36 C
Dhaka
Saturday, January 16, 2021
No menu items!

করোনায় সেলাই-যন্ত্রণা

আবু সাঈদ লীপু

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প এখনবেশ বড় । এতো বড় যে সরকার মহামারী করোনাভাইরাস মোকাবেলায়ও চট করে এই শিল্প বন্ধ করা বা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশের লকডাউন কেমন? একজন গার্মেন্টস কর্মী রুমির ভাষায়, লকডাউন বেশ কঠোর। পুলিশ এবং সেনাবাহিনী মানুষকে ঘরের বাইরে বের হতে দিচ্ছে না। রিক্সাওয়ালা, ফেরিওয়ালা কাউকেই রাস্তায় আসতে দিচ্ছে না। অথচ যখনই গার্মেন্টস এবং গার্মেণ্টস কর্মী প্রসঙ্গ আসছে, কর্তৃপক্ষ বেশ কৌশলী হয়ে চাতুরিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত আছে প্রায় ৪১ লক্ষ শ্রমিক। যাদের জীবন এবং জীবিকা কারখানার স্বল্প স্থানেই সীমাবদ্ধ। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণে এরা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তথাপি, পোশাক শিল্পের রপ্তানী থেকে গত বছর ৩৪০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মূদ্রা এসেছে। এই সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৩ শতাংশ। গত কয়েক দশকে গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ ঘটনাবহুল। সর্বপ্রথম সরাকরি ছুটি মিলিয়ে দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যখন দেখা যায় এই ঘোষণাই যথেষ্ট নয় তখন ৩১ মার্চ সরকার সব ধরণের ব্যবসা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। স্পষ্টতঃ সেসময় গার্মেন্টস শিল্পকে এই নির্দেশের বাইরে রাখা হয় বলেই প্রতীয়মান হয়। যদিও বেশীরভাগ গার্মেন্টস কারখানাই রাজধানী ঢাকা বা এর আশে পাশে। এর চারদিন পর গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করার জনও নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই সাধারণ ছুটি শেষে অনেক গার্মেন্টস কর্মী মালিকের নির্দেশে কারখানায় ফিরে আসতে শুরু করে। শ্রমিক আন্দোলন কর্মী কল্পনা আক্তার বলেন, হাজার হাজার কর্মী তখন কোন না কোন ভাবে কিংবা শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে কারখানায় চলে আসে। অথচ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধের নির্দেশ চলে এসেছে তখন।

উপায়ান্তর না দেখে কর্মীদের তখন বস্তির মত গাদাগাদি করে ফ্যাক্টরিতে রাখা হয়। ফলে এসব কারখানা করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহ কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়। হাতে কাজ নেই, মুখে খাবার নেই – হাজার হাজার কর্মী পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর লাঠিসোটাকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নামে বকেয়া বেতনের দাবিতে। সরকার দ্রুত কারখানার মালিকদের ৫৯ কোটি ডলারের সমপরিমান অল্প সুদে ঋণ প্রদানের অঙ্গীকার করে, যাতে কর্মাদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা যায়। কিন্তু মালিকেরা অপেক্ষা করে কখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড় করা হবে। ফলে সরকারের ভাষ্য মতে ১ লক্ষ ৫০ হাজার কর্মীকে সময়মত বেতন দেয়া সম্ভব হয়নি। এই সংখ্যাটা ২ লক্ষ বলে মন্তুব্য করেন কল্পনা আক্তার।

বিজিএমইএ এর সভাপতি রুবানা হকের মুখোমুখি হলে তিনি এই অবস্থাকে ’জীবন ও জীবিকার’ জন্য ‘নির্মম দোদুল্যমনতা’ বলে বর্ণনা করেন। এদিকে, কর্তৃপক্ষ পুনরায় গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন সবাইকে। সাথে সাথে ২ হাজারের মত কারখানা চালু হয়। কয়েকদিনের মধ্যে আরও কয়েকশ কারাখানার চালুর জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

যদিও করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে তৈরী পোশাকের কার্যাদেশ কমে যায় অনেক। তথাপি অনেক মালিকের ধারণা হয় যে, তারা বেশীদিন কারখানা বন্ধ রাখতে সমর্থ হবেন না। ইতোমধ্যে, বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। ফলে গার্মেন্টস মালিকেরা প্রচন্ড আগ্রহী হয় যতটুকু কার্যাদেশ আছে তা দ্রুত সরবরাহ করার জন্য। কারণ অনলাইন ব্যবসা এখনও চালু আছে। কিছু কিছু খুচরা বিক্রেতা অনলাইনে কেনা-বেচা করছে। তাছাড়া, মালিকদের প্রত্যাশা ইউরোপ আর আমেরিকায় লকডাউন শিথিল হলেই ব্যবসা আগের মত চালু হবে। তাই প্রস্তুতি থাকা জরুরী।

‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ক্যাম্বডিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা ইতিমধ্যে কারখানা চালু করে উৎপাদনে চলে গিয়েছে।’ বলেন বেক্সিমকো টেক্সটাইলসের সৈয়দ নাভিদ হোসাইন। বেক্সিমকো টেক্সটাইলে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী আছে। এরা ওয়াল-মার্ট, জারার মত বড়বড় পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতার কাছে তৈরী পোশাক সরবরাহ করে। বেক্সিমকোর মত মালিকদের আশংকা, যদি বাংলাদেশ আরও বেশি সময় লকডাউনে থাকে তবে ক্রেতার নিশ্চিত কার্যাদেশগুলো বাংলাদেশ ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দেশে চলে যেতে পারে।

এদিকে, বিজিএমইএ গার্মেন্টস কর্মীদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য একটি গাইডলাইন তৈরী করে দিয়েছে। এছাড়া, মাস্ক পড়া, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং কর্র্মীদের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সভাপতি রুবানা হক হাসপাতালের সাথে একটা সমঝোতার চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে করোনা আক্রান্ত কর্মীদের চিকিৎসা দেয়া যায়।

কিন্তু গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রীর সরবরাহ যথেষ্ট নয়। এটা জাতীয় ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ আছে। অথচ ভেন্টিলেটর আছে মাত্র ২ হাজারের মত। আইসিইউ বেড আছে এক হাজারের মত। করোনা টেস্টিং কিটের স্বল্পতার কারণে যথেষ্ট টেস্ট করা যাচ্ছে না। এদিকে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে আশংকাজনক হারে। করোনা সংক্রমণের এলাকাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় গার্মেন্টসপ্রবণ এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশী। ঢাকার কাছের জেলা নারায়ণগঞ্জ এই আক্রান্ত এলাকার একটি।

বিদেশের কার্যাদেশ বাতিল হওয়ায় কিছু কিছু কারখানা নিদারুন অর্থ কষ্টে পড়েছে। ফলে তারা কর্মীদের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নির্দেশাবলী পুরোপুরি পালনে অনীহা দেখাচ্ছে। ঢাকার উত্তরের জেলা গাজীপুরের এরকমই একটি কারখানায় রুমি কাজ করেন। গাজীপুর হচ্ছে আরেকটি করোনা হটস্পট এখন। রুমির কারাখানা পুরো লকডাউনের সময়ও বন্ধ হয়নি। তার আটজন সহকর্মী মারা গেছে ইতোমধ্যে। বিজিএমইএ বলেছে সকল কর্মীকে গ্লাভস দিতে। কিন্তু তা দেয়া হচ্ছে না, রেখে দেয়া হচ্ছে উপরের মানুষের জন্য। রুমির জিজ্ঞাসা, ‘কেন আমাদের গ্লাভস দেয়া হচ্ছে না। আমাদের জীবনের মূল্য কী তাদের চেয়ে কম?’ সব দেখে তাই মনে হচ্ছে।

(দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত)
অনুবাদক: কানাডার জিওটেকনিক্যাল বিভাগে কর্মকর্তা

সর্বশেষ

একদিনে ২৬৪ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে ঢাকা ওয়াসা: এমডি

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান বলেছেন, ঢাকা ওয়াসা ২৪ ঘণ্টায় ২৬৪ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে। যা...

মেয়র তাপস-খোকনের মতপার্থক্য থাকতেই পারে: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মধ্যে মতের অমিল রয়েছে। সময়ের...

বিএফআইইউর নথিতে পিকে হালদার ও তার ৮৩ সহযোগীর নাম

নিউজ ডেস্ক: বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারে জড়িত ছিলো প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে) ও তার...

করোনায় যুগ্ম-সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ মারা গেছেন

নিউজ ডেস্ক: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রশাসনের যুগ্ম-সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ মারা গেছেন। শনিবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর মুগদা জেনারেল...

ভারতে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু, দুটো ডোজই জরুরি বললেন মোদী

নিউজ ডেস্ক: করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ভারতে। আজ শনিবার (১৬ জানুয়ারি) এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র...