36 C
Dhaka
Friday, January 22, 2021
No menu items!

‘মানুষের জীবনের প্রয়োজনটা অনেক বেশি’

বিভুরঞ্জন সরকার

প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস ব্রিফিং থেকে করোনা পরিস্থিতির আপডেট তথ্য দেশবাসী জানতে পারছেন। কতজন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, সুস্থ হচ্ছেন, কোয়ারেন্টিন-আইসোলেশনে থাকছেন, ছাড়া পাচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন কতজন – এসব তথ্যই প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় বা প্রশ্ন শুরুতে যতটা জোরালো ছিল, এখন সম্ভবত তা নেই । তবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যেমন মৃত্যুর ঘটনা আছে, তেমনি করোনার লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়েও অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। এই তথ্যটা সঠিক জানা যাচ্ছে না। মারা যাওয়ার পরেও জানা যাচ্ছে যে মৃত্যুর কারণ করোনা। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বেলায়ও তাই হলো।

এই সময় অন্য রোগে, বিশেষ করে হৃদরোগে হুটহাট করে অনেকেই মৃত্যুবরণ করছেন। তাই মৃত্যু, শোক, বেদনা – এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এর সঙ্গেই আমাদের অভ্যস্ত হতে হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি মৃত্যু হারও বাড়ছে। তবে ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হওয়ায় কারো কারো মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি লক্ষ করা যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি কর্মকাণ্ড বিষয়ক পরিচালক মাইকেল রায়ান বলেছেন, করোনাভাইরাস হয়তো কখনই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় হবে না। বিশ্বজুড়ে সব মানুষকে এর সঙ্গে লড়ে বেঁচে থাকা শিখতে হবে। এ ভাইরাসজনিত রোগটি কতদিন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে, তা নিয়ে পূর্ব ধারণা করা ঠিক হবে না। এটি ঠেকাতে ব্যাপক চেষ্টা চালাতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা মনে করছে, করোনাভাইরাস দীর্ঘসময়ের সমস্যা হয়ে থেকে যেতে পারে, আবার তা না-ও হতে পারে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক অবশ্য মনে করেন, করোনাভাইরাস ‘ভয়ানক’ কিছু নয়। তিনি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশে অনেক রোগ আছে, যেসব রোগে প্রতিদিন অনেক লোক মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু পারতপক্ষে এ রোগ, এ ভাইরাস সেভাবে ভয়ানক নয়। অন্তত বাংলাদেশে সেভাবে মৃত্যু ঘটছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। মানুষ ভাবতে পারে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন করোনাভাইরাস নিয়ে শঙ্কিত নন, তাহলে আর সাধারণ নাগরিকদের অতো চিন্তার কি আছে! কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিন্তু আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাবধান-সতর্ক না হলে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা অনেক বাড়তে পারে, যার লক্ষণ গত কদিন থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেছেন, আমাদের অসতর্কতা, অসচেনতা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে আমরা ঝুঁকির দিকে যাচ্ছি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিও কঠোর নজরদারির মধ্যে আনা দরকার। এই দুই ক্ষেত্রেই গাফিলতি এবং সমন্বয়হীনতা আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য মানুষকে সব সময় বিরক্ত করে, হতাশ করে, বিভ্রান্ত করে। তিনি যেভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তা পরিস্থিতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান। মানুষকে ভয় না পাওয়ার জন্য, সাহস জোগানোর জন্য এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা উচিত নয়, যা মানুষকে উল্টো ‘ইরিটেট’ করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনেক সমালোচনা হয়েছে, তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে কিন্তু তিনি বোধহয় প্রতিজ্ঞা করেছেন, যেমন ছিলেন তেমন রবেন, একটুও বদলাবেন না !

দুই.
সরকারের পক্ষ থেকে হতদরিদ্র মানুষদের জন্য সহায়তা কার্যক্রম ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কোনো মানুষ যেন না খেয়ে কষ্ট না পায়, বিনা চিকিৎসায় যেন না কষ্ট পায়, সেদিকেও আমরা দৃষ্টি দিচ্ছি’। ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। না খেয়ে থাকার অবস্থা এখনই দেশে হয়নি। তবে সমস্যা অবশ্যই আছে। কেবল শ্রমজীবী মানুষ, স্বল্প আয়ের মানুষ, অনির্ধারিত আয়ের মানুষ, পরিবহন কর্মী, ছোট দোকানদার, ছোট কারখানার কর্মী, ধোপা, নাপিত, হকার ইত্যাদি পেশার মানুষেরই সহয়ায়তা প্রয়োজন তা কিন্তু নয়। মধ্যবিত্ত অনেক পরিবার আছে, যারা মুখ ফুটে বলতে পারেন না, হাত পেতে চাইতে পারেন না কিন্তু অভাব তাদেরও আছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলন, এই শ্রেণির মানুষের কাছেও সহায়তা পৌঁছানো হবে। কীভাবে সেটা হবে বা হচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সেজন্যই কাদের বা কোন কোন জনগোষ্ঠীর সাহায্য-সহায়তা প্রয়োজন তার একটি নির্ভুল তালিকা জরুরিভাবে করতে হবে। এটা করা খুব সহজ কাজ নয়। তবে কিছুটা কঠিন হলেও তা করতে হবে। না হলে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে অসন্তোষ থাকবে এবং অভিযোগও উঠতেই থাকবে। নিশ্চয়ই সব মানুষকে খুশি করা যাবে না। কারো পক্ষেই সেটা সম্ভব নয়। ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিয়োগ উঠলে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অর্ধ শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে এরমধ্যেই বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও আছেন। অন্যদিকে এটাও শোনা যাচ্ছে যে, কেউ হয়তো একবারও ত্রাণ পাননি, আবার কেউ কেউ তিন/চার বার পেয়েছেন। ত্রাণ প্রত্যাশী এবং গ্রহীতাদের মধ্যেও ন্যূনতম সততা থাকতে হবে। যিনি বা যারা একবার সাহায্য পেয়েছেন তার বা তাদের একটু সংযত থেকে যারা একবারও পাননি, তাদের পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সবাইকে এটা বুঝতে হবে যে, ক্ষুধার জ্বালা সবারই এক। চাহিদার তো শেষ নেই। কিন্তু জোগানের সক্ষমতা সম্পর্কেও সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে।

দেশের স্বচ্ছল পরিবারগুলো একটু খাদ্যসাশ্রয়ী হলে অনেকেরই একবেলার অনাহার দূর হতে পারে। যাদের খাদ্য তালিকায় নিয়মিত মাছ-মাংস-ডিম-সবজি-ফল ইত্যাদি পুষ্টিকর খাবার থাকে তারা যদি একবার তার আশেপাশের অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখেন তাহলেও কত শিশুর অনাহারের ক্লেশ দূর হতে পারে। কেবল সরকারের ওপর নির্ভরতা বড়ো দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে না।

আমাদের অনেকের স্বভাব হলো, সরকারের ত্রুটি খোঁজা। কোনো দেশের সরকারই শতভাগ সঠিক পথে চলে না। আমাদের দেশে তো অবশ্যই না। সরকারকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে যা করা দরকার তা করার জন্য সরকারকে চাপে রাখতে হবে কিন্তু একই সঙ্গে নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালনেও যত্নবান হতে হবে। আত্মসচেতনতা ছাড়া এই অজানা অদেখা ভয়ংকর শত্রুকে মোকাবিলা করে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা দুরূহ হবে। যেহেতু এই মারণরোগের কোনো ওষুধ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে, সেহেতু একে প্রতিরোধের জন্য যা যা করা দরকার, যেমন পারস্পারিক শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরুলে মাস্ক ব্যবহার করা, ঘন ঘন সাবান পানিতে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো অবশ্য পালন করতে হবে। এগুলো না করে শুধু সরকারের মুণ্ডুপাত করে করোনার হামলা থেকে বাঁচা যাবে না। জীবন যার, জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব তো তারই বেশি।

লকডাউন কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। এনিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত আছে। জীবন আগে, না জীবিকা আগে- সে প্রশ্নও উঠছে। কিছু মানুষ ঘরে থাকার নীতি আগাগোড়া বুঝে বা না-বুঝে অমান্য করে এসেছে। বাজার-ঘাটে লোক সমাগম একেবারে বন্ধ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লকডাউন কিছুটা শিথিল করার প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কতদিন একটা মানুষকে আমরা আটকে রাখতে পারি? মানুষের জীবনের প্রয়োজনটা অনেক বেশি। মানুষের ক্ষতি হবে, মৃত্যু হবে সেই চিন্তা করে তাদের যতই আমরা আটকে রাখি না কেন, ক্ষুধার জ্বালাটা তার থেকে অনেক বেশি। মানুষের পেটে ক্ষুধার অন্ন জোগাতে হবে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট ছোট শিশুরা কতদিন ঘরে বসে থাকবে? তাদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতে হবে’।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়েও হয়তো বাঁকা মন্তব্য করার লোকের অভাব হবে না। তবে এই বক্তব্যে যে দেশের বর্তমান কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। মানুষের সামনে এখন বেঁচে থাকার, টিকে থাকার সংগ্রামই মুখ্য হয়ে উঠেছে। মানুষ একদিকে শোকার্ত, অন্যদিকে ভয়ার্ত। দেশের যিনি নেতৃত্ব দেবেন তাকে দেশটাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, চিনতে হবে। দেশ এবং দেশের মানুষের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হবে। দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব জানতে হবে। বাঙালির জাতিগত বৈশি্ষ্ট্যগুলো বুঝতে হবে। আমরা কি বাঙালি হয়েই আছি, না মানুষ হয়েছি? বাঙালির আত্মঘাতী প্রবণতার কি অবসান ঘটেছে? পরশ্রীকাতরতা কি দূর হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজা দরকার।

মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাস পৃথিবীকে এক নতুন অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিপন্নতা ও বিষণ্ণতা বাড়বে। সুস্থ এবং অসুস্থের প্রার্থক্য নিরূপণ করাও কঠিন হবে। ফলে অশান্তি-অস্থিরতাও বাড়বে। বহুবিধ সংকট বহু ব্যাপ্ত হবে। মরতে মরতে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে চলতে হবে। চেনা রাজনীতি কি পারবে এই অচেনা বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে?

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক

সর্বশেষ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার তার গৌরব ফিরে পাক: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান। আমরা চাই এই বিশ্ববিদ্যালয় আবার তার গৌরব ফিরে পাক। এখানে জ্ঞানের...

দির্ঘদিন পরে বগুড়ায হত্যা মামলার আসামী সোহাগ গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়ার আলোচিত সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডঃ মাহবুব আলম শাহীন হত্যা মামলার পলাতক আসামী সোহাগ সরদার (৩৪) কে দির্ঘদিন...

প্রশ্নবাইরের বিনিয়োগকারীরা তাহলে কেন আসবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্তমানে ঢাকা নিবাসী বগুড়ার শিল্প উদ্যোক্তা ইউনিসন ফার্মা (ইউনানী) লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর মোহাম্মদ ৮ বিঘা জমির একটি প্লট...

বাগেরহাটে ২৯ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাট জেলার মোংলা থানার অন্তর্গত দিগরাজ বাজার ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৯ পিস ইয়াবা ও ০১ টি মোবাইলসহ...

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ঘর পাচ্ছেন বাগেরহাটের ৪৩৩ ভূমিহীণ পরিবার

বাগেরহাট প্রতিনিধি: মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বাগেরহাটের ৪৩৩ পরিবারকে ঘর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ ঘর নির্মান সম্পন্ন হয়েছে। আগামী শনিবার (২৩...