36 C
Dhaka
Wednesday, January 20, 2021
No menu items!

বলার কথা অনেক আছে

বিভুরঞ্জন সরকার

গণমাধ্যম ও সাংবদিকদের সমস্যা নিয়ে বলার মতো কথা অনেক আছে। তবে আলোচনাটা বেশি দীর্ঘ হলে অনেকের কাছেই বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তাই বর্তমান পর্যায়ে আজকেই এই আলোচনার ইতি টানছি।

এক কথায় এটাই বলা যায় যে, দেশে কর্মরত সাংবাদিকদের অধিকাংশ এখন নানা ধরনের সংকটে জর্জরিত। তাদের বেশির ভাগের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। চাকরি চলে গেলে তাদের শূন্য হাতে বিদায় নিতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না। সৎ সাংবাদিকতার পথে সরকার যতো না অন্তরায় সৃষ্টি করে, তারচেয়ে বেশি বাধা তৈরি করে মালিক পক্ষ। এটা নিয়ে কেউ বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু তাতে বাস্তব অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। সাংবাদিকদের যতোক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার মতো সম্মানজনক বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা না যাবে ততোক্ষণ পর্যন্ত গণমাধ্যম মানসম্পন্ন হবে না। সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার দেখাও পাওয়া যাবে না।

শত ফুল ফুটতে দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে দেশে অসংখ্য সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে। তবে এগুলোর কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো এখন নানা ব্যাধিতে ধুকছে। খামখেয়ালিপনার কারণে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে, সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত মান অর্জনের সক্ষমতা রয়েছে অধরা। এখন দেশের অনেকগুলো গণমাধ্যম চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট কাটানোর উপায় নিয়ে কারো কোনো গভীর চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। আর্থিক সংকট দূর না হলে কীভাবে এগুলো চলবে?

আর্থিক সংকট দূর করার উপায় আয় বাড়ানো। আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে এতো এতো ‘মিডিয়া’ চলবে না। আবার বেসরকারি বিজ্ঞাপন পেতে হলে যে সার্কুলেশন থাকা দরকার তা-ও অনেক পত্রিকার নেই। বেশিরভাগ পত্রিকাই আসলে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ – কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। গ্রামবাংলায় একটি কথা চালু আছে – ‘তোলা দুধে পোলা বাঁচে না’।

গণমাধ্যমের সংকট কাটাতে হলে আবেগী এবং তাত্ত্বিক কথাবার্তা না বলে বাস্তবতার আলোকেই সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে রোগীর জন্য শল্য চিকিৎসা দরকার তাকে হোমিওপ্যাথি ডোজ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি?

মতলবি বা অসৎ সাংবাদিকতা নতুন কিছু নয়। সাংবাদিক কিংবা সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের চেষ্টাও নতুন কিছু নয়। ১৮৮৪ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারে একটি রহস্যজনক মৃত্যুর খবর ধাপাচাপা দেওয়ার জন্য সংবাদপত্রে ‘ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগ আছে। তবে অতীতে এসব ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে থাকলেও এখন তা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। লুটেরা পুঁজির মালিক কিংবা পু্ঁজি গঠনের জন্য লুণ্ঠন প্রবৃত্তি যাদের মধ্যে প্রবল, তাদের হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকলে ‘সত্য প্রকাশের দুরন্ত সাহস’ দেখানো গণমাধ্যমের পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

গণমাধ্যমের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে এখন অনেক কথা হয়। সবাই গণমাধ্যমের কাছে নিরপক্ষতা প্রত্যাশা করেন। এই ‘নিরপক্ষতা’ বিষয়টিও আমাদের দেশে একটি বিশেষ অর্থ বহন করে। এখন অনেকের কাছে নিরপেক্ষতা মানে সরকারের বিরুদ্ধে থাকা। আবার এমন অনেক মানুষও আছেন যাদের কাছে আওয়ামী লীগ বিরোধিতাই হলো নিরপেক্ষতা। সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষে হলে ‘দালাল’ কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগবিরোধী অন্য কোনো দলের সমর্থক হলে তাকে সচরাচর দালাল বলা হয় না, তার অবস্থান নিরপেক্ষ। দেশের মানুষের মনোজগৎ মূলত স্ববিরোধী চিন্তা-চেতনায় ঠাঁসা। মানুষের মধ্যে ধারণাগত স্বচ্ছতা তৈরিতে বা বিশেষ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটাতে গণমাধ্যম ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। অতীতে সেটা করেওছে। ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময় থেকে স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক এবং সংবাদ প্রধানত এই দায়িত্ব পালন করেছে। দেশে বিশেষ রাজনৈতিক ধারা তৈরিতে এই পত্রিকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন : ‘পূর্ব বাংলার জনসাধারণের জন্য ইত্তেফাক যা করেছে তা কোনো খবরের কাগজই দাবি করতে পারে না। এদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে বিরুদ্ধ রাজনীতি মুছে যেত যদি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাক না থাকতো। একথা স্বীকার না করলে সত্যের অপলাপ করা হবে’। বঙ্গবন্ধু আরো লিখেছেন : ‘ছয় দফার আন্দোলন যে আজ এত তাড়াতাড়ি গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে এখানেও মানিক ভাইয়ের লেখনী না হলে তা সম্ভব হতো কিনা তাহা সন্দেহ’।

আমাদের দেশে গণমাধ্যম এখন আর জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে না। প্রতিটি গণমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকদের হয়তো একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে তবে সেটা গণমাধ্যম পরিচালনায় বড়ো ভূমিকা পালন করে না। ব্যবসায়িক স্বার্থই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। জনমত গঠন নয়, জনমতকে বিভ্রান্ত করাই বেশিরভাগ গণমাধ্যমের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার এই বক্তব্য নিয়েও হয়তো কেউ কেউ বিতর্ক করবেন কিন্তু নির্দিষ্ট করে একটি গণমাধ্যমের নামও বলতে পারবেন না, যে গণমাধ্যম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য লাগাতার কাজ করছে। সংবাদ পরিবেশন এমনকি উপসম্পাদকীয় কলামে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রেও অনুদারতার চরম প্রকাশই দেখা যায়। কোনো না কোনো কোটারি স্বার্থের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা বা প্রবণতা কোনোটাই লক্ষ করা যায় না।

এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। গণমাধ্যমকে জনস্বার্থের অনুকূল করতে হলে বর্তমান মালিকানা কাঠামোয় সেটা সম্ভব হবে না। তাহলে পথ কি? উপায় কি? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, প্রকৃত গণউদ্যোগে যদি পেশাদারি মনোভাব নিয়ে গণমাধ্যমের জন্ম দেওয়া যায় তাহলে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার ধারা তৈরি হতে পারে। এখানেও প্রশ্ন আসবে, এমন উদ্যোগ কার্যকর করা কি আদৌ সম্ভব? আমার জবাব : কেন নয়? মানুষের পক্ষে সবই সম্ভব। পথের বাধা যেমন মানুষ তৈরি করে, তেমনি বাধা অপসারণের কাজও মানুষই করে। মন্দের সংখ্যা বেড়েছে, তাই বলে ভালো বিলীন হয়ে যায়নি। এক বা একাধিক মানুষের সৎ ও আন্তরিক উদ্যোগ গণমাধ্যমে নতুন প্রাণপ্রবাহ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ

কারও প্ররোচনায় নয়, ভাসানচরে স্বেচ্ছায় যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

নিউজ ডেস্ক: কারও প্ররোচনায় নয়, রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় নোয়াখালীর ভাসানচরের আশ্রয়শিবিরে যাচ্ছে। কারণ, কক্সবাজারের তুলনায় ভাসানচরের আশ্রয়শিবির উন্নত-টেকসই, সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি।

বছরের মাঝামাঝি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

নিউজ ডেস্ক: চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,...

ভারতের সর্বকালের সেরা এ জয়!

খেলাধুলা ডেস্ক: ব্রিসবেনে নামার আগে কত কথাবার্তা। প্রায় দেড় মাসের সফর শেষে ক্লান্তশ্রান্ত ভারত ব্রিসবেনের কড়া নিয়মে আর থাকতে চাইছিল না। রাজ্য...

১৭ মার্চ শুরু হচ্ছে না ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা

নিউজ ডেস্ক: আগামী ১৭ মার্চ শুরু হচ্ছে না ২৬তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। এবার মেলা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ সংক্রান্ত আবেদনের...

মাশরাফির মুখে ‘আওয়াজ একটাই- বাংলাদেশ’

ক্রীড়া প্রতিবেদক: টেস্ট আর টি-টোয়েন্টিকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছেন। তবে, ওয়ানডে ক্রিকেটকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাননি তিনি। নেতৃত্ব ছেড়েছেন হয়তো। কিন্তু মাশরাফি বিন...