36 C
Dhaka
Monday, January 25, 2021
No menu items!

একটি পালিয়ে যাওয়া দিন

মানিক মানবিক

শ্বশুর-শাশুড়িকে বিদায় দিতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছি। উবার থেকে নামতেই ১০-১২ বছরের এক কিশোর কুলি এসে হাজির; স‍্যার দ‍্যান ব‍্যাগটা দিয়া আসি… বড়ছোট মিলে দুইটা ব‍্যাগ। ইচ্ছে করলে আমিই টানতে পারি, তাছাড়া জামাই শ্বশুরের ব‍্যাগ টানছে ব‍্যাপারটার মধ্যে আলগা একটা আদিখ্যেতা আছে। শ্বশুর ‘গব্বো’ করে লোকজনের কাছে বলবে, জামাই আমার নিজ হাতে ব‍্যাগ বয়ে ট্রেনে তুলে দিয়েছে।
কিন্তু আলগা আদিখ্যেতার লোভ সামলে, কিশোর কুলির ঘাড়ে বড় ব‍্যাগটা তুলে দিলাম, কারণ ব‍্যাগের ওজনটা সহনীয় নয়। কিন্তু ছোকরা দেখি ছোট ব‍্যাগটাও টানছে।
বললাম, দরকার নাই, এটা আমিই নিতে পারবো।
পাছে পারিশ্রমিক কম দেই এই আশংকায়, ও বললো, না স‍্যার, আমি পারুম…
তোর পারার দরকার নাই, বলেই আমি ছোট ব‍্যাগটা নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। উশখুশ করতে করতে সেও পেছন পেছন হাঁটা শুরু করলো।
আমি বুঝতে পারছি, বড় ব‍্যাগটা বয়ে নিতে তার যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তারপর‌ও সে একটু পরপরই আমার কষ্টের খবর নিচ্ছে।
স‍্যার, আপনের কষ্ট হ‌ইতেছে, আমারে দিয়া দ‍্যান।
আমি এতক্ষন একটা তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকার কারণে ওকে ভালো করে লক্ষ্য করতে পারিনি, এবার লক্ষ্য করলাম, আরে ওতো আমার ছেলে মেঘদূতের বয়সী একটা ছেলে। কালো চেহারা;রাস্তার ধুলো ময়লার আস্তরণের মধ্যে ঢাকা। কিন্তু তার মধ্যেও একটা কোমল মায়াময় মুখ উঁকি দিয়ে তার অপার সৌন্দর্যের জানান দিচ্ছে।
আমার মেঘদূত এখন স্কুলের ক্লাসে, আর এক‌ই বয়সী এই হতভাগা কালো ছেলেটি রেলস্টেশনে পেটের দায়ে কুলিগিরি করছে।
একটু তথাকথিত আবেগ ভর করলো আমাকে। একটা তথাকথিত অপরাধবোধ।
ওর কাঁধ থেকে ব‍্যাগটা নিতে গেলাম; আচ্ছা ওটাও আমাকে দে… আমি নিতে পারবো।
কাষ্টমার হারানোর সম্ভাব্য ভয়ে, ও ছুটে দূরে সরে গেল ‘ আমি পারুম স‍্যার… আমি পারুম’।
বুঝলাম, কম পারিশ্রমিকের ভয় ওকে তাড়া করছে। কিন্তু এই ব‍্যাগ ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে টেনে তোলা ওর জন্য প্রায় অসম্ভব।
আমি দ্রুত পায়ে এগিয়ে ট্রেনের দরজায় উঠে দাঁড়ালাম, যাতে ওকে সাহায্য করতে পারি।
কিন্তু সে কোনভাবেই আমার সাহায্য নেবে না। বলে, সরেন স‍্যার… আমি পারুম।
আমি ধমকে বললাম, পারলে পারবি, অসুবিধা নাই, দে আমাকে।
ধমক খেয়ে সে একটু দমে গেল।
আমি প্রায় জোর করেই ব‍্যাগটা টেনে তুললাম।
তুলতে যতটুকু দেরি, পরক্ষণেই সে প্রায় হামলে পড়ে আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে ব‍্যাগটা নিয়ে মাথায় তুলে ট্রেনের ভিতর ছুটতে লাগলো।
আরে পড়বি পড়বি…বলেও আমি তাকে থামাতে পারলাম না। সে পড়িমরি করে ছুটছে; একটু এদিক‌ ওদিক হলেই মুখ থুবড়ে পড়বে। সুতরাং আমি আর বাধা দিলাম না।
নির্দিষ্ট আসনে আসার পর ব‍্যাগটাকে মাথার উপরের লাগেজ র‍্যাকে রাখতে হবে। দেখি ছোকরা সেই অসম্ভব চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে।
আমি বললাম, তুই পারবি না, আমি রাখছি।
সে বলে, না স‍্যার পারুম; বলতে বলতেই ব‍্যাগসহ ধপাস।
আমি তো আঁতকে উঠলাম; হাত ভাঙ্গলো না পা ভাঙ্গলো! দেখি সে হাসিমুখে অপরাধীর ভঙ্গিতে, হাত কচলাতে কচলাতে, কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে বললো, প‌ইরা গেছি…
ওর হাড্ডিসার চেহারা দেখে আমার সন্দেহ হলো, সকালে ওর পেটে কিছু পড়েনি। বললাম, নাস্তা করেছিস সকালে?
বিজ্ঞের মত বললো, সকালে কোন নাস্তা করিনা স‍্যার, একবারে দুপুরে ভাত খামু!
বেলা বাজে এগারোটা, মাসুম বাচ্চা,এখনো নাস্তা করেনি, আর আমার ছেলেকে নাস্তা খাওয়ানোর জন্য আমার স্ত্রী কত সাধ‍্যসাধনা করছে প্রতিদিন সকালে।
ভাবতেই আমার গলার কাছে একটা কান্না দলা পাকানোর চেষ্টা করতে লাগলো। আমি সেটাকে অগ্ৰাহ‍্য করে বললাম, কি সর্বনাশ, এতবেলা না খেয়ে থাকলে তো, অসুস্থ হয়ে পড়বি তুই!
কালো দাঁতগুলো বের করে বললো, কিচ্ছু অইবো না স‍্যার, মায় ক‌ইছে সকালে না খাইলে কিছু অয়না, ভাত খাইতে অয় দুপুরে।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না, বুকটার ভেতর কেমন যেন করছে। চোখটা ঝাঁপসা লাগছে। একদম চুপ হয়ে গেলাম আমি।
ছোকরা বললো, ট‍্যাকা দ‍্যান স‍্যার, আমি যামু।
ও হ্যাঁ…সম্বিত ফিরে মানিব্যাগে হাত দিলাম টাকা দেয়ার জন্য।
ও বললো, স‍্যার পুরা দশটাকা দিবেন কিন্তু!
একটু থেমে আবার বলল, আমি কিন্তু আপনেরে ব‍্যাগ ধরতে ক‌ই নাই স‍্যার, আপনে নিজেই ধরছেন। কম দিতে পারবেন না।
আমি কোন কথা না বলে, একশো টাকার একটা নোট এগিয়ে দিলাম, নে ধর…
ও বললো, ভাংগা দ‍্যান স‍্যার, আমার কাছে কোন ভাংতি নাই।
ভাংতি লাগবে না, পুরোটাই তোর।
ও যেন কেমন করে আমার দিকে তাকালো; তারপর বললো, আমি ঘুষ নেই না স‍্যার।
অবাক হয়ে বললাম, ঘুষ কেন বলছিস, আমি তো বকশিস দিলাম তোকে।
ছেলেটা অদ্ভুত, বললো, ঐ একই কথা স‍্যার, আমারে দশটাকা দ‍্যান, তাইলেই অইবো।
আমি হতাশ, বললাম আমার কাছে ভাংতি নাই। বলে, সিগারেট কিনেন, ভাংতি পাইবেন।
বললাম, সিগারেট খাই না।
ও বললো, নাহ আপনে অনেক যন্তনা করেন, দ‍্যান ভাংগাইয়া আনি; আপনে কিন্তু এইখানেই থাইকেন!
বলেই সে টাকা ভাংতি করতে বেরিয়ে গেলো।
ইতিমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিলো, ছুটে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের দিকে, উল্টো দিকের দোকানের দিকে ছুটে যাচ্ছে কিশোর কুলি… আর আমার চোখে জল ঝরছে।
আমি বুঝলাম এটাই আমার পালানোর উপযুক্ত সময়; আর দেরি করা ঠিক হবেনা। দেরি করলে চোখের জল লুকাতে পারবো না। ওর সংগ্ৰামের পথে আমার চোখের জল আদিখ্যেতা। সো সময় থাকতে ভাগতে হবে। যেই ভাবা, সেই কাজ।
সুতরাং আমিও উল্টো দিকে দিলাম একছুট। এক দৌড়ে পালিয়ে বাঁচলাম।

সর্বশেষ

দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ডিজিটাল ‘জায়ান্ট’ পরিবার!

নিউজ ডেস্ক: বৃহত্ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো চার বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে। যদিও এতে খুব...

দেবদারুগাছের ঘ্রাণ

নিউজ ডেস্ক: আমার অফিসের সামনে এক চিলতে পার্ক আছে। ছোট্ট ত্রিকোণাকার সেই পার্কে আছে কয়েকটি দেবদারুগাছ। পার্কে মনুষ্য প্রবেশ করতে দেখিনি কোনোদিন,...

‘তাইওয়ানের আকাশে চীনের যুদ্ধবিমান’, হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

নিউজ ডেস্ক: তাইওয়ান অভিযোগ করেছে, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো চীনের যুদ্ধবিমান তাদের আকাশসীমায় বড় ধরণের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এমন ঘটনার পর চীনের বিরুদ্ধে...

ইরানের পরমাণু ইস্যুতে বাইডেন-ম্যাঁক্রোর ফোনালাপ

নিউজ ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় জো বাইডেনকে শুভেচ্ছা জানাতে টেলিফোন করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো। ফোনালাপে তাদের মধ্যে ইরানের পরমাণু...

নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: দেশের সমস্ত ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন করতে সংসদ ভেঙেছিলেন নেপালের প্রধামন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। আর এবার তার বিরুদ্ধেই জোরালো হচ্ছে আন্দোলন।...