36 C
Dhaka
Tuesday, January 19, 2021
No menu items!

বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির সমতায়নে জাদুঘরের ভূমিকা

দিবাকর সিকদার

আজ ১৮ মে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস্ (ICOM) ১৯৭৭ সালে ১৮ মে কে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই সারাবিশে^র জাদুঘরসমূহে এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হয় ( ICOM: ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশ্বের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমূহের সংরক্ষণ, ধারাবাহিকতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করার নিমিত্তে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এর সদর দপ্তর ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যপ্রণালী সম্প্রসারিত করেছে। বর্তমানে সারাবিশ্বের প্রায় সমস্ত জাদুঘরের কর্মকান্ডের সঙ্গে সংস্থাটির সম্পৃক্ততা স্থাপিত হয়েছে বলা যায়)।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উদ্যাপনের জন্য ICOM একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে, যা আন্তর্জাতিক জাদুঘর সম্প্রদায়ের পেশাগত কোনো ভিত্তিকে প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস-২০২০ উদ্যাপনের জন্য প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘Museums for Equality: Diversity and Inclusion’। বাংলায় আমরা বলতে পারি এভাবে – ‘সাম্যের জন্য জাদুঘর: বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি’। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ক্ষেত্রে এই প্রতিপাদ্য বিষয়টির সম্পৃক্ততা আলোচনাই আমার উদ্দেশ্য।

প্রতিবাদ্য বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মকা-ের মধ্যে সমতা বিধান করা জাদুঘরের কাজ। এবার আসা যাক ‘বৈচিত্র্য’ শব্দটির বিশ্লেষণে। বৈচিত্র্য বলতে আমরা কী বুঝি? জাদুঘর কর্মকা-ের সঙ্গে এটি কতটা সম্পৃক্ত? জাদুঘর কর্মকা-ের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা কতটুকু? এক্ষেত্রে আমার অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট, বৈচিত্র্য হলো একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে এগিয়ে যাবার বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-কে গতিশীল করার সবচেয়ে বড় রসদ। ‘অন্তর্ভুক্তি’ শব্দটিও বৈচিত্র্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে আছে। অন্তর্ভুক্তি হলো বৈচিত্র্যের পূর্বশর্ত। অন্তর্ভুক্তি ছাড়া বৈচিত্র্য অসম্ভব। অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বৈচিত্র্য পূর্ণতা পায়, আর বৈচিত্র্যের পর্যাপ্ততায় অন্তর্ভুক্তি পায় স¦ার্থকতা।
এবার আসি জাদুঘর কর্মকা-ের সঙ্গে এ দুটি শব্দের সম্পৃক্ততা বিষয়ে। জাদুঘরের সামগ্রিক কর্মযজ্ঞের সাথে এই শব্দদুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় আমি তুলে ধরতে চাই।

প্রথমত, নিদর্শন সংগ্রহ প্রসঙ্গ। নিদর্শন হচ্ছে জাদুঘরের প্রাণ। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক এই নিদর্শন দেখবার জন্যই কিন্তু জাদুঘর পরিদর্শনে আসেন। একটি উৎকৃষ্ট বা ভালোমানের জাদুঘরের পূর্বশর্তই হলো তার সমৃদ্ধ সংগ্রহভা-ার। এদিক থেকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর একটি সমৃদ্ধ জাদুঘরের দাবী রাখে। জাদুঘরের সংগ্রহভা-ারে বিরানব্বই হাজারেরও বেশি নিদর্শন রয়েছে। প্রতিনিয়ত আমাদের সংগ্রহভা-ারে নতুন নতুন নিদর্শনের সংগ্রহভুক্তিও অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া আমাদের সংগৃহীত নিদর্শনসমূহের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। আমাদের সংগ্রহে যেমন ভাস্কর্য, প্রাচীন পা-ুলিপি, টেরাকোটা, ধাতব মুদ্রা ও পদক, মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন, অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গৃহব্যবহার্য সামগ্রি, পুতুল, কাচপন্য, খনিজ দ্রব্য, উদ্ভিজ ও প্রাণীজ নিদর্শন, পেইন্টিং ও অন্যান্য শিল্পকর্ম। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নিদর্শনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমেই নিদর্শনের বৈচিত্র্য চলমান রয়েছে। তবে নিদর্শন অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই বৈচিত্র্যের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে, কারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ নিদর্শনের উপস্থিতিই একটি জাদুঘরকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নিদর্শন উপস্থাপনা। গ্যালারিতে নিদর্শন উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রতিনিয়ত মৌলিক গবেষণা অব্যাহত রেখে গ্যালারিতে নতুন নতুন নিদর্শন প্রদর্শনের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে এবং সেক্ষেত্রে বৈচিত্র্যপূর্ণ নিদর্শনের প্রদর্শনী নিশ্চিত করতে হবে। যদিও নিদর্শন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে জাদুঘরে স্থানগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংগৃহীত নিদর্শনের মাত্র ৪% দর্শকদের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জাদুঘর সম্প্রসারণের যে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে, সেটি সম্পন্ন হলে আরও নতুন নতুন নিদর্শন উপস্থাপনের মাধ্যমে নিদর্শনের বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্ভারকে আরও সমৃদ্ধ করা যাবে।

তৃতীয়ত, গ্যালারিসজ্জা ও আলোকসম্পাত। এটি স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে, এই জায়গাটিতে জাদুঘরের সীমাবদ্ধতা অত্যন্ত প্রকট। উন্নত বিশে^র জাদুঘরের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হলে গ্যালারিসজ্জায় বৈচিত্র্য আনা অত্যন্ত জরুরী। সেই সঙ্গে গ্যালারিতে রঙের ব্যবহার এবং নিদর্শনের প্রকৃতি অনুযায়ী আলোকসম্পাতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে জাদুঘরের ৩৫ নম্বর গ্যালারিতেই শুধুমাত্র উন্নত বিশে^র জাদুঘরসজ্জার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। অন্যান্য গ্যালারি এখনও সেই সনাতন পদ্ধতির সজ্জায় সজ্জিত রয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে গ্যালারিসজ্জার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনয়ন করতে হবে, যেন সেগুলি সহজেই দর্শক/গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

চতুর্থত, জনবলের বৈচিত্র্য। জনবলের ক্ষেত্রে জাদুঘরের যে বৈচিত্র্য তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। এখানে বিভিন্ন কিউরেটোরিয়াল বিভাগে রয়েছে কাজের ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ জনবল। এর ফলে জাদুঘরের সামগ্রিক কর্মকা-ে এসেছে গতিশীলতা। এখানে নিদর্শনকেন্দ্রিক কিউরেটোরিয়াল বিভাগ ছাড়াও জনশিক্ষা বিভাগ, সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ, প্রশাসন ও হিসাব শাখা, নিরাপত্তা শাখা, প্রকৌশল শাখা, ডিসপ্লে শাখা, প্রকাশনা ও অডিটোরিয়াম শাখা প্রভৃতি সম্মিলিতভাবে বহুবিধ কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে থাকে। তবে এতকিছুর মাঝেও কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে। আইসিটি ও আর্কাইভ শাখায় অনুমোদিত জনবলের অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, সামগ্রিক কর্মকা-ের বৈচিত্র্য। জাদুঘরে যতগুলো বিভাগ ও শাখা রয়েছে তাদের প্রত্যেকটির কর্মকা-ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সবগুলোই স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ কার্য সম্পাদন করে জাদুঘরের সামগ্রিক কর্মকা-ের চাকা সচল রেখে চলেছে। জাদুঘর নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করছে, নিদর্শনের পরিচর্যা ও গ্যালারি সজ্জিতকরণের কাজ করছে, আবার নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কাজ, প্রকাশনা, আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র ধারণের কাজ এবং জনশিক্ষামূলক কাজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজটিও সুচারুভাবে সম্পন্ন করছে। জাদুঘরে নিয়মিত স্কুল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভ্রাম্যমান প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি বাস ছিল। বর্তমানে এই বৈচিত্র্যপূর্ণ কার্যক্রম দুটি বন্ধ রয়েছে। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই কার্যক্রম দুটি পুনরায় জাদুঘর কর্মকা-ে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে জাদুঘরের বৈচিত্র্যময় কর্মযজ্ঞে নতুন দুটি বৈচিত্র্য পুনরায় সংযুক্ত হবে এবং অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যের মধ্যে রক্ষিত হবে সাম্য।

ষষ্ঠত, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অর্গানোগ্রামে সেন্টার ফর আর্ট হিস্ট্রি অ্যান্ড মিউজিওলজি নামক একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে বলা আছে। কিন্তু অদ্যাবধি এটি চালু করা সম্ভব হয় নি। এই গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব হলে জাদুঘরের বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মকা-ে যুক্ত হবে একটি নতুন অধ্যায়। এর মাধ্যমে জাদুঘর সংক্রান্ত গবেষণা এবং জাদুঘর সংশ্লিষ্ট কর্মকা- বিষয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব হবে। ফলে জাদুঘর বিষয়ে জনগণকে আরও বেশি সচেতন এবং জাদুঘর পরিদর্শনে অধিক সংখ্যক দর্শককে আগ্রহী করে তোলা যাবে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বিপুল সংখ্যক নিদর্শনের এক বিশাল সংগ্রহভা-ার। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার মাধ্যমে জাদুঘরে আগত দর্শনার্থী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে হাজার বছরের গৌরবগাঁথা ও জাতীয় বীরদের সাথে পরিচিত করে তোলার উদ্দেশ্যে জাদুঘর নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাজীবীদের মূল্যবান পরামর্শ, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গের অগ্রণী ভূমিকা, বিদ্যোৎসাহী ও গবেষকগণের প্রজ্ঞা, উপহারদাতাদের অবদান, সুহৃদদের সহযোগিতা এবং জাদুঘরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাদুঘরের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক, এই প্রত্যাশা রইলো।

সর্বশেষ

টিভিতে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ নেই: তথ্যমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, টেলিভিশনে প্রতারণামূলক কোনো বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ নেই। জাতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বিভিন্ন প্রকার রোগের...

সরকার ভ্যাকসিন নিয়ে লুটপাটে নিমগ্ন হয়েছে: ফখরুল

নিউজ ডেস্ক: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এই সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা ভ্যাকসিন নিয়ে লুটপাটে...

এইচএসসির পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে সংসদে তিনটি বিল উত্থাপিত

নিউজ ডেস্ক: করোনাকাল হওয়ায় পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে সংসদে তিনটি বিল উত্থাপিত হয়েছে। এসব বিল দ্রুত পাস...

সাঈদ খোকনের নামে এক মামলা খারিজ, আরেকটি প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক মেয়র সাঈদ...

সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের মহাতারকা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ

নিউজ ডেস্ক: মাস্ক নেই কেন, কাকু?‘আমার ৮৫ বছর হয়ে গেল! আমার আর মাস্ক পরে কী হবে? নতুন করে কী আর সচেতন হব?...