিচিত জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিপাশে।মেয়েদের সান্নিধ্য ওর নিরাপদ মনে হত।স্কুলের সেই বৈরী পরিববেশে চলতে থাকে তার শিক্ষাপাঠ।যখন সে বাড়িতে থাকত।বেশিরভাগ সময়ই একা বসে থাকত। বাসায় মেয়েদের পোশাক পড়া ছিল মানা।অাত্বীয় স্বজন এলে তাদের সামনে যেতেও বারন ছিল।

রুমের দরজা বন্ধ করে নিজের শরীরের ভেতর অারেকটা শরীর খোজার চেষ্টা করত।যে শরীর তার নয়,তা বহুবার স্পর্শ করে সে বুঝতে চেয়েছে।কেন এমন হয়? সেইবা কে? সে উত্তর পায়নি। বাবা- মা কোনদিন বুঝতে পারেননি, সন্তানের শরীরটা একজন ছেলের কিন্তু মানসিকতা একজন মেয়ের।

সাথীর দেহটা রয়েছে ঠিকই।কিন্তু মনের মৃত্যু হয়েছে অগনিতবার। এভাবেই ঘরে- বাইরে শত প্রতিকুলতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ও ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে।তারপর অার পড়াশোনা করতে পারেননি।ছাড়তে হয়েছে চিরচেনা সেই অাপন নীড়, বাবা- মা, পরিচিত ঠিকানা।হিজড়াদের দলে সে নাম লিখিয়েছে।সর্দার তার নাম রেখেছে সাথী।

ট্রেনে উঠার পর সাথীর দিকে যে দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম, পুরো গল্প শেনার পর অামার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল।পরিচিত জগত মুহুর্তেই অপরিচিত হয়ে উঠল।সাথী এখন পান খাচ্ছে।পরিবেশটাও খুব শান্ত।সবার মধ্যে এক অদৃশ্য নীরবতা এসে ভর করেছে।পান খেতে খেতেই সাথী বলল… অামরা হিজড়ারা সমাজ- সংসার, পরিবার- পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই অামরা হৃদয়ের জমানো কষ্ট ভুলতেই উদ্যত জীবনযাপন করি।মানুষের সাথে উশৃংখল অাচরন করি।রাস্তায়- দোকানে টাকা তুলি।অামরা অার কি করতে পারি? কেউ অামাদের কাজ দিতে চায়না, বুঝতে চায়না। অামাদের কি অপরাধ? সবাই শুধু ঘৃনাভরে দুরে ঠেলে দেয়! এ যন্ত্রনার ভার বহন করা এত সহজ নয়।

অনেকক্ষন পর অামি জিজ্ঞেস করলাম, অামরা তো প্রায় কাছাকাছি চলে অাসছি।অাপনারা কোথায় যাবেন?সাথী বলল.. সে একটা এনজিও তে কাজ করে। যেখানে হিজড়াদের শারিরিক ও মানসিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কাজ করা হয়।তাদের শেখানো হয় রাস্তায় কেমন করে চলতে হবে, মানুষের সাথে কিভাবে অাচরন করতে হবে।সাথী হচ্ছে এ দলের সর্দার।অন্যান্যদের গাইড করে সে নিয়ে যাচ্ছে এনজিওতে।

সব শোনার পর নিজের ভেতর এক ধরনের অপরাধবোধ জাগ্রত হল।কেন সাথীকে ঘৃনা করতাম।ট্রেনের এই স্বল্প সময়ের অালোচনায় অামার দৃষ্টিভন্গি সম্পুর্ন পাল্টে গিয়েছিল হিজড়াদের সম্পর্কে।ট্রেন থেকে যখন নামব, সাথী এগিয়ে এসে বলল… কখনও কোন হিজড়ার সাথে খারাপ ব্যবহার করনা।অসন্মান করনা।কোন হিজড়া যদি তোমার সাথে কখনও খারাপ অাচরন করে, তাকে বোন বলে একবার ডেকে বল…. বোন তুমি অামার সাথে কেন এরকম করছ? অামি তোমার ভাইর মত।

ট্রেন থেকে নেমে কিছুদুর হাটতেই মনে হল,সাথীকে কিছু কথা বলা দরকার।ওদের সম্পর্কে অামার পুর্বভাবনা ও সাথীর গল্প শোনার পর বর্তমান অবস্থা।অামি ট্রেনের দিকে যেতেই অাস্তে অাস্তে ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালা দিয়ে সাথী অামার দিকে তাকাল।মনে হল ও সবই বুঝতে পেরেছে। জোরে চিৎকার করে ভাল থেকো ভাই, বলে অামার দৃষ্টির অাড়ালে চলে গেল।অামি কিছুই বলতে পারলাম না।একজন সাথী হিজড়া চলে গেল। অার অামি অদেখা জীবনের সন্ধান পেয়ে নিজেকে পরিপুর্ন করলাম।

সিলেট ভ্রমনে অনেক কিছু দেখা হয়েছে।শাহজালালের মাজার- শাহপরানের মাজার- জাফলং- পিয়াইনের তীরে শহীদের স্তম্ভ-পিয়াইনের ঠান্ডা স্বচ্ছ জলের নিচে পাথর,সবকিছু ছাপিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে সাথী ও তার সংগ্রামী গল্প।

অামরা নিজেদের বিশ্বাস ও অনুভুতি দিয়ে অন্যকে বিচার করতে চাই। নিজেদের জীবনকে স্বাভাবিক মনে করি।বিপরীত কিছু সামনে এলেই প্রকৃতিবিরুদ্ধ মনে করি।বিকৃত মনে করি। অামরা জানতে চাই না, বুঝতেও চাই না; অামাদের চেনা- জানা গন্ডির বাইরেও জীবন অাছে।কিন্তু যে জীবন সাথীর তা প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়।কৃত্রিম নয়, বিকৃত নয়। সাথীর প্রকৃতি নির্ধারন করেছে অামাদেরই প্রকৃতি।তাকে জোর করে অামদের মত বানাতে গেলে সেটাই হবে প্রকৃতিবিরুদ্ধ।ওর জীবনটা একান্তই ওর।

যে জীবন অামাদের দেখার বাইরে,বোঝার বাইরে, উপলব্ধির বাইরে। সে জীবন সাথীদের,সে জীবন মানুষের………….সে জীবন অদেখা জীবন।

সর্বশেষ

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

নিউজ ডেস্ক: মিরপুরে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জয় লাভ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাইসউদ্দিনের ইন্তেকাল, বিসিবির শোক

স্পোর্টস ডেস্ক: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ-সভাপতি রাইসউদ্দিন আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।...

ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ক্রিকেটারদের জন্য ভ্যাকসিন আনা হবে: পাপন

স্পোর্টস ডেস্ক: বৃহস্পতিবার (২১জানুয়ারি) ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে ২০ লাখ করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার যে ভ্যাকসিন...

হোয়াইট হাউস ত্যাগ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক: প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষবারের মতো হোয়াইট হাউস ত্যাগ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আজ বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ১১টা ৫৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে...

জিতলেও ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই গেল

স্পোর্টস ডেস্ক: টিভি পর্দায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় দেখে অনেকে চিনতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে রঙ্গ-রসিকতাও হয়েছে।