36 C
Dhaka
Saturday, January 23, 2021
No menu items!

আগামী পৃথিবী এবং ভবিষ্যতের মানুষ

বিভুরঞ্জন সরকার

করোনাকালে আমার বড়ো সমস্যা, একেবারেই ঘুম হচ্ছে না। না রাতে, না দিনে। রাতে বিছানায় গিয়ে বালিশে মাথা রেখে চোখ বুজলেই মনে হয় এক গভীর অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। চোখ খুলি। না, অতলে কই, খাটেই তো আছে শরীর।

মন বিক্ষুপ্ত হয়। উঠে দাঁড়াই। ঘরে পায়চারি করি। বারান্দায় গিয়ে চোখ রাখি আকাশে, সামনের ভবনে এবং নিচের জনহীন রাস্তায়। আকাশে চাঁদ দিব্যি জোছনা বিলাচ্ছে, সামনের ভবনগুলোও আলোহীন নয়। নিচের রাস্তা সুনসান নীরবতায় মোড়া কিন্তু আঁধারে ঢাকা নয়। তার মানে সব কিছু অন্ধকার নয়, আলো আছে, কাছেও, দূরেও।

তাহলে আমি কেন ঘুমুতে পারি না? আমি কি মৃত্যু ভয়ে ভীত? করোনার করাল থাবা অথবা খাবার অভাবে মৃত্যুচিন্তা কি আমাকে বিহ্বল করেছে? আমি কি দুর্ভাবনায় কাতর হয়ে মরার আগেই মরে আছি? না। মৃত্যু ভয় আমার নেই। আমি নিশ্চিত জানি মৃত্যু আমার হবেই। আজ অথবা কাল। অথবা আরো কয়েকটি দিন পর।

তবে আমি একটু অন্য রকম মৃত্যু চাই। সুখের মৃত্যু, আনন্দের মৃত্যু। কাউকে কষ্ট না দিয়ে, নিজে কষ্ট না পেয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে জমাটি আড্ডায় বসে অথবা রাতের ঘুমের ঘোরে। জানি না, আমার মৃত্যু এমন হবে কিনা। আমার কোনো ইচ্ছাই পূরণ হয় না। মৃত্যু-বাসনাও কী আমার মতো করে পূরণ হবে?

দুর্যোগ-দু্র্বিপাকে পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যু আগেও অনেক হয়েছে। শত বছর আগেই তো মারণব্যাধিতে পাঁচ কোটি মানুষের জীবন গেছে। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো দেড়শ কোটি। দেড়শ কোটি মানুষ পাঁচ কোটি মানুষ হারানোর বেদনা-কষ্ট সহ্য করতে পেরেছে। এখন পৃথিবীতে সাড়ে সাতশ কোটি মানুষের বাস। হিসাব মতো পঁচিশ কোটি মানুষের মৃত্যুশোক বহন করার ক্ষমতা মানব জাতির থাকার কথা!

না, করোনাভাইরাস যতোই বেপরোয়া, লাগামহীন হোক না কেন, কোটি কোটি মানুষের জীবন হরণের ক্ষমতা তার হবে না। এই অদৃশ্য অসীম শক্তিধর মানবশত্রুকে বোধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে। দেশে দেশে করোনাবধের কৌশল-হাতিয়ার খোঁজা চলছে। হাতিয়ার আবিষ্কারে মানুষের জুড়ি নেই।অবশ্য প্রাণ রক্ষার চেয়ে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার উদ্ভাবনে মানুষ বেশি পারঙ্গম।

জীবন রক্ষার গুরুত্ব যদি দুনিয়াকে করতলে রাখার খায়েশি শাসককূলের থাকতো, তাহলে আজ এমন বেসামাল অবস্থা হতো না। টাইটানিক জাহাজ যখন ডোবে তখন তাতে যাত্রী সংখ্যার চেয়ে লাইফজ্যাকেটের সংখ্যা কম ছিলো। এখন আমার ভাবনা জুড়ে আছে যে, আমি না থাকলেও এই পৃথিবী থাকবে, থাকবে মানুষ। সূর্য উঠবে। রাতের আকাশে থাকবে তারার মেলা।

প্রশ্ন হলো, কেমন হবে আগামী পৃথিবী? কেমন হবে ভবিষ্যতের মানুষেরা? আগামীর পৃথিবী কী সব মানবশিশু, সব মানুষের বাসযোগ্য হবে? ভবিষ্যতের মানুষেরা কী হবে আরো বেশি উদার, মানবিক, কুসংস্কারমুক্ত এবং বিজ্ঞান মনস্ক?

আগামীর পৃথিবীটা যে অধিকতর বাসযোগ্য হবে তার কিছু নমুনা-লক্ষণ কিন্তু এখনই দেখা যাচ্ছে। কলকারখানা, গাড়িঘোড়া, মানুষের চলাচল বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় পরিবেশের দূষণমাত্রা কমে এসেছে। হিমবাহের বরফগলা কমছে। আকাশ নীল দেখা যাচ্ছে। সাগরতীরে ডলফিনের আনাগোনা বাড়ছে। সমুদ্রের পানির স্বচ্ছতা দৃশ্যমান। পরিষ্কার আকাশে চক্কর দিচ্ছে চিল, হায় চিল সোনালি ডানার চিল।

এ রকম আরো কিছু দিন চললে, কয়েক মাস চললে ধরিত্রী প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে পারবে। মানুষের শ্বাসযন্ত্র বিকল করছে করোনা আর ধরণীর বুক হচ্ছে স্বচ্ছতায় প্রসারিত। ধুঁয়াহীন বাতাসে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রবাহ এইভাবে অব্যাহত থাকলে আগামীর পৃথিবী নতুন তো হবেই।

আমরা মানুষেরা কী অনাচারটাই না করেছি পৃথিবীর ওপর। পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে দিয়েছি কয়েকশ প্রজাতির জীব। আমাদের সৌখিনতা ও দুর্বুদ্ধিতার কারণে বলি হয়েছে কতো নীরিহ প্রাণী। আমাদের কৃতকর্মের জন্যে হারিয়ে যেতে বসেছে শকুন, যাকে কিনা বলা হয় প্রকৃতির ‘ঝাড়ুদার’। আমরা এখন কান পাতলে শুনতে পাই না কোকিলের কুহুরব, দোয়েলের শিস, লক্ষ্মীপেঁচার ডাক, চোখ মেললে দেখি না চড়ুই-শালিকের নাচানাচি।

করেনার ভয়ে আজ আমরা যখন ঘরবন্দী, তখন পশু-পাখিরা মুক্ত। ওদের এই মুক্ত জীবন দীর্ঘায়িত হলে আগামীর পৃথিবী আরো রূপময়, বর্ণময় এবং সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

কিন্তু কেমন হবে ভবিষ্যতের মানুষ? সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। একবার মনে হয়, ভবিষ্যতের মানুষ হবে, মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। আবার না মনে হয়, না ভবিষ্যতের মানুষ আরো বেশি অমানুষ হবে। মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর, কুচুটে, বিদ্বেষপরায়ণ, সংকীর্ণ এবং একচোখা, একরোখা। উদারতা, মানবিকতা শিখতে হয়। মানুষের জন্ম হয় নগ্নভাবে। মানুষ ক্রমাগত পরিচর্যায় এবং শিক্ষায় হয়ে ওঠে মার্জিত, পরিপাটি। করোনার মতো মহামারি মোকাবিলা করে মানুষ কী ভালো মানুষ হয়ে উঠবে?

অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের মধ্যে মানবিকতা, উদারতা, সহমর্মিতা বাড়বে নাকি মানুষ আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে উঠবে দেখার।বিষয় সেটি। দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কিন্তু মানুষের হৃদয়বৃত্তি, চিত্তবৃত্তিকে সেভাবে পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেনি। জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের চেয়ে মারণাস্ত্র উৎপদনেই কিন্তু ব্যয় হয়েছে বেশি অর্থ। সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছে। অসাম্য ও অন্যায্যতা বেড়েছে। অন্যের ‘হক’ কেড়ে নেওয়ার দুরভিসন্ধি বেড়েছে। শিক্ষার প্রসার হয়েছে কিন্তু ধর্মান্ধতা কমেনি। উদারতার বিস্তার না হয়ে হিংসার প্রসার ঘটেছে। এই অবস্থায় বলা মুস্কিল যে, ভবিষ্যতের মানুষ আসলে কেমন হবে।

তবে আমার মনে হয়, কোন ধরনের বা কেমন প্রকৃতির মানুষ শেষ পর্যন্ত বেশি সংখ্যায় বেঁচে থাকবেন, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর কবরে ভবিষ্যতের মানুষ কেমন হবে। যাদের মধ্যে স্বার্থপরতা সীমাহীন, যারা নিজের ছাড়া অন্যের ভালো চায় না, যারা উগ্র – তারাই যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে এটা বলা যাবে না যে ভবিষ্যতের মানুষ সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে নতুন সূর্যোদয়কে ‘এসো এসো’ বলে স্বাগত জানাতে পারবে। তারপরও আমার আশা : মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।

আজ না হোক কাল করোনা পরাজিত হবে। বিজ্ঞান সফল হবে। আজ যা যা বেঠিক, আগামীর পৃথিবীতে তার সব না হলেও অনেক কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ভালো থাকুন সবাই। সব মানুষের মঙ্গল হোক।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ

বিবিএসের খানা জরিপ: দেশে ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র

নিউজ ডেস্ক: করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। দেশব্যাপী খানা পর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে এই তথ্য...

কারাগারে নারীর সঙ্গে বন্দির সময় কাটানোর ঘটনায় জড়িতরা শাস্তি পাবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, কারাগারে নারীর সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সময় কাটানোর ঘটনায় জড়িতরা বিধি অনুযায়ী শাস্তি পাবে। শনিবার একটি...

লন্ডন ফেরতদের কোয়ারেন্টাইনের সময় ৭ দিন বাড়লো

নিউজ ডেস্ক: লন্ডনফেরত যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের সময় চারদিন থেকে বাড়িয়ে আবার ৭ দিন করা হয়েছে। মাত্র ৮ দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলো...

কলকাতায় মোদি, মমতার সঙ্গে বিরল ছবি

নিউজ ডেস্ক: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিবস উপলক্ষে কলকাতা পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী । শনিবার স্থানীয় বিকেলে তিনি কলকাতা পৌঁছেন।

অন্ন বস্ত্রের সমাধানের পর গৃহহীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা : তথ্যমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, মানুষের তিনটি মৌলিক চাহিদা, অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থান। বঙ্গবন্ধু...