36 C
Dhaka
Tuesday, January 19, 2021
No menu items!

পানের পাঁচালী

নির্তেশ সি দত্ত

পান পরিচিতি
‘যদি সুন্দর একটা মন পাইতাম- সদর ঘাটের পানের খিলি তারে বানায় খাওয়াইতাম…’ বাঙলা সিনেমার জনপ্রিয় এই গানে যে ‘সদর ঘাটের পানের খিলি’র কথা বলা আছে সেটা আসলে কোন অঞ্চলের পান? বিক্রমপুরের পান! প্রাচীনকাল থেকেই বিক্রমপুর ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ও বহুবিধ বিষয়ে বিখ্যাত। বিক্রমপুরের পানও বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী। এ অঞ্চলের পানের বিশেষত্ব এর চাষ ও উৎপাদন পদ্ধতিতে। মুন্সিগঞ্জ জেলার এই বিক্রমপুর অঞ্চলের টঙ্গীবাড়ি, সিরাজদিখান, লৌহজং, শ্রীনগর ও মুন্সিগঞ্জ উপজেলার প্রায় গ্রামেই বহুকাল ধরে পানের চাষ হয়ে আসছে। এখানে উন্নতমানের পান উৎপাদনের খ্যাতি বহির্বিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। পানের খামারের নাম ‘বরজ’ হলেও এর স্থানীরা বলে ‘বর’। প্রাচীনকাল থেকে বিক্রমপুরে ‘বাড়ৈ’ নামের একটি সম্প্রদায়ের লোকজন এই পান বরজ পেশার সাথে যুক্ত। সম্ভবত ‘বর’ থেকে ‘বাড়ৈ’ নামের সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। এরা মূলত সনাতন হিন্দু কায়স্ত জনগোষ্ঠী। পান গাছকে তারা পরম সম্মানের সাথে চাষ করে; এমন কী একে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজাও করে থাকে! বিক্রমপুরের বারই সম্প্রদায় শারদীয় শুক্লাপক্ষের নবম তিথিতে পানের বরজে পূজা দিয়ে থাকে। পার্টিশনের পর থেকে এই অঞ্চলে বারই সম্প্রদায়ের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকলে বিক্রমপুরে পানের বরজের খামারও কমতে থাকে। অবশিষ্ট সংখ্যালঘু এই বারই সম্প্রদায় এখনো পান চাষ পেশায় যুক্ত আছে। স্থানীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠী পান চাষ পেশায় যুক্ত থাকলেও বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী পান চাষ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে ।

পান হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একপ্রকার লতাজাতীয় উদ্ভিদের পাতা। পান পাতা দেখতে গোলাকৃতি, অপেক্ষাকৃত পুরো, রসালো এবং লম্বা বোঁটাযুক্ত। পান গাছের লতা পর্ব বা গাঁটযুক্ত শীর্ণকায় লতাজাতীয় দীর্ঘ উদ্ভিদ। পান গাছের লতাকে স্থানীয় পানচাষীগণ ‘পোয়ার’ বলে। এর দেহলতা নরম, নমনীয়, পুরো এবং রসালো। প্রতিটি পর্বে বা গাঁটে একটি করে পানপাতা হয়। একটি গাঁট থেকে আরেক গাঁটের মধ্যবর্তী দৈর্ঘ্য প্রায় দুই ইঞ্চি এবং প্রতিটি গাঁটের চারপাশে আকর্ষী (এক ধরনের বায়বীয় মূলজাতীয় রোম যা দিয়ে আঁকড়ে ধরতে ও রস শোষণ করতে পারে) থাকে যা দিয়ে অন্যান্য শক্তপোক্ত গাছ বা কোন অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে উপরের দিকে বেড়ে ওঠে। Piperaceae পরিবারভুক্ত পান গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Peper betle. অঞ্চলভেদে বিভিন্ন প্রজাতির পান দেখা যায়- মিঠাপান, সাঁচিপান, কর্পূরীপাম, গ্যাচপান, উজানীপান, মাঘীপান ইত্যাদি।

পান উৎপাদন
বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে পান চাষ হয়ে থাকে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের চাষ ও উৎপাদন পদ্ধতির জন্য বিক্রমপুরের পান অনন্য ও প্রসিদ্ধ। সাধারণত উঁচু ও সমতল জমির বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে পান খামার করা হয়। পানবরজ একটি ধারাবাহিক চাষ ও উৎপাদন পদ্ধতি। পান চাষ ও উৎপাদন বছরব্যাপী চলতে থাকে। সাধারণত জৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে পানের প্রাথমিক চাষ শুরু হয় এবং একবার চাষ শুরু করলে সেটা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। অর্থাৎ প্রতি বছরই নতুন করে পানগাছের চারা রোপণ করতে হয় না, একবার পানগাছ রোপণ করে কৃষকেরা ৫ থেকে ১০-১৫ বছর পর্যন্ত পানপাতা উৎপাদন করে থাকে।

চাষের শুরুতে বিস্তীর্ণ উঁচু জায়গা ভালোভাবে সমতল করে জমি প্রস্তুত করে নেওয়া হয়। তারপর সাধারণত ১৫ হাত দীর্ঘ সোজা লাইনে নির্দিষ্ট ব্যবধানে (আড়াই হাত) প্রায় চার বর্গইঞ্চি জায়গার চার কোণায় চারটি করে বাঁশের কঞ্চি খাড়া করে পুঁতে পাশাপাশি একটার পর একটা সারি তৈরি করা হয়। পাশাপাশি অবস্থিত সারিগুলির মাঝ দিয়ে চলাচলের জন্য সমান্তরালভাবে একটি সারি হতে আরেকটি সারির মাঝদিয়ে সর্বত্র সমানভাবে এক হাত জায়গা ফাঁকা থাকে যাতে ঐ ফাঁকা একহাত জায়গা দিয়ে পান পাতা পাখা মেলতে পারে এবং এর মধ্যদিয়ে একজনমাত্র মানুষ নানা রকম কাজ করার জন্য সহজেই চলাচল করতে পারে। সারিগুলিতে পাঁচ হাত দৈর্ঘের লম্বা বাঁশের কঞ্চি মাটিতে খাড়া করে ইঞ্চি দুই পুঁতে নিয়ে মাটি থেকে প্রায় চার-সাড়ে চার হাত উচ্চতায় মাচার চাল তৈরি করা হয়। দৈর্ঘ ও প্রস্থে কয়েক ধরনের বাঁশের কঞ্চি চিকন তার বা গুনা দিয়ে বেঁধে মাচার এই চাল তৈরী করা হয়। সবদিক থেকে সমান, সোজা ও দৃঢ় করার জন্য মাচা তৈরিতে মাপঝোঁকের গাণিতিক বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং এক্ষেত্রে হাতের দৈর্ঘ্য একক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একহাত পর পর পনের হাত দীর্ঘ এক একটি সারিকে স্থানীয়ভাবে ‘খান’ বলে। এরকম ৩০, ৪০, ৫০ থেকে ১০০টি খান নিয়ে তৈরি একটি মাচাকে এক কান্দি বলে। প্রতিটি কান্দিগুলি দেড় হাত দূরত্বে পাশাপাশি অবস্থান করে। এক বা একাধিক কান্দি নিয়ে এক একটি পানের খামার বা পানের বরজ তৈরি হয়।

মাচাকে যথেষ্ট মজবুত করতে সেই ১৫ হাত দীর্ঘ সারিগুলির বা খানের মাঝে মাঝে দীর্ঘ বাঁশের খণ্ড প্রায় এক হাত গভীর করে পুঁতে উপরের মাচার সাথে অপেক্ষাকৃত মোটা গুনা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। বাঁশ পুঁতে দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটা গাণিতিক হিসেব ব্যবহার করা হয় যাতে দীর্ঘ জায়গাজুড়ে সম্পূর্ণ মাচাটি সমানভাবে যথেষ্ট মজবুত হয় এবং ঝড়বৃষ্টিতে যাতে ভেঙ্গে না পড়ে। মাচার উপর ধান গাছের লম্বা নাড়া বা আখের পাতা বিছিয়ে এবং সম্পূ্র্ণ বরজের চারদিকে বেড়া দিয়ে সমস্ত খামারটিকে ছায়াবৃত করা হয়। পান চাষের জন্য এমন ছায়াছায়া পরিবেশ খুব জরুরী।

পুতে দেওয়া বাঁশের এইসব কঞ্চিকে চটি বলে। চটি দুই রকমের হয়, চিকন বা রাণীচটি ও মোটা বা গোড়ানো চটি। মোটা চটি বাঁশের নিচের বা গোড়ার অপেক্ষাকৃত পুরো অংশ থেকে অপেক্ষাকৃত মোটা করে তৈরি করা হয় যা মাচার ভার বহন করে আর রাণী চটি বাঁশের উপরের দিকের অপেক্ষাকৃত কম পুরো অংশ হতে এবং অপেক্ষাকৃত চিকন করে তৈরি করা হয় যাতে পানগাছের লতা আকর্ষী দিয়ে আঁকড়ে ধরে সহজে আরোহন করে উপরের দিকে বেড়ে উঠতে পারে। মাচা সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়ে গেলে মোটা চটি পোঁতা সারি বরাবর মাটি সামান্য উঁচু করে পালা তৈরি করে পান গাছের চারা রোপণ করা হয়। পানের চারা বরজে রোপণের পূর্বে বীজ তলায় চারা গাছ উৎপাদন করে নেওয়া হয়। পান গাছের লতা পানসহ দুই পর্ব করে কেটে বিশেষ পদ্ধতিতে বীজ তলায় পানের চারা উৎপাদক করা হয়। পর্বগুলোতে নতুন লতা গজালে সারিগুলোতে নির্দিষ্ট ব্যবধানে রোপণ করা হয়। নতুন পানলতা বেড়ে উঠলে সারিগুলোর দুই দিকে দুই-তিন ইঞ্চি দূরত্বে চিকন চটি পুঁতে তার সাথে উলু দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। একটি সারিতে বা খানে প্রায় ৮০ টি পান লতা একযোগে বেড়ে ওঠে।

আরো একটি উপায়ে পানের নতুন লতা জন্মানো হয়। মাচা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়া পান লতাকে মাটির নিচ থেকে কেটে আট-দশটি পানপাতাসহ সম্পূর্ণ লতাটি রোপণ করা হয়। এক্ষেত্র দুটি করে লতার পানবিহীন অংশ সারির বা খানের মাটি উঁচু করে বানানো পালার মধ্য বিছিয়ে নরম ও গুড়োমাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় আর আট-দশটি পানপাতাসহ লতার মাথাটি সমকোণে উপরের দিকে সারির আড়াই হাত পর পর পোতা কঞ্চিতে বেঁধে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে বিছিয়ে দেওয়া লতার প্রতিটি পর্ব হতে একটি করে নতুন চারা লতা গজিয়ে ওঠে। নতুন লতাগুলি বেড়ে উঠতে থাকলে সারির দুইদিকে চিকন চটি পুতে উলু দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এভাবেও একটি সারিতে বা খানে প্রায় ৮০ টি পান লতা সমান তালে বেড়ে ওঠে।

পানগাছ বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত বৃষ্টি অপরিহার্য। পানের উচ্চফলন পেতে পান গাছের গোড়ায় জৈবসার (খৈল ও গোবর সার) ব্যবহার করা হয়, কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। প্রতিটি লতায় সপ্তহে প্রায় দুইটি করে পর্ব বেড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে একটি লতায় দুইটি করে পানপাতার উৎপাদন হতে পারে। লতা যখন উপরের দিকে বেড়ে ওঠতে থাকে তখন প্রতিটি লতার নিচের থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি বা দুটি করে পানপাতা বোঁটাসহ তুলে নেওয়া হয়। এতে করে উপরের দিকে সমান সংখ্যাক পানপাতা থাকে। সাধারণত উপরের দিকে আট-দশটি পানপাতা রেখে সপ্তাহে এক বা দুই বার পানপাতা তোলা হয়। উপরের দিকে উঠতে উঠতে মাচা পর্যন্ত চলে গেলে লতাগুলোকে চটি থেকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে সারির দুইদিক পোতা চটিগুলোর মাঝখান বরাবর লতার কোনো অংশ না ভেঙ্গে লম্বা করে পেঁচিয়ে বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং লতার উপরের অংশের আট বা দশটি পর্বকে পানসহ আবার নির্দিষ্ট চটির সাথে বেঁধে দিয়ে উপরের দিকে বাড়তে দেওয়া হয়। পরে মাটি উপর বিছানো লতাগুলোকে নরম ও গুড়ো মাটি দিয়ে বেশ পুরো করে ঢেকে দেওয়া হয়। সেই মাটির উপর খৈলের গুড়ো ও গোবর সার মিশিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয় যা বিছিয়ে দেওয়া লতাগুলোর পর্বের মূলগুলো বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্য হিসেবে শোষণ করে। এই প্রক্রিয়ায় বৃষ্টি খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মাটির নিচের লতার প্রতিটি পর্ব থেকে নতুন লতাও গজায়। এভাবে বছরের পর বছর পানের চাষ ও পানপাতা উৎপাদন চলতে থাকে। আট-দশ বছর পরে পান গাছের দুর্বলতার কারণে পানপাতা ছোট হয়ে গেলে বা মূলকাটা রোগে বা ছত্রাকজনিত রোগে পান গাছ মরে গেলে বা মাটি বেশ উঁচু হয়ে গেলে পুনরায় মাটি সমতল করে একইভাবে নতুন মাচা তৈরি করে আবার নতুন পানগাছের নতুন চারা রোপণ করতে হয়।

সপ্তাহে এক বা দুই বার পানপাতা তোলে ছোট বড় বেছে আলাদা করে হাতের আঙ্গলের ফাঁকে রেখে বিশেষ পদ্ধতিতে পর পর পানপাতা গুছিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে একে ‘চিট্টা’ বলে। এক চিট্টায় ৪০ টি পান থাকে। দুই চিট্টাকে একত্র এক ‘বিড়া’ বলে। ৮০ বিড়ায় এক গাদি হয় এবং এই হিসেব মতে পান বেচাকেনা হয়। চিট্টাগুলোকে জলে ভালোকরে ভিজিয়ে আবার জল ঝেড়ে কলাপাতা গোল করে বিছিয়ে তার উপর চক্রাকারে সাজিয়ে ছটা দিয়ে বেঁধে প্যাকেট করা হয়। পানের এই সাজানো প্যাকেটকে ‘খোত’ বলে। পানের খোত তৈরি হয়ে গেলে বিভিন্ন হাটের পান আড়ৎগুলিতে পাইকারি বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে পাইকাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পান সরবরাহ করে। উন্নত বড় বড় পান ঢাকার সদরঘাটের পানের আড়ৎগুলিতেও বিক্রমপুরের পান বেচাকেনা হয়ে থাকে।

পান বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। উৎসব, পূজা-পার্বণ,বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং বিভিন্ন শহরের খিলিপানের দোকানে পানের বিপুল চাহিদা রয়েছে। পান চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা। বিক্রমপুর ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পানের চাষ হয়। মানিকগঞ্জ, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, জামালপুর, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানের চাষ হয়। বর্তমানে পান চাষে যুক্ত হয়েছে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক প্রযুক্তি। বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র উচ্চফলনশীল, বিভিন্ন গুণাবলিসম্পন্ন এবং রোগ-প্রতিরোধে সক্ষম বারিপান-১, বারিপান-২ এবং বারিপান-৩ নামে তিনটি পানের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের পান বিদেশে রপ্তানীও করা হয়৷ পাকিস্তান, ভারত, সৌদিআরব, আরব-আমিরাত, ইংল্যান্ড, ইতালি, জার্মানিসহ এশিয়া- ইউরোপের অনেক দেশে পান রফতানি হয়ে থাকে।

পানে ব্যবহার
‘ঘাটে লাগাইয়া নৌকা পান খাইয়া যাও মাঝি আল্লার দোহাই…’ পান খাওয়া বা খাওয়ানোর মধ্যে যে আন্তরিক হৃদ্যতা তা বাঙলা সংস্কৃতির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। পান নিয়ে বাঙলাভাষা বহু গান, গল্প ও প্রবাদ-প্রবচন রয়েছে। পান শুধু বাঙালির নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম অনুসঙ্গ। পানের প্রচলন বহু প্রাচীন। বৈদিক যুগেও পানের ব্যবহার ছিল বলে শোনা যায়। সনাতন হিন্দুদের পূজাপার্বণ ও বিয়েতে পান পান প্রধান অর্ঘ্য। ধারণা করা হয় আর্যগণ প্রথম খিলি পান পরিবেশনের প্রচলন করেন। পরে এই রীতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। উপমহাদেশের বাইরে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি ইউরোপেও পান খাওয়ার রীতি রয়েছে। নেপাল ভুটানসহ প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লোকজনের মাঝে পানের প্রচলন বেশি। উৎসবে, পূজায় পুণ্যাহে, বিবাহে; বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পান এ অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিঃশ্বাসকে সুরভিত করা এবং ঠোঁট ও জিহ্বাকে লাল করার জন্য আর্য ও আরবগণ পান খাওয়ার প্রচলন করে।রাজা-বাদশাহদের পান খাওয়ার ঐতিহ্যও হাজার বছরের পুরোনো। যুগে যুগে রাজা-বাদশাগণ সিংহাসনে বসে শাহি মশলাযোগে পান খেতেন। পাশে পিকদান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত দাস-দাসী।বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-আচরণের অংশ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই পানের ব্যবহার চলে আসছে। পান গ্রাম বাংলায় ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে পান এখনও অপরিহার্য। জমিদাররা তাদের বৈঠকখানায় মজমা বসিয়ে পান খেতেন। এখনও গ্রাম্য সালিশে বা খোশ গল্পের আসরে পান পরিবেশনের রীতি দেখা যায়। গ্রামে গঞ্জের পাড়ায় পাড়ায় মহিলাদের আড্ডায় পানের বাটায় পান-সুপারির উপস্থিতি এখনো দেখা যায়। এছাড়া কোন কোন অনুষ্ঠানে পান পরিবেশন দ্বারা অতিথি প্রস্থানের সময় ইঙ্গিত করা হয়। বাংলার আতিথেয়তার উপসংহার পানের দ্বারাই টানা হয়।

পান সাধারণত চুন, খয়ের ও সুপারি সহযোগে পরিবেশন করা হয়। পানের সাথে কেউ কেউ তামাক বা জর্দাও খেয়ে থাকেন। অনেকে ধনিয়া, এলাচি, দারুচিনি ও নানা রকম সুগন্ধি মসলা মিশিয়ে পাম খায়। কেউ কেউ এসব মসলা ছাড়াও পান খেতে পছন্দ করেন। সাধারণত: আহার গ্রহণ শেষে চুন সুপারি খয়ের সহযোগে পান মুখে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চিবিয়ে চিবিয়ে পানের রস খাওয়া হয়। কেউ কেউ শুধু চিবিয়ে পানের পিক ফেলে দেয়। বয়স্কদের মধ্যে যাদের দাঁত নেই, তারা পান সুপারি ইত্যাদি থেতলে খেয়ে থাকেন। শহরের বড় বড় রেস্তোরায়ও পান পরিবেশন করা হয়। এছাড়া শহরে গঞ্জে অলিতে গলিতে খিলি পানের দোকানে বহুবিধ সুগন্ধি মসলাযোগে পানের খিলি বিক্রি করা হয়। পাড়া মহল্লার বিড়ি সিগারেটের দোকানেও খিলি পান বিক্রি হয়। হাটে-বাজারে বাসাবাড়িতে খাওয়ার জন্য পান-সুপারির আলাদা দোকান রয়েছে। সেখানে বিড়া হিসেবে পান বিক্রি হয়।

পান খাওয়ার কিছু সুবিধা রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে- পান বলকারক ও কাম উদ্দীপক। পানের রস রাতকানা রোগ নিরাময়ে সহায়ক। পান মুখের দুর্গন্ধ দূর করে ও হজমশক্তি বাড়ায়। উকুননাশক হিসেবেও পানের রস কাজ করে। এছাড়া সুপারিতে রয়েছে মুখের জীবাণুনাশক ও কৃমিনাশক শক্তি। চুনের ক্যালসিয়াম পাকস্থলির পরিপাক শক্তিবর্ধক, যৌন উদ্দীপক, রক্ত পরিষ্কারক। খয়েরে আছে রক্তবর্ধক ও পরিষ্কারক আয়রন। তবে পান খাওয়ার অপকারিতা অনেক। প্রথম প্রথম পান খেলে পানের রসে ঠোঁট ও মুখের ভিতরের নরম ও সেনসেটিভ কোষ পুড়ে যায় বা ক্ষয় হয় এবং মুখে জ্বালপোড়া হয়। কখনো কখনো মাথাঘোরা, ঘাম, এমনকি বমিও হতে পারে। এতে ক্ষুধামন্দা হয়। দীর্ঘদিন পান খেলে দাঁত কালো হয়ে যায়, ঠৌঁটে ও মুখের ভেতর কালো দাগ পড়ে এবং অসুন্দর দেখায়। যেখানে-সেখানে পানের পিক ফেলায় পরিবেশ দূষিত হয়। অতিরিক্ত পান খেলে হাঁপানি, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, এমনকি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। জর্দার নিকোটিন এবং সুপারি নেশার উদ্রেক করে। পানের সাথে চুন খেলে তা পিত্তথলিতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। ধারণা করা হয়, পান-সুপারি মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন নিয়মিত পান খেলে মুখে, জিহ্বায়, খাদ্যনালিতে এবং পাকস্থলিতে ক্যান্সার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ

জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে র‌্যাবের হটলাইন চালু

নিউজ ডেস্ক: জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চালু হচ্ছে RAB এর হট লাইন। সোমবার ( ১৭ জানুয়ারি) র‌্যাবের পক্ষ থেকে এ তথ্য...

ভারতের উপহারের ২০ লাখ ডোজ টিকা আসছে ২০ জানুয়ারি

নিউজ ডেস্ক: আগামী বুধবার (২০ জানুয়ারি) ভারত থেকে ২০ লাখ টিকা বাংলাদেশে আসবে। অক্সর্ফোড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার এ টিকা ভারত সরকার বাংলাদেশকে উপহার দিচ্ছে। বিষয়টি...

আইনের শাসন সুসংহত করতে বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে

নিউজ ডেস্ক: সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে জাতীয় সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি...

সংসদে যাদের নামে শোক প্রস্তাব আনা হলো

নিউজ ডেস্ক: জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সাবেক একজন ডেপুটি স্পিকার, সাবেক একজন মন্ত্রী, সাবেক দুজন প্রতিমন্ত্রী, সাবেক নয়জন সংসদ সদস্যদের নামে শোক...

হাসানুল হক ইনু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত

নিউজ ডেস্ক: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি এবং সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সোমবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে...